স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট:
সবচেয়ে বড় তেলভাণ্ডারের একটি ভেনেজুয়েলা—বছরের পর বছর রাজনৈতিক সংকট, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে দেশটির বিশাল তেলসম্পদ যেন পড়ে ছিল অন্ধকারে— এবার সেই তেলভাণ্ডারের দরজা খুলতে যাচ্ছে— আর দরজার ওপাশে সবচেয়ে শক্তিশালী উপস্থিতি নিয়ে দাঁড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে একটি বড় ধরনের তেলচুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের ভাষায়, এটি ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেলচুক্তি।’ চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো—ভেনেজুয়েলার প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল প্রমাণিত তেল মজুতের ওপর যুক্তরাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ পেতে যাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ শুধু একটি দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি বিশ্ব জ্বালানি রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির তেলশিল্প নানা সংকটে জর্জরিত। উৎপাদন কমেছে, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তেলশিল্পের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে।নতুন চুক্তির মাধ্যমে সেই শিল্পে আবার বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢোকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, চুক্তির ফলে ভেনেজুয়েলায় প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ আসতে পারে। অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু তেল কেনাবেচার চুক্তি নয়— এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তেলক্ষেত্র উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করার একটি বড় পরিকল্পনা।
ভেনেজুয়েলার কাছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রমাণিত তেলসম্পদ রয়েছে। কিন্তু বিপুল মজুত থাকা সত্ত্বেও দেশটি দীর্ঘদিন ধরে তার পূর্ণ অর্থনৈতিক সুবিধা নিতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই তেলসম্পদ কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের জ্বালানি বাজারে তেলের দাম, সরবরাহ ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব— সবকিছুর সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ জড়িয়ে আছে। ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে বড় ধরনের মার্কিন বিনিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে ওয়াশিংটনের হাতে বিশ্ব জ্বালানি রাজনীতির আরেকটি শক্তিশালী হাতিয়ার চলে আসতে পারে।চুক্তিটি ভেনেজুয়েলার জন্যও বড় অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে— দেশটির তেলশিল্পে নতুন বিনিয়োগ এলে পুরোনো অবকাঠামো সংস্কার, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে প্রশ্নও কম নয়। একটি দেশের প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বিদেশি শক্তির ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ’ কতটা সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ— এই প্রশ্ন ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।বিশ্লেষকদের কাছে এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত তেল নয়— ক্ষমতার ভারসাম্য। ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য শক্তির মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা রয়েছে। দেশটির তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়লে লাতিন আমেরিকায় ওয়াশিংটনের অবস্থানও শক্তিশালী হতে পারে— অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলা যদি বিপুল বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে তার তেল উৎপাদন পুনরুদ্ধার করতে পারে, তাহলে দেশটির অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে। অর্থাৎ একই চুক্তিতে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র পেতে পারে জ্বালানি ও ভূরাজনৈতিক সুবিধা— অন্যদিকে ভেনেজুয়েলা পেতে পারে প্রয়োজনীয় পুঁজি ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সুযোগ।
তবে এই চুক্তির বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে এর বিস্তারিত কাঠামোর ওপর। যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ নেবে, কোন কোন মার্কিন কোম্পানি বিনিয়োগ করবে, তেল থেকে ভেনেজুয়েলা কতটা আয় পাবে এবং চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি শর্ত কী— এসব প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে এটি সত্যিই কতটা ঐতিহাসিক।৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল, প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেলভাণ্ডার— সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।তেলের নিচে যে সম্পদ এতদিন ঘুমিয়ে ছিল, সেটি এবার শুধু ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকেই নয়— বিশ্বের জ্বালানি ও ভূরাজনীতির মানচিত্রকেও বদলে দিতে পারে।ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেল মজুতের পরিমাণ প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল।
অন্যদিকে বাংলাদেশের দৈনিক তেল ব্যবহারের পরিমাণ আনুমানিক ২ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল। বাংলাদেশ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল তেলসমমানের জ্বালানি ব্যবহার করে। ৩৬৫ দিনে বাংলাদেশের প্রয়োজন হয়— ২,৭০,০০০ × ৩৬৫ = ৯৮,৫৫০,০০০ ব্যারেল। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৯ কোটি ৮৬ লাখ ব্যারেল। এবার ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলকে বাংলাদেশের বার্ষিক ব্যবহারের সঙ্গে তুলনা করলে—৬৫,০০০,০০,০০০ ÷ ৯৮,৫৫,০০০ ≈ ৬৬০ বছর। অর্থাৎ তাত্ত্বিকভাবে, বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবহারের হার অপরিবর্তিত থাকলে ভেনেজুয়েলার ওই ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল দিয়ে প্রায় ৬৬০ বছর বাংলাদেশের বর্তমান মাত্রার চাহিদা মেটানো সম্ভব। বাংলাদেশের নিজস্ব তেলসম্পদ ভেনেজুয়েলার মতো নয়। ফলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় অংশই আমদানিনির্ভর।এই জায়গাতেই ভেনেজুয়েলার ঘটনা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে— একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা নিজের হাতে থাকা উচিত?
বিশাল তেলভাণ্ডার থাকা যেমন একটি দেশের জন্য শক্তি, তেমনি আমদানিনির্ভরতা হতে পারে বড় দুর্বলতা—আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে কিংবা যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক সংকটে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে।তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ৬৬০ বছরের হিসাবটি একটি গাণিতিক তুলনা মাত্র— ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত মজুত মানেই সব তেল একসঙ্গে উত্তোলন করা সম্ভব নয়। তেল উত্তোলনের সক্ষমতা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, অবকাঠামো এবং সময়— সবকিছুর ওপর প্রকৃত উৎপাদন নির্ভর করে।
অতীতে তেলের কারণে ভেনেজুয়েলার সরকার বিপুল বৈদেশিক আয় পেতে শুরু করে। ফলে অর্থনীতির অন্যান্য খাত— বিশেষ করে কৃষি ও উৎপাদনশীল শিল্প—তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তেল যখন অর্থনীতির প্রধান ভরসা হয়ে যায়, তখন দেশের আয়, সরকারি ব্যয় এবং আমদানি— সবকিছু তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। IMF-এর গবেষণাতেও দেখা গেছে, তেলের প্রাচুর্য বেসরকারি সঞ্চয় ও বিনিয়োগের প্রবণতা কমিয়ে দিতে পারে এবং অর্থনীতির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিকে সরকারের ব্যয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল করে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে একে বলা হয় “Resource Curse” (প্রাকৃতিক সম্পদের অভিশাপ) এবং এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ “Dutch Disease” (ডাচ ডিজিজ)। ভেনেজুয়েলায় ২০১৪ সালের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির তেল উৎপাদন ও তেল-রাজস্বও মারাত্মকভাবে কমে যায়।
একই সময়ে তেলশিল্পের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাও সংকটকে আরও গভীর করে।ভেনেজুয়েলার সাবেক উন্নয়নমন্ত্রী ও OPEC-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা Juan Pablo Pérez Alfonzo তেলের এই বিপদকে এতটাই গভীরভাবে বুঝেছিলেন যে তিনি তেলকে বলেছিলেন— “the devil’s excrement” — “শয়তানের বিষ্ঠা।” কারন তাঁর আশঙ্কা ছিল তেলের বিপুল অর্থ একটি দেশকে উন্নত করার পরিবর্তে অতিরিক্ত ভোগ, দুর্নীতি ও নির্ভরশীলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকও ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতাকে resource curse-এর গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
নরওয়ে তেল পেয়েছে— কিন্তু তেলের আয়কে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ, সার্বভৌম তহবিল ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর করেছে নরওয়ে। ফলে একই প্রাকৃতিক সম্পদ এক দেশে আশীর্বাদ, আর অন্য দেশে বিপদ হতে পারে। নির্ভর করে বিষয়টি একেবারে দেশের ড্রাইভার আর দশের মানসিকতার উপর— অর্থকে ক্যাপিটাল হিসাবে অর্জন করবে— না, অর্জনকে ভোগে বিলিয়ে দেবে। অতীতে ভেনেজুয়েলা তেলঅর্জনকে ভোগে বিলিয়ে দেয়— ফলে গরীব হতে হয় তাদেরকে— ভেনেজুয়েলার সমস্যা ছিল গরিব হওয়া নয়— সমস্যা ছিল এত বেশি সম্পদ পাওয়া যে, একসময় দেশটি নিজের উৎপাদনশীল শক্তির ওপর নির্ভর করাই ভুলে গেল। বড়লোকের ছেলের মতো—উত্তরাধিকার তাকে ধনী করেছিল, কিন্তু পরিশ্রমী করেনি।
কিন্তু এবার প্রশ্ন একটাই— ভেনেজুয়েলা কি তার তেলকে আবার শুধু আয় হিসেবে দেখবে, নাকি সেই আয়কে ভবিষ্যতের উৎপাদনশীল পুঁজিতে রূপান্তর করবে? কারন পৃথিবীর ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে— প্রাকৃতিক সম্পদ একটি দেশকে ধনী করতে পারে; কিন্তু শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ কোনো দেশকে উন্নত করে না। উন্নত করে সেই দেশের মানুষ, প্রতিষ্ঠান, জ্ঞান, শ্রম, শৃঙ্খলা এবং সম্পদ ব্যবহারের দূরদর্শিতা। তেলের নিচে তাই শুধু অর্থ নেই।আছে একটি দেশের ভবিষ্যৎ— আছে ক্ষমতার রাজনীতি—আর আছে পৃথিবীর জন্য একটি কঠিন শিক্ষা: সম্পদ পাওয়া সৌভাগ্য; সম্পদকে ভবিষ্যতের শক্তিতে পরিণত করা প্রজ্ঞা।
