বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। এ দেশের অর্থনীতি, সমাজ এবং সংস্কৃতির ভিত্তি কৃষি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করছে। এই সংকট মোকাবিলায় কৃষি আবাদে মনোযোগী হওয়া ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। বিশ্বব্যাপী খাদ্য পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে বিশৃঙ্খলা, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশেও সরাসরি পড়েছে। ফলে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে গিয়েছে। তবে দেশের জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হলো স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো।
বাংলাদেশের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণ
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তন, কোভিড-১৯ পরবর্তী সংকট এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় এবং খাদ্যশস্যের আমদানি নির্ভরতা বাংলাদেশের বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে চাল, ডাল, তেল, চিনি এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে।
তবে সমস্যার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাওয়া: শিল্পায়ন ও নগরায়নের কারণে কৃষি জমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে।
নিম্ন উৎপাদনশীলতা: কৃষিতে পর্যাপ্ত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং প্রশিক্ষণের অভাবে উৎপাদনশীলতা কম।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ: বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ নিয়মিত কৃষি উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।
আমদানি নির্ভরতা: অনেক খাদ্যপণ্য আমদানির উপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি স্থানীয় বাজারেও প্রভাব ফেলছে।
কৃষি আবাদে মনোযোগ কেন প্রয়োজন
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করতে হলে আমাদের খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য স্থানীয়ভাবে কৃষি আবাদ বাড়ানোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
১. খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদি দেশীয় উৎপাদন চাহিদা পূরণ করতে পারে, তবে আমদানির উপর নির্ভরশীলতা কমবে। এতে স্থানীয় বাজারে পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
২. আমদানি ব্যয় হ্রাস
বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চাল, ডাল, তেল এবং অন্যান্য খাদ্যপণ্য আমদানি করে। কৃষি আবাদ বৃদ্ধি করলে এই আমদানি ব্যয় কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
৩. কৃষকের আর্থিক উন্নয়ন
স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি আবাদ বৃদ্ধি পেলে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত ফসল ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারবে। এটি কৃষকের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাবে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান বাড়াবে।
৪. কর্মসংস্থান সৃষ্টি
কৃষি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে তা গ্রামীণ অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের প্রসারও দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
করণীয় পদক্ষেপ
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে এবং কৃষি আবাদ বৃদ্ধির জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এগুলো হলো:
১. উন্নত কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার
কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত বীজ, সার এবং সেচ প্রযুক্তির প্রয়োগে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব। কৃষকদের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তি সরবরাহ করা গুরুত্বপূর্ণ।
২. সরকারি প্রণোদনা বৃদ্ধি
সরকারকে কৃষিক্ষেত্রে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে সারের দাম কমানো, সেচ সুবিধা সহজলভ্য করা এবং কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
৩. পতিত জমি চাষের আওতায় আনা
দেশে এখনও বিপুল পরিমাণ পতিত জমি অনাবাদী রয়েছে। এই জমিগুলো চিহ্নিত করে চাষের আওতায় আনতে হবে। এর মাধ্যমে উৎপাদন বাড়বে এবং জমি ব্যবহারের সর্বোচ্চ কার্যকারিতা নিশ্চিত হবে।
৪. কৃষি-শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ
কৃষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, জৈব পদ্ধতি এবং টেকসই চাষাবাদের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
৫. খাদ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ
অনেক সময় উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। সঠিক সংরক্ষণ সুবিধা এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে এই অপচয় রোধ করা সম্ভব।
৬. জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি খাতে নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। টেকসই কৃষি প্রণালী এবং জলবায়ু সহনশীল ফসল উৎপাদনের জন্য গবেষণা বাড়ানো জরুরি।
অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা
কৃষি আবাদ শুধু খাদ্য নিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে না, এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়বে এবং রপ্তানি ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হবে।কৃষির সাথে সম্পর্কিত শিল্পগুলো যেমন ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং এবং পরিবহন ক্ষেত্রেও ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
কৃষি আবাদে জনগণের ভূমিকা
সরকারের পাশাপাশি দেশের সাধারণ জনগণেরও কৃষি আবাদে ভূমিকা রাখতে হবে। ছোট ছোট পরিবারিক কৃষি উদ্যোগ, যেমন ছাদ বাগান বা গ্রামীণ এলাকায় পুষ্টিকর শস্য উৎপাদন, স্থানীয় খাদ্য সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
প
রিশেষে-দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মতো জাতীয় সংকট মোকাবিলায় কৃষি আবাদ বৃদ্ধিই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো গেলে তা দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ে একটি সুসংগঠিত কৃষি নীতিমালা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি। এ ক্ষেত্রে আমরা যদি সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারি, তবে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
লেখকঃ প্রভাষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
নারায়ণগঞ্জ কলেজ, নারায়ণগঞ্জ
