ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ: সংঘাতের আগুনে জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী?
২০২৫ সাল। মধ্যপ্রাচ্য আবারও আগুনে। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ছায়াযুদ্ধ এবং প্রক্সি যুদ্ধের পর এবার উভয় দেশ মুখোমুখি। এই যুদ্ধ শুধু দুই দেশের নয়, বরং গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধের সূচনা: ফিলিস্তিন থেকে ইরান
ইসরায়েল-ইরান দ্বন্দ্বের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক গণহত্যামূলক অভিযান। গাজা এবং পশ্চিম তীরে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর মুসলিম বিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ইরান, যেটি দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনিদের পক্ষ অবলম্বন করে, এবার সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়ায় যায়।
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের একটি সামরিক গবেষণা কেন্দ্রে বিমান হামলার পরেই শুরু হয় উন্মুক্ত যুদ্ধ। জবাবে ইরান শত শত মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর ও বড় বড় শহরগুলোতে আঘাত হানে। ইসরায়েলের আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও এত বড় মাত্রার আক্রমণের চাপ নিতে পারছে না।
যুদ্ধের বাস্তব চিত্র: ধ্বংস, হতাহত ও আতঙ্ক
ইসরায়েলের হাইফা, তেল আবিব, অ্যাশডড, ও বিয়ের শেভা শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, বেসামরিক নাগরিকরা গ地下 বাঙ্কারে আশ্রয় নিচ্ছেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী পাল্টা হামলা চালাচ্ছে, তবে প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান ও তার মিত্ররা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে।
এই যুদ্ধ শুধু দুই দেশের সীমাবদ্ধতায় নেই। হিজবুল্লাহ (লেবানন), হুথি (ইয়েমেন), এবং অন্যান্য শিয়া মিলিশিয়ারা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, এমনকি রেড সি অঞ্চল পর্যন্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: দ্বিধান্বিত সমর্থন ও কূটনৈতিক সংকট
যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েলের প্রধান মিত্র। তাই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হতেই হোয়াইট হাউস “ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে” বলে এক বিবৃতি দেয়। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়, এবং কিছু বিমানবাহী রণতরী ইসরায়েল উপকূলে মোতায়েন করা হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এবার কিছুটা দ্বিধার মধ্যে রয়েছে:
• ঘরোয়া চাপ: আমেরিকায় একাধিক শহরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে। ফিলিস্তিনে গণহত্যার ঘটনায় ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরেই বিভাজন তৈরি হয়েছে।
• আন্তর্জাতিক চাপ: ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ এবং অনেক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা চায় যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে সরাসরি না জড়ায় এবং ইসরায়েলকে সংযত রাখে।
• চীনের প্রভাব ও রাশিয়ার কৌশল: যুক্তরাষ্ট্র জানে, এই যুদ্ধ দীর্ঘ হলে চীন ও রাশিয়া এই সুযোগে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বাড়াতে পারে। ফলে ওয়াশিংটনের জন্য এটি কৌশলগতভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
তাই যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে ইসরায়েলকে সাহায্য করলেও কূটনৈতিকভাবে যুদ্ধ থামাতে চায়। তারা জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে, তবে ইসরায়েল এখনও তাতে সাড়া দেয়নি।
পরিণতি ও ভবিষ্যতের শঙ্কা
এই যুদ্ধ যদি এখনই বন্ধ না হয়, তাহলে তা এক বিশাল আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যেখানে সৌদি আরব, তুরস্ক, রাশিয়া, এমনকি ন্যাটোর কিছু সদস্যও জড়াতে পারে। এতে করে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হবে, অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে, আর হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাবে।
উপসংহার
ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ আসলে বহুদিনের পুঞ্জীভূত রোষ, দখলনীতি, ধর্মীয় বিভাজন এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ফল। যুক্তরাষ্ট্র আপাতভাবে ইসরায়েলের পাশে থাকলেও তারা জানে, এই যুদ্ধের আগুন তাদের দিকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। শান্তির পথে ফিরতে না পারলে, এই সংঘাত এক ভয়াবহ বৈশ্বিক বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
