স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট:
নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ও পূর্ব তিমুরের রাষ্ট্রপতি José Ramos-Horta ২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাতে ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি এসেছিলেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী Muhammad Yunus-এর আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে।এটি ছিল পূর্ব তিমুরের কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের বাংলাদেশে প্রথম সরকারি সফর। ঢাকায় পৌঁছানোর পর তাঁকে লালগালিচা সংবর্ধনা (Red Carpet Reception), সশস্ত্র বাহিনীর গার্ড অব অনার এবং রাষ্ট্রীয় সালাম প্রদান করা হয়। এমনকি ড. ইউনূস নিজে বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান।
এই সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, কূটনৈতিক সহযোগিতা, ভিসা সুবিধা, দারিদ্র্য বিমোচন ও মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে আলোচনা হয়। দুই দেশ ভিসা অব্যাহতি ও নিয়মিত পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ সংক্রান্ত চুক্তিও স্বাক্ষর করে।পূর্ব তিমুরে আজও ক্যাথলিক গির্জার ঘণ্টাধ্বনি শোনা যায়, আর পাশের ইন্দোনেশিয়ায় প্রতিধ্বনিত হয় মসজিদের আজান। অনেকেই ভাবেন, এর কারণ হয়তো সাম্প্রতিক রাজনীতি। কিন্তু ইতিহাস বলে অন্য কথা। ইন্দোনেশিয়ায় ইসলাম পৌঁছেছিল আরব, পারস্য ও ভারতীয় মুসলিম বণিকদের হাত ধরে, ডাচদের আগমনের বহু আগে।
অন্যদিকে পূর্ব তিমুর দীর্ঘদিন পর্তুগিজ শাসনের অধীনে থাকায় সেখানে ক্যাথলিক ধর্ম গভীরভাবে প্রোথিত হয়।ভূগোল তাদের পাশাপাশি রেখেছে, কিন্তু ইতিহাস তাদের ভিন্ন পথে হেঁটেছে। মানচিত্রে দূরত্ব কখনো কখনো কয়েক কিলোমিটার, অথচ ইতিহাসের দূরত্ব হতে পারে কয়েক শতাব্দীর। ভূগোল প্রতিবেশী বানায়, ইতিহাস পরিচয় গড়ে।পূর্ব তিমুর বহু শতাব্দী ধরে পর্তুগালের উপনিবেশ ছিল। ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই ইন্দোনেশিয়ার দখলে চলে যায়।
দীর্ঘ ২৪ বছরের সংগ্রাম, ত্যাগ ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের পর অবশেষে ২০ মে ২০০২ সালে পূর্ব তিমুর একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নেয়। দেশটির আরেকটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হলো এর মুদ্রা। স্বাধীন হওয়ার পরও তারা নিজস্ব জাতীয় মুদ্রার পরিবর্তে মার্কিন ডলার (USD)-কে সরকারি মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করে। বিশ্বের খুব কম স্বাধীন রাষ্ট্রই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।ধর্মীয় দিক থেকেও দেশটি অনন্য। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম-প্রধান অঞ্চলের মাঝে অবস্থিত হয়েও পূর্ব তিমুরের অধিকাংশ মানুষ ক্যাথলিক খ্রিস্টান।
একটি ছোট দেশ, কিন্তু তার ইতিহাস বিশাল— সংগ্রামের ইতিহাস, আত্মপরিচয়ের ইতিহাস, এবং স্বাধীনতার মূল্য বুঝে ওঠার ইতিহাস। পূর্ব তিমুর আমাদের মনে করিয়ে দেয়— একটি জাতির শক্তি তার আয়তনে নয়, তার স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায়— এবং তার স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় কোন শক্তিধর রাষ্ট্রের স্বার্থ ও আশীর্বাদ রয়েছে। একসময় নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী José Ramos-Horta বিশ্বমঞ্চে পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের পক্ষে কণ্ঠ তুলেছিলেন। আর Muhammad Yunus দারিদ্র্য বিমোচনের নতুন পথ দেখিয়ে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেছিলেন।পূর্ব তিমুর পর্তুগালের উপনিবেশ ছিল ২০ মে ২০০২ সালে ইন্দোনেশিয়ার দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করে। এই স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন José Ramos-Horta, Xanana Gusmão এবং Carlos Filipe Ximenes Belo। তাঁদের সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ রামোস-হোর্তা ও বিশপ বেলো ১৯৯৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। Muhammad Yunus — নোবেল শান্তি পুরস্কার পান ২০০৬ সালে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত মালাক্কা প্রণালী (Strait of Malacca) পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত সমুদ্রপথ। এটি মালয়েশিয়া উপদ্বীপ এবং ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের মাঝখানে অবস্থিত। প্রণালীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০০ কিলোমিটার এবং সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে এর প্রস্থ মাত্র ২.৮ কিলোমিটার। আকারে খুব বড় না হলেও এর গুরুত্ব অসীম।ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরকে সংযুক্ত করা এই জলপথ দিয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার জাহাজ চলাচল করে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল, এশিয়ার শিল্পপণ্য এবং বিশ্বের বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এই প্রণালী অতিক্রম করে গন্তব্যে পৌঁছায়। তাই মালাক্কা প্রণালীকে অনেকেই “বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনী” বলে অভিহিত করেন।
ভৌগোলিকভাবে এটি শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়; এটি এশিয়ার অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম কৌশলগত কেন্দ্র। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহ এই প্রণালীর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। মালাক্কা প্রণালী আমাদের মনে করিয়ে দেয়— পৃথিবীর কিছু সরু জলপথই কখনো কখনো পুরো বিশ্বের অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে।মালাক্কা প্রণালী চীনের জন্য জীবনরেখার মতো। এই পথে দীর্ঘমেয়াদি বাধা সৃষ্টি হলে চীন কেবল কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুতর চাপে পড়বে। পৃথিবীর মানচিত্রে মালাক্কা প্রণালী মাত্র একটি সরু জলপথ। কিন্তু এই সরু পথ দিয়েই প্রবাহিত হয় বিশ্বের বাণিজ্যের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে চীনের জ্বালানি ও আমদানির বিশাল অংশ। চীনের জন্য সমস্যাটি হলো— মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আসা অধিকাংশ তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজকে মালাক্কা প্রণালী অতিক্রম করতেই হয়। ফলে এই একটিমাত্র পথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা চীনের জন্য একটি কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করেছে। এই দুর্বলতাকেই বলা হয় “Malacca Dilemma”।
ধরা যাক, কোনো আন্তর্জাতিক সংঘাত বা বড় ভূরাজনৈতিক সংকটের সময় এই পথ বন্ধ হয়ে গেল, অথবা জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলো। তখন চীনের জ্বালানি সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন এবং বৈদেশিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই কারণেই চীন বিকল্প বন্দর, পাইপলাইন, রেলপথ এবং নতুন বাণিজ্য করিডোর নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ করছে— Myanmar Economic Corridor.China–Pakistan Economic Corridor.স্থলপথে তেল ও গ্যাস পাইপলাইন।নৌবাহিনী শক্তিশালীকরণ। কারণ তারা জানে, একটি দেশের অর্থনীতি যত বড়ই হোক, যদি তার জীবনরেখা একটি সরু জলপথের ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে সেটি একটি কৌশলগত ঝুঁকি।
Malacca Dilemma আমাদের শেখায়— কখনো কখনো একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তির পাশেই লুকিয়ে থাকে তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতিটি শক্তিধর দেশ অন্য দেশের শক্তি ও দুর্বলতা দুটোই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যেমন চীনের এই নির্ভরশীলতাকে বোঝে, তেমনি চীনও বিকল্প পথ, বন্দর, পাইপলাইন ও অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলে সেই ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে।ভূরাজনীতির একটি চিরন্তন সত্য হলো— রাষ্ট্রগুলো শুধু নিজেদের শক্তি বাড়ায় না, সম্ভাব্য দুর্বলতাগুলোকেও কমিয়ে আনার চেষ্টা করে। আর প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো সেই দুর্বলতাগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব কখনোই উপেক্ষা করে না— বিশ্বরাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়, স্থায়ী হলো স্বার্থ।সংখ্যার ভেতরেও কখনো কখনো ইতিহাস লুকিয়ে থাকে।
১৯৯১ ইংরেজি সালে অং সান সুচি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। ৫ বছর পরে ১৯৯৬ সালে José Ramos-Horta ও Carlos Belo নোবেল শান্তি পুরস্কার পান পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের সংগ্রামের জন্য। ৬ বছর পরে২০০২ ইংরেজি সালে পূর্ব তিমুর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। ৪ বছর পরে ২০০৬ সালে Muhammad Yunus নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন দারিদ্র্য বিমোচন ও ক্ষুদ্রঋণের ধারণাকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। ১৮ বছর পরে ২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর ঢাকার মাটিতে মুখোমুখি হন ১৯৯৬ সালের নোবেলজয়ী José Ramos-Horta এবং ২০০৬ সালের নোবেলজয়ী Muhammad Yunus।সংখ্যাগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের কিছু বছর নয়। এগুলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, মানবাধিকার, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন। একজন লড়েছেন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, একজন লড়েছেন জাতির স্বাধীনতার জন্য, আর একজন লড়েছেন দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে।
মজার বিষয় হলো, এই গল্পগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার ফিরে আসে একটি শব্দ— “শান্তি”। অথচ সেই শান্তির স্বীকৃতিগুলো জন্ম নিয়েছে সংগ্রাম, সংঘাত, দখলদারিত্ব, বৈষম্য ও অস্থিরতার ভেতর থেকে। ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে সালগুলো আলাদা, কিন্তু তাদের মাঝে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো আশ্চর্য রকমের সংযুক্ত।
