ডেস্ক রিপোর্টঃ
এক সময় স্ট্রোককে বয়স্কদের রোগ বলে মনে করা হলেও এখন তরুণদের মধ্যেও বাড়ছে এর প্রকোপ। গত প্রায় তিন দশকের চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০ থেকে ৫৪ বছর বয়সিদের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
তবে একই সময়ে স্ট্রোকের পর রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও বেড়েছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা নিয়ে জীবন কাটাতে হতে পারে, এমন তরুণের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী নিউরোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর সিনসিনাটি ও উত্তর কেনটাকি অঞ্চলের প্রায় তিন দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়।
গবেষণার প্রধান লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব সিনসিনাটির চিকিৎসক এমিলি আর ফিশার বলেন, ‘স্ট্রোককে ঐতিহ্যগতভাবে বয়স্কদের রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণদের মধ্যে এ রোগ ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে স্ট্রোকের পর আরও বেশি মানুষ বেঁচে থাকছেন। ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে জীবন কাটাতে হতে পারে এমন তরুণের সংখ্যাও বাড়তে পারে।’
তিন দশকে স্ট্রোক বেড়েছে ৮৩ শতাংশ:
তরুণদের মধ্যে স্ট্রোকের প্রবণতা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা জানতে গবেষকরা ১৯৯৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর সিনসিনাটি ও উত্তর কেনটাকি অঞ্চলের চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এ সময়ে প্রথমবার স্ট্রোকে আক্রান্ত ২০ থেকে ৫৪ বছর বয়সি ২ হাজার ৭৬ জনকে শনাক্ত করা হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ১৯৯৩-৯৪ সালে প্রতি এক লাখ ব্যক্তির মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩৩ দশমিক ৯। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬২ দশমিক ২-এ। অর্থাৎ এ সময়ে আক্রান্তের হার বেড়েছে প্রায় ৮৩ শতাংশ।
তবে সব ধরনের স্ট্রোকের ক্ষেত্রে আক্রান্তের হার একইভাবে বাড়েনি। গবেষকেরা দেখেছেন, নির্দিষ্ট এক ধরনের স্ট্রোকের কারণে সামগ্রিক বৃদ্ধির বড় অংশ ঘটেছে।
রক্তনালি বন্ধ হয়ে বাড়ছে স্ট্রোক
গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণদের মধ্যে স্ট্রোকের হার বৃদ্ধির পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে ইস্কেমিক স্ট্রোক। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী কোনো রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে এ ধরনের স্ট্রোক হয়। এতে মস্তিষ্কের কোষে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছানো ব্যাহত হয়। পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ না থাকলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করতে পারে।
১৯৯৩-৯৪ সালে প্রতি এক লাখ তরুণদের মধ্যে ইস্কেমিক স্ট্রোকে আক্রান্তের হার ছিল ২৩ দশমিক ৮। ২০২০ সালে তা বেড়ে ৪৭ দশমিক ৩-এ পৌঁছায়। অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এ হার।
তবে মস্তিষ্কের ভেতরে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোক এবং মস্তিষ্কের চারপাশের আবরণঘেরা স্থানে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের ক্ষেত্রে একই ধরনের বৃদ্ধি দেখা যায়নি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ দুটি যথাক্রমে ইন্ট্রাসেরিব্রাল হেমোরেজ ও সাবঅ্যারাকনয়েড হেমোরেজ নামে পরিচিত।
উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও মাদক ব্যবহারের ঝুঁকি
গবেষকরা স্ট্রোকে আক্রান্ত তরুণদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা ও জীবনযাপনের অভ্যাসও বিশ্লেষণ করেন। এতে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন এবং মাদকদ্রব্য ব্যবহারের মতো সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়গুলো আরও সাধারণ হয়ে উঠেছে।
অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন হলো হৃদস্পন্দনের অনিয়মিত একটি অবস্থা। এতে হৃৎপিণ্ডে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। সেই জমাট রক্ত মস্তিষ্কে পৌঁছে কোনো রক্তনালি বন্ধ করে দিলে ইস্কেমিক স্ট্রোক হতে পারে।
গবেষণায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলোর একটি ছিল মাদকদ্রব্য ব্যবহারের হার। ১৯৯৩-৯৪ সালে স্ট্রোকে আক্রান্ত তরুণদের মধ্যে ৪ দশমিক ৬ শতাংশের মাদক ব্যবহারের তথ্য নথিভুক্ত ছিল। ২০২০ সালে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ দশমিক ২ শতাংশে। এ বৃদ্ধির বড় অংশের সঙ্গে গাঁজা ব্যবহারের সম্পর্ক ছিল।
তবে এসব ঝুঁকির কারণই যে স্ট্রোকের হার বৃদ্ধির জন্য দায়ী, তা গবেষণায় নিশ্চিত করা যায়নি। কারণ, স্ট্রোকে আক্রান্ত হননি এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে তুলনা করার মতো সমপর্যায়ের স্বাস্থ্যতথ্য গবেষকদের কাছে ছিল না। ফলে ঝুঁকির বিষয়গুলো আক্রান্তের হার বৃদ্ধিতে কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
স্ট্রোকের পর বেঁচে থাকার হার বাড়লেও উদ্বেগ রয়ে গেছে
তরুণদের মধ্যে স্ট্রোকের হার বাড়লেও গবেষণায় একটি ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে। প্রায় তিন দশক আগের তুলনায় বর্তমানে স্ট্রোকে আক্রান্ত তরুণদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কিছুটা বেড়েছে।
বয়স, জাতিগত পরিচয় ও লিঙ্গের পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়ার পর গবেষকরা দেখেছেন, স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে মারা যাওয়া রোগীর হার ১৯৯৩-৯৪ সালের ১১ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০২০ সালে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
মস্তিষ্কের ভেতরে এবং মস্তিষ্কের চারপাশে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুহার কমার বিষয়টি বেশি লক্ষণীয় ছিল। এ দুই ধরনের স্ট্রোক বিশেষভাবে বিপজ্জনক হতে পারে।
তবে স্ট্রোকের পর বেঁচে থাকলেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠা নিশ্চিত নয়। মস্তিষ্কের কোন অংশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে রোগীর চলাফেরা, কথা বলা, স্মৃতিশক্তি কিংবা অন্যান্য স্বাভাবিক সক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। তরুণদের মধ্যে স্ট্রোক বাড়তে থাকলে এসব জটিলতা নিয়ে কয়েক দশক পর্যন্ত জীবন কাটাতে হতে পারে অনেককে।
চিকিৎসক এমিলি আর ফিশার বলেন, ‘আমাদের গবেষণার ফলাফল প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের শুরুর দিকেই স্ট্রোকের ঝুঁকির কারণগুলো শনাক্ত করা এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। কেন এ প্রবণতা বাড়ছে এবং কীভাবে তা উল্টে দেওয়া সম্ভব, তা বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।’
গবেষকরা জানিয়েছেন, তরুণদের মধ্যে স্ট্রোকের হার এত দ্রুত বাড়ার কারণ জানতে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধান দরকার। গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। পাশাপাশি স্ট্রোকে আক্রান্ত নন, এমন কোনো তুলনামূলক গোষ্ঠীও এতে ছিল না। ফলে দেশজুড়ে একই প্রবণতা রয়েছে কি না কিংবা আক্রান্তের হার বৃদ্ধির জন্য কোন বিষয়গুলো দায়ী, তা এ গবেষণা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
সূত্র: সায়েন্স ডেইলি।
