বাংলাদেশে পুরানো রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে বাংলাদেশ জামায়তে ইসলামী অন্যতম। এ দলটি ১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট তৎকালীন বৃহৎভারতের বর্তমান পাকিস্তানের লাহোরে ইসলামিয়া পার্কে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় । বর্তমানে ধর্মীয় ভাবধারায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী’ । সারাদেশে দলটির ব্যাপক কর্মী সমর্থক রয়েছে এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭০ সালে অখন্ড পাকিস্তানের প্রথম এবং সর্বশেষ নির্বাচনে প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদে দলটি অংশগ্রহণ করে । ৭ ডিসেম্বর, ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে জামায়াত ইসলামী ১৫১ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে মাত্র ৪ টি আসনে জয়লাভ করে। ২৪ টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে তারা আসন প্রাপ্তির হিসেবে অষ্টম হলেও ভোট প্রাপ্তিতে ছিল তৃতীয় । নির্বাচনে গৃহিত মোট ভোটের ৬.০৩% ভোট জামায়াত ইসলামী পাকিস্তানের পক্ষে আসে। জাতীয় পরিষদে পূর্বপাকিস্তানে তারা কোন আসনই পায়নি। ৪টি আসনই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। কিন্তু ১৭ ডিসেম্বর, প্রাদেশিক পরিষদে জামায়ত ইসলামী পূর্বপাকিস্তানের ১টিসহ মোট ৪ টি আসনে জয় লাভ করে ।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তারা পাকিস্তানের পক্ষ গ্রহণ করে। বাংলাদেশ স্বধীন হলে দলটির রাজনৈতিক কর্মকান্ড বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়। ফলে ৭ মার্চ, ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে তারা অংশগ্রহণ করতে পারেনি। বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার কারণে জামায়াত ইসলামীর নিবন্ধনও ছিলো না। ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসে জিয়াউর রহমান সকল রাজনৈতিক দলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (IDL) নামক একটি রাজনৈতিক দলের সাথে জামায়াত ইসলাম যুক্ত হয়। এর কিছু দিন পরেই ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ
ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (IDL) নাম নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ৬ টি আসনে জয়লাভ করে। দলটি গৃহীত মোট ভোটের ১০.৭% ভোট লাভ করে। আসন ও ভোট প্রাপ্তিতে তাদের অবস্থান ছিল তৃতীয়। ১৯৭৯ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশ নামে আবার রাজনীতি করার বৈধতা লাভ করে। সে সময়ে গোলাম আজমকে দলটির আমির করা হয়, কিন্তু যুদ্ধাপরাধের তকমা থাকায় বিষটি গোপন রাখা হয়। ফলে আব্বাস আলি খানকে দলের ভারপ্রাপ্ত আমির করে তাদের দলীয় কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে ।
৭ মে, ১৯৮৬ সালে স্বৈরাচার হোসাইন মুহাম্মাদ এরশাদের শাসন আমলে তৃতীয় সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াত সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং ১০ আসনে জয়লাভ করে। এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরের ৩ তারিখে জামায়াতের ১০ জন সাংসদ পদত্যাগ করেন। এ নির্বাচনে মোট গৃহীত মোট ভোটের ৪.৬১% ভোট জামায়াত ইসলামী লাভ করে। আসন ও ভোট প্রাপ্তির হিসেবে তাদের অবস্থান ছিল তৃতীয়। উল্লেখ্য এ নির্বাচন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বর্জন করেছিল।
স্বৈরাচর হোসাইন মুহাম্মদ এরশাদের নিয়ন্ত্রণে ৩ মার্চ, ১৯৮৮ সালে চতুর্থ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । বড় রাজনৈতিক দলগুলি অভিযোগ করে এরশাদের জাতীয় পার্টির অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সমম্ভব নয় । ফলে আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ প্রায় সকল বড় রাজনৈতিক দলই নির্বাচন বর্জন করে। চতুর্থ নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসনে জয়লাভ করে। চতুর্থ জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই সকল দল নিজেদের মধ্যের ভেদাভেদ ভুলে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন শুরু করে।
বাংলাদেশের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯১ সালে। জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশ তখন ৩৫ টি আসনে প্রতিদ্বিন্দ্বিতা করে ১৮টি আসনে জয়লাভ করে। তাছাড়া ৩০টি সংরক্ষিত মহিলা আসনের মধ্যেও ২ দুটি আসন লাভ করে। কোন দলই একক সংখ্যা গোরিষ্ঠতা না পাওয়ায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জামায়তকে সাথে নিয়ে সরকার গঠন করে। পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশ গৃহীত মোট ভোটের ১২.১৩% ভোট লাভ করে। পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রাপ্তিতে দলটি তৃতীয় কিন্তু আসনের হিসেবে অবস্থান ছিল চতুর্থ ।
ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬ সালে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি) সাংবিধানিক জটিলতায় একক একটি নির্বাচন করে। সে নির্বাচনে বিএনপি ২৭৮টি আসনে জয়লাভ করে। ভোট গৃহীত হয়েছিল মাত্র-২১%। ওই নির্বাচনে জামায়াতসহ প্রায় সকল রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করে। পরে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তত্ত্ববধায়ক সরকারের দাবিতে জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাথে আন্দোলন করে। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ মাত্র ১২ দিনের মাথায় ভেঙে দেওয়া হয়। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের অধিবেশনের কার্যদিবস ছিল মাত্র চার দিন। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পরামর্শে রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ ভেঙে দিলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তত্ত্ববধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়।
১২ জুন, ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত মোট ৩টি আসনে জয়লাভ করে। মোট গৃহীত ভোটের মধ্যে জামায়াত ইসলামী ৮.৬১%ভোট লাভ করেন । ভোট ও আসনপ্রাপ্তিতে তারা চতুর্থস্থান লাভ করে।
১ অক্টোবর, ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশ বিএনপির সাথে চারদলীয় জোট করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। জোটের কল্যাণে দলটি এবার ১৭টি আসনে জয়লাভ করে। তবে তাদের ভোটের পরিমান পূর্বের তুলনায় কমে যায়। গৃহীত মোট ভোটের ৪.২৮% ভোট লাভ করে। আসনপ্রাপ্তির দিক দিয়ে জামায়াত ইসলামীর অবস্থান তৃতীয় হলেও ভোটের হিসেবে অবস্থান হয় চতুর্থ । জোটের শর্তানুযায়ী জামায়াত ইসলামীর দুজন সংসদ সদস্যকে সরকাররের দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এই প্রথম জামায়াত ইসলামীর পক্ষ থেকে মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ লাভ করল।
২৯ ডিসেম্বর, ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারো জামায়ত ইসলামী বাংলাদেশ চারদলীয় জোটের অংশ হিসেবে নির্বাচন করে এবং দুটি আসনে জয় পায়। গৃহীত মোট ভোটের মাত্র ৪.৭% ভোট পায় দলটি। আসন প্রাপ্তিতে পঞ্চম কিন্তু ভোট প্রাপ্তিতে তাদের অবস্থান হয় চতুর্থ ।
৫ জানুয়ারি, ২০১৪ সালে দশম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীসহ চারদলীয় জোট ও অন্যান্য দল তা বর্জন করে। ফলে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করে।
৩০ ডিসেম্বর, ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় জামায়াত ইসলামীর নিবন্ধন না থাকায় তারা বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২২টি আসনে প্রার্থী দেয়। বিএনপি আরো অনেকগুলি দল নিয়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়। কারচুপির অভিযোগে দুপুর ২ টার সময় জামায়াত ইসলামীর তৎকালীন জেনারেল সেক্রেটারি জনাব শফিকুর রহমান নির্বাচন ও তার ফলাফল বর্জনের ঘোষণা দেন।
জাতীয় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৭ জানুয়ারি, ২০২৪ সালে । আওয়ামী লীগের অধীনে কোন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলসহ জোটের অন্যান্য দল এ নির্বাচনে অংশহগ্রহণ করেনি।
উপরে বর্ণিত পরিসংখ্যানের সাথে বর্তমান জামায়াতকে মেলানো ঠিক হবে না। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী ভোটের মাঠে সবচেয়ে সরব। অতীতের তুলনায় দলটি এবার অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে। তাদের ভোটের পরিমানও বেড়েছে। আগামী নির্বাচনে তারা সরকার গঠন করার চিন্তাও করছে। তবে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন দলটির ভোট বাড়লেও সরকার গঠন করার জন্য তা যথেষ্ঠ হবে না। রাজনীতিতে তারা এখনো সে সমর্থ অর্জন করতে পারেনি। আগামী নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী ব্যাপকভাবে সফল হবে । ৩০০ টি নির্বাচনী আসনের মধ্যে দলটি এককভাবে সর্বোচ্চ ৪০-৫০টি আসনে জয়লাভ করার সম্ভাবনাও রয়েছে। দলটি নির্বাচনের ইতিহাসে তাদের সবচেয়ে বড় জয় পাবে এবং প্রথমবারের মত প্রধান বিরোধী দল হবে।
খাইরুল ইসলাম: শিক্ষক,গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী।
