মাদকের বিভীষিকায় ধুঁকছে যুবসমাজ

লেখক: খাইরুল ইসলাম
প্রকাশ: ১১ মাস আগে

বিশেষ প্রতিনিধি:

আলমডাঙ্গায় মাদকের বিভীষিকাময় থাবায় ধুঁকছে অসংখ্য যুবক। উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বাড়ছে মাদক গ্রহণের প্রবণতা। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে যুবসমাজ। আইনের প্রয়োগ সঠিকভাবে না হওয়ায় বেপরোয়া হয়ে উঠছে মাদক সিন্ডিকেট।

আলমডাঙ্গা থানার দেওয়া তথ্যমতে গত তিন মাসে (মে-জুলাই) উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণ গাঁজা ৪ কেজি ৫৫৯ গ্রাম, ইয়াবা ১৪৮৩ পিচ,
টাপেন্টাডল ট্যাবলেট ৪৭৫ পিচ,বুপ্রেনরফিন ইনজেকশন ২৭ এ্যাম্পুল, হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন অ্যালকোহল ১৫৩ বোতল এবং একটি মোটরসাইকেলসহ মাদক বিক্রয়ের ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৩০০টাকা জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টি মাদক মামলায় ৫৬ জনকে আসামী করে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।যার অধিকাংশ এখন আইনের ফাঁকে বেরিয়ে এসে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে । আরো আশ্চর্যের বিষয় হল গ্রেফতারকৃত অধিকাংশ যুবকই মাদকসেবী । শুধু আলমডাঙ্গা উপজেলায় যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে জেলার ক্ষেত্রে আরও ব্যাপক। এতো গেল শুধু সরকারি হিসাব, বেসরকারি হিসেবে আরো বেশি। গ্রামগঞ্জে, শহরের অলিতে গলিতে , পার্কে, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও এখন মাদকসেবীদের অভয়ারণ্য।

নিষিদ্ধ এ জগতে অস্ত্রের পর মাদকই সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা।বলা হয়ে থাকে একটা
দেশকে ধ্বংস করতে হলে যুব সমাজের হাতে মাদক তুলে দিতে হবে এবং মাদক সহজলভ্য করতে হবে । বর্তমানে আলমডাঙ্গায় তরুণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ মাদকের কবলে। এদের ফেরাতে না পারলে শুধু পরিবার ও সমাজ নয়, গোটা দেশই ধ্বংস হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন আলমডাঙ্গা উপজেলা শাখার মাদক নিরাময় বিষয়ক সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন মনে করেন, মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে।মাদকাসক্তদের জন্য যেমন রিহ্যাব দরকার, এরচেয়েও বেশি দরকার যারা মাদক বিক্রি করছে, যারা বিক্রি করাচ্ছে অর্থাৎ গড ফাদারদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি সবার আগে প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এর ৩৬(১) ধারার ১৪(খ) উপধারায় আফিম বা এ জাতীয় পদার্থের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট শাস্তির বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ১০০ গ্রামের বেশি কিন্তু ১০০০ গ্রামের কম বা সমপরিমাণ আফিম বা এই জাতীয় পদার্থ সেবন, ব্যবহার, পরিবহন, বাজারজাতকরণ বা দখলে রাখেন, তাহলে তার জন্য ন্যূনতম ৫ বছর এবং অনূর্ধ্ব ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে। আইন থাকলেও এ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই।

মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন থাকলেও, এর দুর্বল প্রয়োগের কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা সহজে পার পেয়ে যায়। মাদক মামলার বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়া, সাক্ষীর সুরক্ষা না থাকা, পুলিশের সাক্ষ্যকে আদালতে গুরুত্ব কম দেওয়া এবং আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে মাদক ব্যবসায়ীরা জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়। ফলে, আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ কমে যায় এবং মাদক ব্যবসায়ী উৎসাহিত হয়। এছাড়াও রাজনৈতিক প্রভাবসহ কিছু কারণে বাংলাদেশে মাদক সমস্যার সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মূলত তিনটি কারণে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা না দেওয়া মাদক সমাজব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে।
মাদক সিন্ডিকেট যত বড়ই হোক হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। মাদক যেমন ব্যক্তিকে ধ্বংস করতে পারে, তেমনি একটি পরিবার ও জাতিকে ধ্বংস করতে পারে। একটি পরিবার ও দেশকে ধ্বংস করতে মাদকই যথেষ্ট। মাদক সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনের কঠোর প্রয়োগ, এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা একান্তভাবে প্রয়োজন।