সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি একক,স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র,যাহা “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” নামে পরিচিত হইবে। যা সংবিধানের প্রথম ভাগের ধারা ১ (এক) এ আলোচনা করা হয়েছে। প্রস্তাবনায় বলা আছে-“আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল -জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে ;আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে;। আজ চুয়ান্ন বছরের বাংলাদেশ। এত বছরেও বাংলাদেশের সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হয়নি। স্বাধীনতার পর যতগুলো নির্বাচন যে যে প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে কমবেশি সবগুলোই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। জনগণের ক্ষমতায়নে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নির্বাচন একটি ইম্পোর্টেন্ট প্রসেস। বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক সংকটময় অবস্থানে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি বিপজ্জনক। রাজনীতিবিদদের উচিত বিভক্তি বাড়ানোর বদলে বাস্তব সমস্যার সমাধানে মনোযোগ দিয়ে শাসন, অর্থনীতি ও সমাজের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা। জনগণ চায় এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ যেখানে স্বাধীন চিন্তার প্রকাশ ঘটে। সময় থাকতেই এই ভুল শোধরানো দরকার। তা না হলে মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর বিশ্বাস হারাবে।
বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশের নির্বাচন-
একটি সরকার ব্যবস্থায় যেখানে আইন, নেতৃত্ব, নীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনা, পররাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি প্রণয়ন করতে হলে জনগণ দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেজন্য নির্বাচন একটি সিগনিফিকেন্ট প্রক্রিয়া। আর এটাই গণতন্ত্র। আব্রাহাম লিঙ্কন এর মতে, “Democracy is the government of the people, by the people, for the people.”। ‘‘গণতন্ত্র হল জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য সরকার।’’ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর গণতান্ত্রীক উপায়ে নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করে। ফলে দেশে সর্বপ্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৯ থেকে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ‘দিন বদলের সনদ’ শিরোনামে নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়ন এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন। এই নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। এরপর ২০১৪ সালের সরকার গঠন করে ‘এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’ স্লোগানে ইশতেহার দিয়ে। গ্রহণ করে ১০টি মেগা উন্নয়ন প্রকল্প। কিন্তু ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালের নির্বাচনে জনগণের ভোট ব্যতি রেখে আওয়ামী লীগ প্রার্থীগন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয় ১৫৩ আসনে। যা ১৯৭৭ সালের রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের আস্থা ভোট মানে হা-না ভোটের মতই ছিল। অথচ ডিজিটাল বাংলাদেশে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি আস্থাশীল নির্বাচন দিতে পারত ক্ষমতাশীল আওয়ামী লীগ। ২০১২ সালে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার বিচার এখনো করতে পারেনি সরকার। ২০৪১ সালের উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ এবং ২১০০ সালে ‘নিরাপদ ব-দ্বীপ’ প্রণয়নের রূপরেখা নিয়ে ২০১৮ সালে ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’শিরোনামে ইশতেহার প্রণয়ন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আগের ভুল থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয় ক্ষমতাশীল আওয়ামী লীগ। সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত ৩০ ডিসেম্বর। বিএনপির পুরোনো ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামী ২২টি আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জোটসঙ্গীরা ২৮৮টি আসন পায়। আর বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্ট পায় মাত্র সাতটি। বাকি তিনটি আসন পায় অন্যান্যরা। অনিয়ম এবং কারচুপির অভিযোগ থাকার পর ও আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো দ্রুত পায়ে। ২০১৮ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পরই দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। নির্বাচনগুলোতে দলীয় প্রতীক পাওয়া জন্য অবৈধ আর্থিক লেনদেন, স্থানীয় এমপিদের প্রত্যক্ষ অবস্থান দলের মধ্যে দুটি ধারার সৃষ্টি, বহিষ্কার পালটা বহিষ্কার, সংঘাত-সংঘর্ষ,দলীয় কোন্দল দেখা যায় তীব্রভাবে। ফলে স্থানীয় নির্বাচনে জনপ্রিয় কোন প্রার্থী কিংবা ভিন্নমতের কেউ বিজয়ী হতে পারেনি। স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে দলীয়করণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার । দেশের তৃণমূলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের উন্নয়নে এটির গুরুত্ব অপরিসীম। এটি শক্তিশালী থাকলে দেশের উন্নয়নে অনন্য ভূমিকা রাখবে। অথচ এটি দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে পারত আওয়ামী সরকার।
২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের নির্বাচনে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে ইশতেহার প্রণয়ন করে দলটি। বিভিন্ন রাজনৈতিক,সামাজিক, আদর্শিক, ভূ-রাজনৈতিক,আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে দলটি অতিবাহিত করেছে বিগত ১৫ বছর। ১৫ বছরের ক্ষমতাকালে বিভিন্ন খাতে দৃশ্যত উন্নয়ন হয়েছে যেমন –তেমনি জনগণের আস্থা অর্জন করতেও ব্যর্থ হয়েছে দলটি।
১৫ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাজেট, জিডিপি ও বাজেটের আকার, সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ, খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানমূলক কার্যক্রমের উপকারভোগী, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ থেকে শতাধিক গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। ইন্টারনেট সুবিধা বৃদ্ধির সাথে সাথেই শুরু হলো ট্যাগিং রাজনীতি। ট্যাগিং রাজনীতি মূলত কোনো ব্যক্তি বা দলকে মিথ্যা লেবেল দিয়ে তাদের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া ও সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করে। ২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে ট্যাগিং রাজনীতি শুরু হয়। তখন রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজনকে কিছু সহজ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা হয়। যেমন শাহবাগী বনাম ইসলামপন্থী, ভারতপন্থী বনাম পাকিস্তানপন্থী, রাজাকার বনাম ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। এই বিভাজন শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা সামাজিক সম্পর্কেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল, যা এখনো রয়ে গেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠী, এমনকি ব্যক্তিরাও এখন একে অপরকে ভুল তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে বদনাম করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ট্যাগিং রাজনীতি যে সর্বনাশ ডেকে আনবে এবং ‘ট্যাগিং’ একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হিসেবে বৃদ্ধি পাবে তা আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবি মহল টের পাই নি কারণ তারা এক ভয়ংকর স্বজনতোষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। এমনকি আওযামী লীগ দলের জন্য কারা নিবেদিত ছিল তাদের আইডেন্টিফাই করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে দলটি। ৮১’র পর শেখ হাসিনারকে তৈরি করতে যাদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি তাদেরকে দল থেকে কিভাবে ধীরে ধীরে বের করে দেওয়া হলো, ৯১ সালে কিশোরগঞ্জ এর এডভোকেট ফজলুর রহমানকে কিভাবে পরাজিত করা হলো,লতিফ সিদ্দিকি একটা ভুল বক্তব্য দেওয়ার পর ক্ষমা চেয়েও পদত্যাগ করাতে বাধ্য করানো হলো কাদের চেতনায় আঘাত লাগার পর,জয়’কে রেডি করো রনি- বলা শেখ হাসিনা কাদের কান পরামর্শে রনিকে দল থেকে বের করে দিলেন,দলের মধ্যে একটার পর একটা ভুল সিদ্ধান্ত কাদের পরামর্শে নেওয়া হলো,এত বছর বিভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের কর্মীদের কারা লালন করলো এসব প্রশ্নের উত্তর আওয়ামী লীগের কাছে নেই।
পরিসংখ্যানগত কিছু উন্নয়ন-
২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলারে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে দারিদ্রের হার ২০ শতাংশ। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৪ শূন্য শতাংশ। করোনা মহামারির আগে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছিল ৮ দশমিক এক-পাঁচ শতাংশে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল মাত্র ৬০ বিলিয়ন ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপি’র আকার ৪৬০ দশমিক সাত-পাঁচ বিলিয়ন ডলার।২০০৫-০৬ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের আকার ছিল ৬১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাজেটের আকার ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।২০০৫-০৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি খাতে আয় হয়েছিল ১০ দশমিক পাঁচ-দুই বিলিয়ন ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ দশমিক শূন্য-আট বিলিয়ন ডলারে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল ৪ দশমিক আট-শূন্য বিলিয়ন ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদেশ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা পাঠিয়েছেন ২২ দশমিক শূন্য-সাত বিলিয়ন ডলার। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে তা ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির কারণে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪ বিলিয়ন ডলারে, যা পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য রিজার্ভ রয়েছে।সামাজিক নিরাপত্তা ও ভর্তুকিতে এগিয়েছে দেশ।২০০৫-০৬ অর্থবছরে শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ৪৫ জন। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ২২ জনে। গড় আয়ু সাড়ে ৬৪ বছর থেকে ৭৩ বছরে উন্নীত হয়েছে। সাক্ষরতার হার ৪৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৫ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ছিল ৭১ শতাংশ, তা হয়েছে ৯৯ শতাংশ।সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৩৭৩ কোটি টাকা; ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৭৬ কোটি; ২০০৫-০৬ অর্থবছরে কৃষি খাতে ভতুর্কি দেওয়া হয় ৫৯২ কোটি; ২০২২-২৩ অর্থবছর কৃষি খাতে মোট ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি; ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৭৯ লাখ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে চাল, গম, ভুট্টা ৪ কোটি ৭২ লাখ ৮৮ হাজার মেট্রিক টন। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল মাত্র ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ২৫ হাজার ৮২৬ মেগাওয়াট। সে সময় বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর হার ছিল মাত্র ৪৫ শতাংশ। ২০২২ সালে শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পেয়েছে।বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ৩৬ তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ কৃষককে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদান করা ,১ কোটি কৃষক ১০ টাকা দিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছেন। ভর্তুকির টাকা সরাসরি ব্যাংকে জমা হয়। সেচের জন্য সুলভমূল্যে বিদ্যুৎ এবং কৃষিযন্ত্র ক্রয়ে ৭০ শতাংশ ভর্তুকি পাচ্ছেন। ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে। ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রামের জনগণকে শহরের সব নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে। গ্রামেও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে গেছে।
এ পর্যন্ত ৩৫ লাখেরও বেশি মানুষকে বিনামূল্যে জমিসহ ঘর প্রদান করা হয়েছে। ২ কোটি ৫৩ লাখ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি-উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। ২০২০ সালের করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব মোকাবিলায় ২৮টি প্যাকেজের আওতায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। গার্মেন্টসসহ অন্যান্য শিল্পকারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিশ্চিত করা হয়েছে। ৫০ লাখ প্রান্তিক মানুষকে দুই দফায় আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। করোনা ভাইরাস মহামারির সময় প্রায় ৭ কোটি ৩০ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নানাভাবে উপকৃত হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠান উপকৃত হয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৬৭টি। স্বাস্থ্য খাতে ২০০৬ সালে দেশে সরকারি হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৫৭৯টি। এখন বেড়ে হয়েছে ৭১ হাজার। বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ। ৩ গুণ বেড়ে সরকারি চিকিৎসকের সংখ্যা ৯ হাজার ৩৩৮ জন থেকে হয়েছে ৩০ হাজার ১৭৩ জন।শিক্ষা খাতে সাক্ষরতার হার ২ গুণ বেড়ে ৪৫ থেকে ৭৬.৮ শতাংশ হয়েছে। কৃষিতে দানাদার শস্যের উৎপাদন এক কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন থেকে হয়েছে চার কোটি ৯২ লাখ ১৬ হাজার মেট্রিক টন। সেচের আওতাভুক্ত কৃষি জমি ৩ গুণ বেড়ে ২৮ লাখ হেক্টর থেকে এখন ৭৯ লাখ হেক্টর।
আবার দেখা যায় যে- জেন্ডার সমতা এবং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে। নারী উদ্যোক্তা তৈরি, প্রশিক্ষণ, তাদের ক্ষমতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীর অনুপাত প্রায় সমান এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থী ৩৬ দশমিক ৩০ শতাংশ। উচ্চশিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেয়া,খেলাধুলায় নারীদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ ২৪ এর আন্দোলনে এই নারীরায় ছিল সম্মুখ সারিতে। তাদের আস্থা অর্জন করতে পারে নি সরকার। রাজনীতিতে উন্নয়ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জনগণের পালস বুঝতে পারা। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে গুণগত ও মানবিক মূল্যবোধের উন্নয়ন ছিল জরুরি। চাল রপ্তানি হচ্ছে ঠিকই কিন্তু করোনা মহামারির সময় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী অবৈধ চাল মজুদের সাথে জড়িত ছিল,বাজার ছিল নিয়ন্ত্রনের বাইরে,বিভিন্ন এমপি-মন্ত্রীদের লাগামহীন কথাবার্তা ছিল অসহনীয়। যা পরবর্তীতে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়।
২০১২ সালের ১৪ মার্চ মিয়ানমারের কাছ থেকে এক লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গকিলোমিটার এবং ২০১৪ সালের ৮ জুলাই ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ পায় ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা। দুটি রায়ের ফলে বঙ্গোপসাগরে ২৮টি তেল-গ্যাস ক্ষেত্র বা ব্লক ও প্রচুর মৎস্যসম্পদ নিয়ে আবির্ভূত হলো আরেকটি নতুন ছোট বাংলাদেশের মানচিত্রে। যেখানে রয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চল এবং ২০০ নটিক্যাল মাইলের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানে বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত সমুদ্র বিজয়ের মাধ্যমে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় রয়েছে বিপুল পরিমাণে ভারী খনিজ, ২২০ প্রজাতির সাগর-উদ্ভিদ, ৩৪৭ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ৪৯৮ প্রজাতির ঝিনুক, ৫২ প্রজাতির চিংড়ি, ৫ প্রজাতির লবস্টার, ৬ প্রজাতির কাঁকড়া এবং ৬১ প্রজাতির সি-গ্রাস । যা বাংলাদেশের সমুদ্র ভিত্তিক অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠতে পারত কিন্তু সেখানে এত বছরেও দক্ষ কর্মী গড়ে তুলতে পারেনি আওয়ামী লীগ সরকার। পর্যটন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও বিশ্বমানের হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি। পরিসংখ্যান বলছে, মোট দেশজ উৎপাদনে পর্যটন শিল্পের অবদান প্রায় ৩ শতাংশ এবং রাজস্ব আয় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের পর্যটন খাতে সরাসরি কর্মরত ১৫ লাখ মানুষ। আর পরোক্ষভাবে আরও ২৩ লাখ লোক এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া দুর্গম পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পর্যটনকে আরও গতিশীল করতে খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক ভ্যালি পর্যন্ত রেল যোগাযোগ স্থাপন করতে পারত।
বিগত ১৫ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ওয়ান স্টপ সেন্টারের (এক ছাদের নিচে সব সেবা) সংখ্যা বেড়েছে সাড়ে চার হাজার গুণ। ২০০৬ সালে এ সংখ্যা ছিল দুটি।যা বর্তমানে বেড়ে হয়েছে আট হাজার ২৯৮টি। একটি দেশের উন্নয়নের চিত্র পরিমাপ করা হয় যোগাযোগ অবকাঠামো দিয়ে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন সড়ক ও রেলযোগাযোগ স্থাপনের জন্য পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু, তিস্তা সেতু, পায়রা সেতু, দ্বিতীয় কাঁচপুর সেতু, দ্বিতীয় মেঘনা, দ্বিতীয় গোমতী সেতুসহ শত শত সেতু, সড়ক, মহাসড়ক নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ করেছে সরকার। এছাড়া ঢাকায় হানিফ ফ্লাইওভার, তেজগাঁও-মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইওয়ার, কমলাপুর-শাহজাহানপুর ফ্লাইওভার, বনানী ফ্লাইওভার, টঙ্গীতে আহসানউল্লাহ মাস্টার ফ্লাইওভার, চট্টগ্রামে আক্তারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভার ও বদ্দারহাট ফ্লাইওভারসহ বহুসংখ্যক ছোট-বড় ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। যোগাযোগ খাতে জেলা, আঞ্চলিক ও জাতীয় মহাসড়ক ২০০৬ সালে ছিল ১২ হাজার ১৮ কিলোমিটার। যা এখন ৩২ হাজার ৬৭৮ কিলোমিটার হয়েছে। গ্রামীণ সড়ক তিন হাজার ১৩৩ কিলোমিটার থেকে ৭৬ গুণ বেড়ে হয়েছে দুই লাখ ৩৭ হাজার ৪৪৬ কিলোমিটার। পদ্মা সেতু বর্তমান সরকারের যোগাযোগ খাতের সবচেয়ে বড় অর্জন। আগে খুলনা যেতে সময় লাগত ৯-১০ ঘণ্টা, এখন লাগে ৩ ঘণ্টা। পদ্মাসেতু দক্ষিণাঞ্চলের ১৯ জেলাকে ঢাকার সঙ্গে সংযুক্ত করেছে, যা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ডকে করেছে আরও মজবুত। নির্মাণ খাতে ২৯ শতাংশ, কৃষি খাতে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং উৎপাদন ও পরিবহনে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছে পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতুর প্রভাবে এই অঞ্চলে দারিদ্র্য ১ শতাংশ কমেছে এবং জাতীয়ভাবে কমবে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং জাতীয়ভাবে শূন্য দশমিক ৫৬ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে। বিশ্বের মধ্যে ৬০ তম দেশ হিসেবে এবং এশিয়ার মধ্যে ২২ তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ২০২২ সালে মেট্রোরেল চালু করে। মেট্রোরেল স্থাপনের মধ্য দিয়ে প্রতিবছর ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আয় হচ্ছে। এছাড়া এ সরকারই প্রথম ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, নবীনগর-ডিইপিজেড-চন্দ্রা, ঢাকা-এলেঙ্গা মহাসড়ক চার বা তদূর্ধ্ব লেনে উন্নীত করে। ঢাকা-মাওয়া-জাজিরা এক্সপ্রেসওয়ে দেশের প্রথম এ ধরনের মহাসড়ক। এলেঙ্গা-রংপুর মহাসড়ক, আরিচা মহাসড়ক এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেল যোগাযোগ স্থাপন,যমুনা নদীর ওপর রেলসেতু নির্মাণ,শুধু বাংলাদেশেই নয়, চট্টগ্রামে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম পাতাল সড়কপথ- বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধনের মাধ্যমে আরেকটি মাইলফলক স্পর্শ করলো আওয়ামী লীগ সরকার। পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। ২০১৮ সালের মে মাসে মহাকাশে নিজস্ব স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণ করেছে সরকার। রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়া, ৫৬০ টি মডেল মসজিদ নির্মাণ করা।
আওয়ামী ভুল-
সরকার পতনের পর যে সকল স্থাপনায় আঘাত আসে তারমধ্যে পদ্মা সেতুতে আক্রমণ,মেট্রোস্টেশন ভেঙে ফেলা,বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় আক্রমণ এবং আরও বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণ অব্যাহত থাকে। তারমানে আপনি যেহেতু সরকার তাহলে অবশ্যই আপনাকে বুঝতে হবে এ দেশের মানুষ কি চাই,গত ১৫ বছরে মানুষের আক্ষেপ ছিল ভোট দিতে না পারায়। তাহলে সরকার হিসেবে প্রমাণ করতে হবে যে ৪৫% এর উপরে সবাই ভোট দিতে পারছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীদের সাথে গোপন সম্পর্ক স্থাপন করলেন,কওমী জননী উপাধি নিলেন-যেখানে দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত সৈয়দ আশরাফ বলেছিলেন যে আওয়ামী লীগের একমাত্র শত্রু জামায়াতে ইসলাম। সেখানে তাদের সাথে গোপন সম্পর্ক স্থাপন, বাংলাদেশের যেকোনো জায়গায় ৫ মিনিট হাটলে মসজিদ পাওয়া যায় সেখানে নিজস্ব টাকায় ৫৬০ টি মডেল মসজিদ নির্মাণ একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অপব্যয়। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে স্কিল অপজিশন এবং ন্যাশনাল ইস্যুতে সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্রিত করতে ব্যর্থ হয় আওয়ামী সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতীয়করণের পরিবর্তে দলীয়করণ করা। যে কারণে নিজ দল এবং নাগরিক সমাজে বৈষম্য বেড়ে যায়।
বিগত ১৫ বছর বাংলাদেশ তৈরি করলো দুর্নীতিগ্রস্থ আমলা আর প্রলুব্ধ সরকারি চাকরি। সাহিত্যে,চলচিত্রে,জাতীয় দিবস উদযাপনে,শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে,খেলাধুলায়,ওয়াজে,কীর্তনে সৃষ্টি করলো অসুস্থ্য রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। নামে বেনামে সকল মানুষের গায়ে পড়িয়ে দেওয়া হলো বঙ্গবন্ধু মুজিবকোট,বিগত ১৫ বছরে শিক্ষা ব্যবস্থা যদি ৭ বার পরিবর্তন করা হয় তাহলে সে জাতি ম্যান্টালি ডিরেনজড থাকে। অতি তেলবাজদের আওয়ামী লীগ প্রমোট করছে বিগত সময়ে। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে নিয়ে ২৫০ টির উপরে বই লিখে বিভিন্ন পর্যায়ের তেলবাজ লেখক সম্প্রদায় এবং বাগিয়ে নেন বাংলা একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক, একাডেমির মহাপরিচালকসহ উল্লেখযোগ্য বহু পুরস্কার যেখানে অলমোস্ট প্রাইজ অযোগ্যদের হাতে যায় অথচ নির্মলেন্দু গুণ এর ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ এবং সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ কবিতা দুটিই আপাত দৃষ্টিতে এনাফ বলে মনে হয়। ব্যারিষ্টার সুমন বারবার আইনি লড়াইয়ে জয়ী হয়েও ফুটবলের গডফাদার এক সালাহ উদ্দিনকে সরাতে পারেনি,প্লাস্টিক ব্যবসায়ীকে বানানো হলো পাটমন্ত্রী ,আওয়ামী লীগের পরিক্ষীত নেতাদের বাদ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হলো খেলোয়ার,ব্যবসায়ী,চলচিত্রের নায়ককে। আধুনিক শিল্পের সাথে আদি শিল্পের বিকাশ করতে পারেনি বিগত ১৫ বছরের সরকার,শ্রীমঙ্গলে অবৈধভাবে বৃক্ষ নিধন, অবৈধ বালুর ব্যবসা,জামাত-বিএনপির সাথে অবৈধ আর্থিক লেনদেন,বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে ভিসি,শিক্ষক দলীয়করণ কাজগুলো আওয়ামী লীগকে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল বিভিন্ন সময়। নিরপেক্ষ মিডিয়া তৈরিতে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বাধা তবুও ব্যবসায়ীদের এমপি-মন্ত্রী বানানো হয়েছে। ওয়ার্ড থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সকল অঙ্গসংগঠনের কমিটি ছিল জনবিচ্ছিন্ন, ১০/১২ বছরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে দলটি এবং পদ বানিজ্য ছিল নেতাদের প্যাশান । প্রায়ই নেতাই ছিল আর্থিক ও মানসিকভাবে করাপটেড। কিন্তু সুযোগ ছিল আদর্শ মুজিববাদের চর্চা করা,বাংলাদেশের ইতিহাস,ঐতিহ্য,সংস্কৃতি বিশ্বের মাঝে তুলে ধরার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ চালু করতে পারতো আন্তর্জাতিক মানের একটি ইংরেজি ওয়েবসাইট,পৃথিবীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভাষা শিখার উপড় গুরুত্ব দেয়া (যেমন ইংরেজি,আরবি,জাপানিজ,ফ্রেন্সে ইত্যাদি ) যাতে করে আমাদের দেশের প্রবাসিরা এবং উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীরা সহজেই পৃথিবীর সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং কমিউনিকেশনস স্কিল ডেভেলপ করতে পারে। এমনকি নিজ দলীয় গণতান্ত্রীক প্র্যাকটিস ছিল ইনভিজিবল। এখনো নগর মহানগরের সরকারি হসপিটাল গুলোতে এক সিটের বিপরীতে ৪/৫ জন রুগী থাকে কিন্তু বিগত সরকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে পারত সে সময় তাদের ছিল ,গ্যাস উত্তোলনে দক্ষ গবেষক,সমুদ্র থেকে সম্পদ আহরণে দক্ষ গবেষক,প্রযুক্তি গবেষক,বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক,আদর্শ রাজনীতিবিদ তৈরি করতে পারত। কিন্তু বিগত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ গরীব,দুখী,কামার-কুমার,জেলে,কৃষক ও মেহনতী মানু্ষের দল থেকে হয়ে উঠলো এলিটদের দল।
স্বাধীনতার পর স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা:
বাংলাদেশে স্বৈরাচার তৈরি হওয়ার বিষয়টি দীর্ঘ বছরের স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ফলাফল। পাচঁ বছর কিংবা দশ বছরে স্বৈরাচারের জন্ম হয় নি যা এখন ট্যাগিং করা হচ্ছে।কর্তৃত্ববাদী (Athoritarianism) রাজনৈতিক কার্যক্রম গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মূল্য রক্ষা করে না। স্বাধীন বাংলাদেশে যারাই ক্ষমতায় এসেছে তারাই স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যমে সমাজের অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াগুলির উপর সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যক্তিগত আধিপত্য কায়েম করেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়েই জেনারেল কে এম সফিউল্লাহকে চিফ অব স্টাফের পদ থেকে সরিয়ে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ জিয়াউর রহমানকে নিযুক্ত করে। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেই কর্নেল তাহেরসহ সেনাবাহিনীর বহুসংখ্যক সৈনিককে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করে, জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টভুক্ত দল (জাগদল) বিলুপ্ত করে ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করে এবং জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। হা-না ভোট,ইনডেমনিটি আইন পাশ,রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তন, বাঙালির পরিবর্তে বাংলাদেশী অর্থাৎ ধর্মীয় উপাদান সংযুক্ত জাতীয়তাবাদের ধারণার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীদের মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত করে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করেছেন। ২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে এরশাদ রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। ক্ষমতা দখলের পর দেশে রাজনীতি নিষিদ্ধ করে, দেশকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করাসহ ”নতুন বাংলাদেশ, গড়ব মোরা” শ্লোগান চালু করে দীর্ঘ ৯ বছর সৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করে। ভাইয়ার লোক,হাওয়া ভবন,একযোগে ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা হামলা,২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা, রমনা বটমূলে বোমা হামলা, বাংলাদেশের ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর গ্রেনেড বোমা হামলাসহ আরও অনেক সৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা ছিল ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত পাঁচ বছরে। যা খালেদা জিয়ার জীবনী কাহিনী নিয়ে বই প্রকাশ করা সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ বলেন, “এই সময়টিতে কিছু কিছু দুষ্টু লোক শাসন পদ্ধতিতে ঢুকে কিছু কিছু কাজকর্ম করেছে যেটার দায় গিয়ে তাঁর ওপর পড়েছে। সে সময় যদি তিনি সরকারকে সুশাসনের পথে আরো এগিয়ে নিতে পারতেন দৃঢ়তার সঙ্গে, তাহলে পরবর্তী পর্যায়ে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলো ঐভাবে ঘটতো না। বিশেষজ্ঞদের মতে একটি সরকারের শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সে দেশের হরতাল,অবরোধ,জঙ্গী হামলা থেকে দেশকে মুক্ত রাখা এবং আন্তর্জাতিকভাবে এই ভাবমূর্তি টিকিয়ে রাখা যা বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশ সরকার দমন করতে পেরেছে। দীর্ঘ ও টানা ক্ষমতায় থাকা এই দলটি বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে ঠিকই কিন্তু ঘুষ এবং বাড়তি খরচ দেখিয়ে দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থের অপচয় হয়েছে বলেও সমালোচনা রয়েছে। পাবলো পিকাসো বলেছিলেন-‘সৃজনশীলতার প্রধান শত্রু হচ্ছে অতিপ্রশংসা’। যা আওয়ামী লীগ সরকারকে শত্রুতে পরিণত করেছে। শুধু ইমোশনস দিয়ে ত আপনি লাইফই ক্যারি করতে পারবেন না আর রাষ্ট্র এটা ত আরও বিশাল,এ জাতি আবেগে থাকে আর বাস্তবে হাটে, আর রাষ্ট্র তো স্টেবল কিছু না, রাষ্ট্র হলো একটা ক্রিয়াশীল যন্ত্র,তাকে অপারেট করতে হয় আর যে অপারেট করে তাকে জানতে হয় কোথায় থামতে হয়। আপনি বিশ্বের মানচিত্রে উন্নয়নের ডানায় উড়তে থাকলেন আবেগ নিয়ে কিন্তু থামলেন না থেমে গেলো আমাদের নদী। স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান খাল কাটার প্রকল্প হাতে নিলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তারপর আওয়ামী সরকার নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নদী খনন এবং হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন কিন্তু ঢাকাকে ভেনিস করার যে পরিকল্পনা তা বাস্তবায়ন হয়নি এমনকি নদীামাতৃক বাংলাদেশে অভিশাপ হয়ে প্রবাহিত হতে থাকলো নদীগুলো। সম্প্রতি প্রথম আলোর একটা রিপোর্ট ছিল এরকম যে- জাতিসংঘ থেকে সেনাবাহিনীর উপর নিষেধাজ্ঞা আছে জুলাই পরিস্থিতিতে জড়ালে পরবর্তীতে মিশন বন্ধ করে দেওয়া হবে। তাহলে কি আপনাকে এভাবেই থামানো হলো। কাজী নজরুল ইসলাম ইসলাম যথার্থ বলেছেন-
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানেনা সন্তরণ,
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ!
