ছোঁয়াচে চর্মরোগ স্ক্যাবিস দ্রুত ছড়াচ্ছে, কীভাবে বাঁচবেন?

লেখক: নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১ বছর আগে

নিজস্ব প্রতিনিধি :

আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে ত্বকে বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়, যেমন শুষ্কতা, ব্রণ বা র‍্যাশ। এগুলি সাধারণত সামান্য যত্নেই সেরে যায়। তবে গরমের সময় ত্বকে ছোট ছোট লাল ফুসকুড়ি দেখলে অবহেলা করবেন না। কারণ বাংলাদেশে বর্তমানে স্ক্যাবিস নামক এই চর্মরোগটি মহামারি আকার ধারণ করছে।
বিবিসি বাংলার একটি সংবাদ অনুসারে, বাংলাদেশের কুমিল্লা ও রাজশাহীতে স্ক্যাবিস এর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং এই দুই মহানগরের সরকারি হাসপাতালগুলিতে আক্রান্ত রোগীর ভিড় বাড়ছে। যদিও এই দুটি এলাকায় এর প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে, সারা দেশেই এই চর্মরোগটি দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি বেশি মারাত্মক। চিকিৎসকদের মতে, শত শত চর্মরোগের মধ্যে স্ক্যাবিস সবচেয়ে বেশি ছোঁয়াচে। তাই দ্রুত এই রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার জেনে নিন।
স্ক্যাবিস কী এবং কীভাবে ছড়ায়?
স্ক্যাবিস হলো এক প্রকার চর্মরোগ যা সারকোপটিস স্ক্যাবি (Sarcoptes Scabiei) নামক এক ধরনের ক্ষুদ্র পরজীবী বা মাইটের কারণে হয়। এটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং এর প্রধান লক্ষণ হলো তীব্র চুলকানি।
কীভাবে ছড়ায় স্ক্যাবিস?


স্ক্যাবিস আক্রান্ত ব্যক্তির সরাসরি সংস্পর্শে, তার কাপড়চোপড়, বিছানা, তোয়ালেসহ ব্যবহৃত জিনিসপত্রের মাধ্যমে এই মাইট একজনের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়ায়। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা যেমন বস্তি, হোস্টেল—যেখানে অনেক মানুষ একসঙ্গে থাকে, সেখানে স্ক্যাবিস বেশি হয়। যারা নিয়মিত কাপড় পরিষ্কার করেন না বা নিয়মিত গোসল করেন না, তাদের মাধ্যমে এই পরজীবী সহজে আক্রমণ করে। স্ক্যাবিস নতুন কোনো রোগ নয়; এটি সারা বছরই থাকে, তবে গরমের সময় এর প্রকোপ বাড়ে।

✅ স্ক্যাবিসের লক্ষণ:

যেসব লক্ষণ দেখে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন:
১. সারা শরীরে চুলকানি হলো স্ক্যাবিসের প্রধান উপসর্গ।
২. শরীরের বিভিন্ন ভাঁজে ভাঁজে, যেমন দুই আঙুলের ফাঁক, কোমর, ঘাড়, নিতম্ব, যৌনাঙ্গ, হাতের তালু, কব্জি, বগলের নিচে, নাভি ও কনুই—এসব স্থানে স্ক্যাবিসের সংক্রমণ বেশি হয়।
৩. ত্বকে ছোট ছোট লাল দানাদার র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি ওঠে, যা খুব চুলকায়। অনেক ক্ষেত্রে র‍্যাশগুলো থেকে পানির মতো তরল বের হতে পারে।
৪. সাধারণত রাতে চুলকানি বেশি হয়।
৫. আক্রান্ত স্থানে চুলকানির ফলে ক্ষত হতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে অন্য সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি দেখা দেয়।
৬. এই রোগের উপসর্গ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ও শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সময় ভিন্ন হতে পারে।
শিশুদের ওপর স্ক্যাবিসের প্রভাব
১. ঘুমের ব্যাঘাত: স্ক্যাবিস হলে বিশেষ করে রাতে বেশি চুলকানি হয়, যা শিশুর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। অনেক শিশু চুলকাতে চুলকাতে ঘুম থেকে জেগে ওঠে এবং যন্ত্রণায় কান্নাকাটি করে।
২. চামড়ায় ফুসকুড়ি ও ক্ষত: স্ক্যাবিস হলে ঘর্ষণ এবং চুলকানোর ফলে চামড়ায় ঘা ও ইনফেকশন হতে পারে। কখনও কখনও চামড়ার নিচে পুঁজ জমে যেতে পারে।
৩. এটি মারাত্মক ছোঁয়াচে একটি রোগ। তাই পরিবারের কারও স্ক্যাবিস থাকলে শিশু সহজেই আক্রান্ত হবে। কিন্তু উপসর্গে ভিন্নতা থাকায় বা শিশুর শরীরে ঘামাচি থাকলে রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়ে যেতে পারে।
৪. দীর্ঘদিন থাকলে সেকেন্ডারি ইনফেকশন: স্ক্যাবিসের সঠিক চিকিৎসা না হলে শরীরে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ, সেলুলাইটিস, এমনকি শিশুর কিডনির সমস্যাও হতে পারে।
৫. মানসিক অস্বস্তি: অতিরিক্ত চুলকানি ও অস্বস্তির কারণে শিশুর মানসিক চাপ ও অস্থিরতা তৈরি হয়।


✅স্ক্যাবিস থেকে বাঁচার উপায়:
১. চিকিৎসা: লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। এই রোগের চিকিৎসায় ডাক্তারের পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ ওষুধের নিয়মে ভুল হলে মাইট শরীর থেকে বিদায় নেবে না। চুলকানি কমানোর জন্য ঘরোয়া পদ্ধতি ব্যবহার করতে চাইলেও ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে করুন।
২. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: আক্রান্ত ব্যক্তির পোশাক, বিছানার চাদর, তোয়ালে ইত্যাদি নিত্য ব্যবহারের কাপড় গরম পানিতে ৩০ মিনিট ধরে সেদ্ধ করে ধুয়ে কড়া রোদে শুকান। সম্ভব হলে এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিসপত্র থেকে ৩ দিন পর্যন্ত দূরে থাকতে হবে, কারণ রোগ সৃষ্টিকারী মাইটটি দুই থেকে তিন দিন বেঁচে থাকে। সাবান দিয়ে গোসল করার পর শরীর ভালো করে মুছে শুকিয়ে নিন।
৩. একসঙ্গে চিকিৎসা: পরিবারের সকল সদস্যকে একসঙ্গে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। এমনকি উপসর্গ না থাকলেও আপনি যদি আক্রান্ত কারো সংস্পর্শে এসে থাকেন, তাহলে চিকিৎসা নিন।
৪. নিয়মিত হাত ধোয়া ও শরীর পরিষ্কার রাখা: বাইরে থেকে বাসায় ফিরে সবার আগে ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন। এতে পুনরায় ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
৫. বিশেষ পরামর্শ: শিশুদের জন্য শিশু বিশেষজ্ঞ এবং গর্ভবতী নারীদের গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ এই রোগের ওষুধগুলো শিশু ও নারীদের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
৬. ঘর-বাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা: শুধু পরনের কাপড় নয়, ঘরের অন্যান্য স্থান, বিছানার চাদর, পর্দা—এসবও নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
৭. অ্যালার্জি: যেসব খাবার খেলে রোগীর অ্যালার্জি হয়, সেসব খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
৮. পুষ্টিকর খাবার: স্ক্যাবিস রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে পুষ্টিকর খাবার ও ফলের রস খেতে হবে।
৯. রোগ সেরে যাওয়ার পর ব্যবহৃত জিনিসপত্র খুব ভালোভাবে গরম পানিতে পরিষ্কার করে কড়া রোদে শুকিয়ে নিন।
স্ক্যাবিস সৃষ্টিকারী মাইটটি শরীরে ঢোকার প্রায় দুই থেকে তিন সপ্তাহ পরে এর লক্ষণ দেখা যায়। তাই আপনার লক্ষণ না থাকলেও নিয়মিত নিজেকে পরিষ্কার রাখুন এবং আক্রান্ত কারো সংস্পর্শে এলে যথাযথ সাবধানতা অবলম্বন করুন। সুস্থ থাকুন।