বিশেষ প্রতিবেদন :
দেশে যখন নির্বাচন সমাগত হয় তখন সবাই ধর্মের কথা শুনায়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নির্বাচনের সময় ভোট প্রাপ্তির প্রচারণায় ধর্মের দোহায় বা ধর্মকে ব্যবহার করা হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর ’৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে মুসলিম লীগ ভোটে জয়ী হওয়ার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে। মুসলিম লীগ পন্থী আলেমগণ ফতোয়া দিলেন—‘যারা মুসলিম লীগকে ভোট দেবে না তাদের বিবি তালাক হয়ে যাবে।’ কিন্তু সাধারণ মুসলিম জনগণ ভোট দিলেন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টকে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী পোস্টারের উপরে লেখা ছিল—‘আল্লাহ আকবার’, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’, ‘আওয়ামী লীগ জিন্দাবাদ।’ কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ’৭২ সালে বাংলাদেশ সংবিধানে ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হল। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হলে বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলিকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। সেই সাথে ১৯৭৭ সালে এক সামরিক আদেশ বলে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’, ‘দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে’ ও ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’—এ কথাগুলি যুক্ত করেন।
যা ১৯৭৯ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয়।১৯৮৮ সালে সামরিক শাসক হোসাইন মুহাম্মদ এরশাদ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী আনেন। সে সংশোধনীতে নতুন একটি উপধারা ২(ক) যুক্ত করেন। যেখানে বলা হয়—‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম হবে ইসলাম’। দেখা যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও হোসাইন মুহাম্মদ এরশাদ উভয় সংবিধান সংশোধন করে মুসলিমদের নিকট প্রিয় হতে চেয়েছেন।১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদকে সরিয়ে বাংলাদেশে একটি নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচনের দিকে যাত্রা করে। ’৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সে নির্বাচনের প্রচারণায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র স্লোগান ছিল—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ধানের শীষে বিসমিল্লাহ।
’ধর্মনিরপেক্ষতার গান শুনানো ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে দাবি করা আওয়ামী লীগ ’৯৬ সালে তাদের নির্বাচনী পোস্টারের উপরে ‘আল্লাহ আকবার’ শব্দদ্বয় ব্যবহার করে। পাশাপাশি তারা স্লোগান দিত—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, নৌকার মালিক তুই আল্লাহ।’বিএনপির বর্ষীয়াণ রাজনীতিবিদ ও প্রার্থী অলি আহমেদ ’৯৬ সালের মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে চট্টগ্রামের একটি জনসভায় বলেন—‘যারা বিএনপিকে সমর্থন করবে না তাদের ইমান নষ্ট হবে, আল্লাহর কাছে দায়ি থাকতে হবে।’ ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে হজ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
শেখ হাসিনা তখন মাথায় হিসাব পরে হাতে তসবী নিয়ে প্রার্থনারত অবস্থার ছবি দিয়ে ভোটের প্রচারণা চালিয়েছিলেন। ২০১৪ সালে তিনি বলেন—মদিনা সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে। তাছাড়া আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রধানগণ বিভিন্ন পবিত্র পুরুষের মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতেন।সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির জনাব ফয়জুল করিম বলেছেন—“হাতপাখায় ভোট দিলে সেই ভোট পাবে আল্লাহর নবি।
” আবার তাদের অন্য আরেকজন বলছেন—“যারা হাত পাখায় ভোট দেবে না তারা কাফির।”’২৩ সালে সিলেটের একটি জনসভায় আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন—“এই নৌকা নূহ নবির নৌকা।” চলমান সময়ে জামায়াতের অনেক নেতা কর্মী প্রচারণায় বলছেন—“জামাতকে ভোট দিলে বেহেশতে যাবে।”বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির আলমডাঙ্গা উপজেলার আমির শফিউল আলম বকুল ’২৫ সালের আগস্ট মাসে তাদের প্রার্থীর প্রচারণা সমাবেশে বলেন—“রাসেল ভাইয়ের ভোট একটি ভোট না, রাসেল ভাইয়ের ভোট একটি ইবাদত, এই ইবাদত হয় বলেই আমরা আমাদের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে এই ভোট করতে রাজি আছি ইনশাল্লাহ।”সুতরাং দেখা যাচ্ছে দেশের বড় দলগুলি ক্ষমতায় যাওয়ার অভিপ্রায়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ধর্মকেই বেছে নিচ্ছে।
