{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":["local"],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":false,"containsFTESticker":false}
গবেষক ও প্রাবন্ধিকঃ
কুষ্টিয়া জেলার কুখ্যাত নীল কুঠিয়াল ছিলেন টমাস আইভান কেনি। কুষ্টিয়া শহরের কেনি রোড (স্থানীয়ভাবে বেকিদালান বা কেনির কাছারি নামে পরিচিত যা কুষ্টিয়া পৌরসভার মধ্যেই অবস্থিত) এই কুখ্যাত কুঠিয়ালের নামানুসারে আজো বিদ্যমান। বাংলার অন্যান্য জমিদার তালুকদারদের মত কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর থানার আমলাসদরপুরের জমিদার পরিবার কেনিকে নীল চাষের জন্য জমি ইজারা দেন। ধীরে ধীরে কেনি সাহেব তার এলাকায় সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। জোরপূর্বক নীলচাষের জন্য কৃষকদের সাথে কেনির মনোমালিন্য হতে থাকে। কেনির প্রধান কুঠি ছিল শালঘর-মধুয়ায়। লোকশ্রুতি মতে, কেনি সাহেবের লোলুপ দৃষ্টি পড়ছিল আমলাসদরপুরের মহিলা জমিদার পিয়ারি সুন্দরীর উপর। পিয়ারি সুন্দরী দেবী ছিলেন রামানন্দ সিংহের কনিষ্ঠা বিধবা কন্যা। অল্প বয়সেই তিনি পিতার জমিদারি অর্ধাংশ লাভ করেছিলেন। তৎকালের নীলকররা মহিলা জমিদারদের দেহভোগের একাধিক দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, টাঙ্গাইলের মহিলা জমিদার জাহ্নবী চৌধুরানীর প্রসঙ্গ। কিন্তু না, পিয়ারি সুন্দরী কেনির প্রস্তাব ও লিন্সাকে ঘৃণার চোখেই দেখেছিলেন। এমন কি পিয়ারি সুন্দরী কেনির কুমতলবে অপমানিত বোধ করেন। কেনি এখানেই থেমে থাকেননি তিনি তার নীলরাজ্যে যখন যা খুশি তাই করতেন। অমানুষিক অত্যাচার-অবিচার ছিল তার নিত্য দিনের ব্যাপার। কেনির ছিল প্রায় অর্ধশত নীলকুঠি, সর্বসমেত ছিল ৩/৪টি কনসারন। তার লাঠিয়াল বাহিনীও ছিল বেশ শক্তিশালী।
নীলচাষীরা বিভিন্ন লোক মারফত দেন-দরবার-অনুরোধ-উপরোধ করার পরও কুঠিয়ালের অত্যাচার যখন হ্রাস পায়নি তখনি ১৮৫০ সনে নীলচাষীরা জীবনের তাকিদে নীলকরের সরাসরি বিরোধিতায় চলে যান। কেনির পা-চাটা বাগদি লাঠিয়াল বাহিনীর সাথে নীল বিদ্রোহীদের সংগ্রাম চলতে থাকে। ১০ বছর বিচ্ছিন্ন সংগ্রামের পর কৃষক বিদ্রোহের নেতৃত্বদানকারী শালঘরের মৃধা ও শেখ পরিবার অত্যাচারের ভয়ে কেনির লাঠিয়াল বাগদী বাহিনী গ্রাম ত্যাগ করতে বাধ্য হযেছিলো।
ঘটনার আরো গভীরে গিয়ে বলা যায়, সাঁওতা গ্রামের বিশিষ্ট নেতা গোলাম আজম ছিলেন যেমনি সাহসী তেমনি দেশপ্রেমিক। কুঠিয়ালদের অত্যাচার-অবিচারে তিনি ব্যথাহত ছিলেন। কিন্তু নীল কুঠিয়ালদের সাথে সরাসরি যুদ্ধে যাওয়ার কোনো ক্ষমতা তার ছিল না। তিনি সাহায্য নিয়েছিলেন হামকল বাহিনীর সেনাপতি আলীজান মুন্সির। হামকল বাহিনী ছিল শহীদ তিতু মীরের অনুসারী অশ্বারোহী বাহিনী। হামকল বাহিনীর এমন ট্রেনিং ছিল এরা অনায়াসে নীলকুঠি ও জমিদারদের কাছারি বাড়ি, নীলের গোলা ধ্বংস সাধন করতে পারতেন। হামকল বাহিনীর আক্রমণে বাংলার বিস্তৃত অঞ্চল ছিল আন্দোলিত। এরা প্রজার বন্ধু কিন্তু জমিদার ও নীলকরদের শত্রু। নদীয়া, যশোর, চব্বিশ পরগণা ও পাবনা জেলার শত শত নীলকুঠি ও অত্যাচারী জমিদারদের কাছারি হামকল বাহিনী ধ্বংস করে। যা হোক, চাঁদুয়া হামকল ঘাঁটির সেনাপতি ছিলেন আলীজান মুন্সি। আলীজান মুন্সি কেনিকে যথাযথ শাস্তি দেওয়ার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। মূলত হামকল বাহিনী নীলকর ও জমিদারদের একই দৃষ্টিতে পরিমাপ করতো। প্রজা শোষণে জমিদার ও নীলকররা সমপর্যায়ের তাই হামকল বাহিনীর সাথে জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনীর কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়। বাংলার কোনো বড়ো জমিদার কিংবা তৎকালীন বুদ্ধিজীবী সমাজ নীল বিদ্রোহীদের কোনো সাহায্য করেননি। অবশ্য যখনি তারা নীল চাষে ইংরেজ নীলকরদের সাথে প্রতিযোগিতায় ব্যর্থ হয়েছেন, ইংরেজ কর্তৃক লাঞ্ছিত হয়েছেন, কিংবা ইংরেজ কর্তৃক পৈতৃক সম্পত্তি বিনষ্ট, গৃহ বধূ ও কন্যার শ্লীলতা হানির ঘটনা ঘটেছে তখনি নীলকরদের বিরুদ্ধে জমিদাররা প্রজাদের সাহস জুগিয়েছেন, কখনো আবার লাঠিয়াল দিয়ে নিজ স্বার্থে বিদ্রোহের ভূমিকা রেখেছেন। ১৮৬০ সনে কেনির বিরুদ্ধে সংগ্রামে উল্লেখিত কার্যকরণে আমলা সদরপুরের মহিলা জমিদার পিয়ারি সুন্দরী শত বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও মুসলমানদের জিহাদি সংগঠন হামকল বাহিনীর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন। পিয়ারি সুন্দরীর ছিল লাঞ্ছিত হওয়ার ভয় ও হারানো জমিদারি মহাল উদ্ধারের চেষ্টা। ফলে পিয়ারি সুন্দরী হামকল বাহিনীর সাথে নানা শর্তে নিজেকে যুক্ত করেন।
১৮৬০ সালের জানুয়ারিতে নীল বিদ্রোহীরা আবারো নীলকরের কুঠি আক্রমণের চেষ্টা করেন। প্রথম আক্রমণে কেনির আমলা নীলকুঠি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ঐ সময় নীলকর পক্ষের বহু লোক হতাহত হয়। কেনি সংগ্রামী বীরদের নাম ঠিকানা জোগাড় করে প্রতিশোধ নিতে ব্যর্থ হয়ে পিয়ারি সুন্দরীর ভাড়ল কাছারি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন। এসব সংগ্রামে কৃষকদের সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মধুয়া গ্রামের অসম সাহসী বীর শেখ আমির আলী ও আহমদ আলী মৃধা, সওতার গোলাম আজম, হামকল বাহিনীর দুঃসাহসিক সেনাপতি আলীজান মুন্সি প্রমুখ বীর।
কৃষকবাহিনী অর্থাৎ নীল বিদ্রোহীদের সাথে জমিদার পিয়ারি সুন্দরীর সমর্থক লাঠিয়াল বাহিনী শেষবারের মত শালঘরমধুয়া নীলকুঠি আক্রমণের সময় কেনিকে সাহায্য করার জন্য পাবনার ম্যাজিস্ট্রেট হ্যামডেন ও দারোগা মাহমুদ বকস পুলিশ নিয়ে এগিয়ে যান। কেনি পূর্বেই কুঠি ত্যাগ করে পালিয়ে যান। হ্যামডেন আহত হয়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচান। কিন্তু নীল বিদ্রোহীদের সড়কির আঘাতে নিহত হন দারোগা মাহমুদ বখস্।
দারোগা হত্যা মামলায় পিয়ারি সুন্দরী ও তার সহযোগী ছাড়াও নীল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যে মামলা হয় ঐ মামলায় নীল বিদ্রোহীদের জেল ও জরিমানা হয়। পিয়ারির জমিদারি নিলামে ওঠে। জমিদারি পরিচালনার জন্য সরকার অছি নিযুক্ত করে। অত্যাচারী ও কৃষকের ত্রাস নীলকর কেনি অন্ত্রস্ত্রোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতার এক হাসপাতালে মারা গেলে কুষ্টিয়া অঞ্চলে নীলকর বিরোধী অসমসাহসী পিয়ারি সুন্দরীর জমিদারিতেও শান্তি ফিরে আসে।
