ডেস্ক রিপোর্টঃ
নাটোরে বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩০ জন। গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৪টার দিকে বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সামনে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। অভিযোগ উঠেছে, দুর্ঘটনার সময় বাসটি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার আর চালক ও সহকারী পেছনের সিটে ঘুমাচ্ছিলেন।
ওই বাসের তিনজন যাত্রী জানিয়েছেন, নাটোরের বনপাড়ায় আরপি স্পেশাল পরিবহনের বাসটি দুর্ঘটনার সময় চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার সোহেল রানা। এ সময় চালক ও সহকারী পেছনের সিটে ঘুমাচ্ছিলেন।
নিহত সোহেল রানার (৩৮) বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ি উপজেলার ফরাদপুর গ্রামে। তার স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে। তার পরিবারের সদস্যরা জানান, সোহেল রানা আগে বাসের চালক ছিলেন। বছর দুয়েক আগে তিনি বাসের সুপারভাইজার হিসেবে কাজ শুরু করেন।
ওই বাসের তিনজন যাত্রী জানিয়েছেন, নাটোরের বনপাড়ায় আরপি স্পেশাল পরিবহনের বাসটি দুর্ঘটনার সময় চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার সোহেল রানা। এ সময় চালক ও সহকারী পেছনের সিটে ঘুমাচ্ছিলেন।
নিহত সোহেল রানার (৩৮) বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ি উপজেলার ফরাদপুর গ্রামে। তার স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে। তার পরিবারের সদস্যরা জানান, সোহেল রানা আগে বাসের চালক ছিলেন। বছর দুয়েক আগে তিনি বাসের সুপারভাইজার হিসেবে কাজ শুরু করেন।
দুর্ঘটনাকবলিত বাসের যাত্রী আব্দুস সালাম গুরুতর আহত হয়েছেন। তিনি জানান, শরীয়তপুরের মোস্তাকপুর এলাকা থেকে কয়েকজন যাত্রীসহ তিনি রাত ৯টার দিকে বাসে ওঠেন। বাসটি কুষ্টিয়ায় পৌঁছানোর পর একটি হোটেলে খাবারের জন্য বিরতি দেয়। বিরতির পর বাসের সুপারভাইজার চালকের আসনে বসেন। তখন চালক ও সহকারী পেছনের সিটে ঘুমাচ্ছিলেন।
বাসের আরেক যাত্রী ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রমজান আলী (২৮)। দুর্ঘটনায় আহত হয়ে তিনি বনপাড়া পাটোয়ারী হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তিনি ওই হাসপাতাল ত্যাগ করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি বাসের চালকের সিটের দুই সিট পেছনে বসে ছিলাম। বাসটি রাত আনুমানিক ৩টার দিকে পাবনার ঈশ্বরদীতে পৌঁছালে চালকের আসন থেকে চালক উঠে যান এবং সুপারভাইজার বাস চালাতে শুরু করেন। বাসের দরজা বন্ধ করে চালক ও তার সহকারী পেছনের সিটে ঘুমাতে যান। এর ঘণ্টা খানেক পর বাসটি বনপাড়ায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।’
ওই বাসের যাত্রী ইয়াকুব আলী জানান, দুর্ঘটনার সময় বাসের সুপারভাইজার বাসটি চালাচ্ছিলেন। চালক ও হেলপার পেছনের সিটে বসে ছিলেন। বাসটি বরগুনা জেলা শহর থেকে ছেড়ে আসে সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে। ঈশ্বরদীতে কিছু সময় বিরতি দিয়ে আবার বাসটি চালু হওয়ার সময় চালকের আসনে বসেন বাসটির সুপারভাইজার। এর কিছু সময় পর দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনাস্থলের পাশের এলাকার বাসিন্দা ও উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া শাহজাহান আলী জানান, রাত ৪টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পান তারা। এরপর চিৎকার ও কান্নাকাটি শুনে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তখন বাস ও ট্রাকের ভয়াবহ সংঘর্ষের দৃশ্য দেখতে পান। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় লোকজন উদ্ধারকাজ শুরু করেন।
শাহজাহান আলী জানান, প্রথমে তারা ৯ জনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে হাইওয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া গোলাম মোস্তফা বলেন, বাসের ভেতরে একটি শিশু মারা গিয়েছিল। শিশুটির কোলে একটি বিদেশি বিড়াল ছিল। বিড়ালটিও মারা যায়।
নিহতরা হলেন- রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরাদপুর গ্রামের সোহেল রানা (৪০), বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের আনোয়ার হোসেন (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার শহীদুল ইসলাম (৪৫) ও তার মেয়ে তাছফিয়া খাতুন (৮), শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার জুয়েল (৪০), একই উপজেলার ডুবি সাহিবর গ্রামের সোহাগ শিকদার (৩০), আব্দুস সালাম মোল্লা (৪৬), আব্দুস সামাদ ফকির (৭০), পালের চর গ্রামের শাহীন আহমেদ (৩২), ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বড় মান্দারবাড়িয়া গ্রামের ট্রাক চালক আবু কালাম (৫৫), নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ঘোনটোলা গ্রামের রাসেল (৩৩) এবং ফরিদপুর সদর উপজেলার বাখোন্দিয়া গ্রামের হিমেশ জমাদার (৩৫)।
আহতদের মধ্যে যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে, তারা হলেন শরীয়তপুরের আলমগীর মাতবর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আব্দুস সালাম, শিবগঞ্জের ওয়াহিদ আলী, মাদারীপুরের নাইম তালুকদার, নার্গিস আক্তার, বরগুনার জেসমিন আক্তার, নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার চিরঞ্জিত কুমার, মান্দা উপজেলার মানিক হোসেন, শাহাজুল ইসলাম, লক্ষ্মীপুর জেলার রাকিব হোসেন। অন্যদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।
নাটোর ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আক্তার হামিদ বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
দুর্ঘটনার পর হতাহতদের মালপত্র লুট
বাসের আহত যাত্রী রাকিব হোসেনসহ আরও কয়েকজন বলেন, চেতনা ফিরলে তারা দেখেন, কয়েকজন লোক তাদের মোবাইল, মানিব্যাগ ও টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। বাসে আটকে থাকার কারণে কিছু্ই বলতে পারছিলাম না। তবে কিছু মানুষ তাদের বাস থেকে বের হতে সহযোগিতা করেছেন।
লুটপাটের বিষয়ে জানতে চাইলে নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন, ঘটনার পর দেড় লাখ টাকা ও কিছু মালপত্র উদ্ধার করেছি, সেগুলো আহত ও নিহতদের স্বজনের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভুল তথ্য
দুর্ঘটনার খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন। তিনি বলেন, বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৩০ জন।
যদিও পরে মৃতদেহ বনপাড়া হাইওয়ে থানায় নিয়ে আসার পর জানা যায় ১৪ জন নয়, ১২ জন মারা গেছেন। তখন নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন, ‘এটাই কনক্রিট তথ্য, ১২ জন মারা গেছেন, ১৪ জন নয়।’
জেলা প্রশাসকের ভুল তথ্যের বিষয়ে নাটোরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইফতে খায়ের আলম বলেন, ‘বনপাড়া হাইওয়ে থানা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা তাড়াহুড়ো করে ভুল তথ্য দেওয়ার কারণে জেলা প্রশাসক এবং আমাদেরও ভুল হয়ে গেছে।’
দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে তদন্ত কমিটি গঠন
ঘটনার খবর পেয়ে জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ, জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক ও ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস ঘটনাস্থলে ছুটে যান।
এ সময় নিহতের স্বজনদের জন্য আর্থিক সহায়তাসহ সাত সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন তারা।
হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াতকে প্রধান করে সাত সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার।
পরিবারের কাছে মৃতদেহ হস্তান্তর
পরিচয় শনাক্তের পর থেকেই শুরু হয় মরদেহ হস্তান্তরের কার্যক্রম। একেকটি পরিবার যখন তাদের প্রিয়জনের মরদেহ থানায় এসে চিনতে পারছিলেন, তখন তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছিল চারপাশের পরিবেশ।
বনপাড়া হাইওয়ে থানার এসআই আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমরা ১২টি পরিবারের কাছে ১২ জনের মৃতদেহ হস্তান্তর করেছি। যে মালপত্রগুলো তারা চিহ্নিত করেছেন, সেগুলো তাদের পরিবারকে দিয়ে দেওয়া হয়।’
নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েই প্রাণ গেল আনোয়ারের: নাটোরের বড়াইগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার আনোয়ার হোসেন (৩০)। তিনি উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের চাঁইপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ব্যাংক কর্মকর্তা ও মেয়ের মৃত্যু, হাসপাতালে স্ত্রী-ছেলে: নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ব্র্যাক ব্যাংকের কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম ও তার আট বছর বয়সী মেয়ে তাছফিয়া খাতুনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় শহিদুলের স্ত্রী রুবিনা বেগম ও ছোট ছেলে লাবিব গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
জাজিরায় একসঙ্গে পাঁচ ব্যবসায়ীর জানাজা
নাটোরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কাজিরহাটের পাঁচ ব্যবসায়ীর জানাজা একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে কাজিরহাট জামে মসজিদ-সংলগ্ন মসলা হাটের মাঠে জানাজায় কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। স্বজনদের কান্না ও এলাকাবাসীর শোকে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
নিহত পাঁচ ব্যবসায়ী হলেন জুয়েল মাদবর, শালাল মোল্লা, সোহাগ শিকদার, সামাদ ফকির ও শাহিন বেপারি। তারা কৃষিপণ্য কিনতে নাটোরের তাহেরপুরে যাচ্ছিলেন। তাদের মৃত্যুতে স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজ ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির ফিটনেসের মেয়াদ গত ১৩ মে শেষ হয়েছে। অথচ মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেস নিয়েই বাসটি দূরপাল্লার যাত্রী পরিবহন করছিল। বাসটির রুট পারমিটের মেয়াদ অবশ্য ২০২৮ সালের ১৩ মে পর্যন্ত রয়েছে। ফিটনেসবিহীন বাসটি কীভাবে মহাসড়কে চলছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ সুপার শরীফুল হক ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।
আট বছরেও বদলায়নি সড়কের চিত্র: ২০১৮ সালের ২৫ আগস্ট দুর্ঘটনাস্থল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে একটি যাত্রীবাহী বাস ও লেগুনার সংঘর্ষে লেগুনার চালকসহ ১৫ জন নিহত হয়েছিল। ওই দুর্ঘটনার পর সড়কের উন্নয়ন নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
