নিজস্ব প্রতিনিধি:
ইমানুয়েল কান্ট—আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে এক আলোছায়ার নাম। যুক্তিবাদ, নৈতিকতা, স্বাধীনতা ও মানবচেতনার প্রকৃতি—এসব প্রশ্নে তিনি যে দৃষ্টিভঙ্গি সূচনা করেছিলেন, তা আজও দার্শনিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর গ্রন্থ Critique of Pure Reason, Critique of Practical Reason এবং Critique of Judgment শুধু দর্শনকে নয়, বিজ্ঞান, রাজনীতি, সমাজচিন্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রকে নতুন কাঠামো দিয়েছিল।—শৈশব ও গঠনকাল১৭২৪ সালে প্রুশিয়ার (বর্তমান রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ) কোয়েনিগসবার্গে জন্ম নেওয়া কান্ট ছিলেন মধ্যবিত্ত, ধর্মপরায়ণ পিতামাতার ছেলে। তাঁর শিক্ষা শুরু হয় কঠোর শৃঙ্খলাবদ্ধ লুথেরান পরিবেশে।
ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন লাজুক, শান্ত ও অধ্যয়ননিবিড়।অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে মাঝে মাঝে পড়াশোনা থেমে গেলেও কান্ট কখনো চিন্তা থামাননি। তিনি গৃহশিক্ষকতা করে নিজের পড়ার খরচ জোগাতেন—কিন্তু বই, ভাবনা ও পর্যবেক্ষণই ছিল তাঁর আসল সঙ্গী।—জীবনযাপন: সময়নিষ্ঠার দৃষ্টান্তকান্টের জীবন ছিল একেবারেই নিয়মতান্ত্রিক। বলা হয়—তাঁর রোজ বিকেলের হাঁটা দেখেই শহরের মানুষ সময় মিলিয়ে নিত।তিনি কখনো নিজ শহর কোয়েনিগসবার্গ ছাড়েননি, কিন্তু তাঁর চিন্তা ছড়িয়ে গেছে পুরো পৃথিবীতে।—জ্ঞানের সীমা নিয়ে কান্টের বিপ্লবী ধারণাকান্টের সবচেয়ে বিখ্যাত ধারণা:“মানুষ জগতকে যেমন আছে তেমনটি দেখে না—বরং নিজের মনের কাঠামো দিয়ে পৃথিবীকে বোঝে।”এটি ছিল দর্শনে এক বিপ্লব।তিনি দেখালেন—অভিজ্ঞতা ছাড়া জ্ঞান অসম্ভব, কিন্তুঅভিজ্ঞতাকে সংগঠিত করে আমাদের মনের নিজস্ব কাঠামো।
এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বলা হয় ট্রান্সসেন্ডেন্টাল আদর্শবাদ (Transcendental Idealism)।—নৈতিকতা: “ক্যাটেগোরিকাল ইম্পারেটিভ”নৈতিক দর্শনে কান্টের অবদান আরও অসাধারণ। তাঁর মতে, নৈতিকতা কোনো অনুভূতি বা লাভক্ষতির হিসাব নয়; এটি যুক্তির নির্দেশ।তিনি বলেন—“এমন আচরণ করো, যা তুমি চাও—সেটা যেন সবার জন্য সর্বজনীন নিয়ম হতে পারে।”এটিই তাঁর বিখ্যাত Categorical Imperative।এই চিন্তা আজও আইনশাস্ত্র, মানবাধিকার, নীতিশিক্ষা ও নৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি।—স্বাধীনতা ও মানব মর্যাদাকান্ট মানুষকে দেখেছেন “নিজেকে নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম যুক্তিসম্পন্ন সত্তা” হিসেবে।তাঁর মতে—স্বাধীনতা হলো নৈতিকতার পূর্বশর্ত।প্রতিটি মানুষই “উদ্দেশ্য”—কখনোই “উপায়” নয়।এই ধারণা আধুনিক গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সমতার ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।—ধর্ম, বিজ্ঞান ও মানবসভ্যতাকান্ট একদিকে ধার্মিক ছিলেন, অন্যদিকে যুক্তিবাদী।
তিনি বিশ্বাস করতেন—ধর্মকে টিকে থাকতে হলে যুক্তির সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে হবে।বিজ্ঞানে নিউটনের প্রভাব তাঁর ওপর গভীর ছিল; তিনি মহাবিশ্ব, সৌরজগত ও ভূতত্ত্ব নিয়েও লিখেছিলেন।—শেষজীবনজীবনের শেষদিকে কান্ট ছিলেন শারীরিকভাবে দুর্বল কিন্তু মানসিকভাবে সচেতন।১৮০৪ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শেষ কথা ছিল—“Es ist gut.” – “এটি ভাল।”—কেন আজও কান্টকে মনে রাখা হয়?যুক্তিবাদ ও মানবচেতনার সীমা নির্ধারণ করেছেন তিনি।আধুনিক নীতিশাস্ত্রের ভীত গড়েছেন।স্বাধীনতা, মানবমর্যাদা ও সার্বজনীন নৈতিকতার ধারণা দিয়েছেন।বিজ্ঞান ও দর্শনের সেতুবন্ধন ঘটিয়েছেন।কান্ট এমন এক দার্শনিক, যিনি মনে করিয়ে দেন—“মানুষের মূল্য তার চিন্তা ও নৈতিকতায়।”
