পেট্রোডলার: ডলারের অদৃশ্য শক্তি ও বিশ্ব রাজনীতির খেলা।

লেখক: এমরানুর রেজা
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক:

বিশ্বে শক্তিধর রাষ্ট্রের কথা উঠলে প্রথমেই মনে পড়ে সামরিক শক্তির কথা— আধুনিক যুদ্ধবিমান, বিমানবাহী রণতরী, পারমাণবিক অস্ত্র। কিন্তু বাস্তবে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির এক গভীর শক্তি রয়েছে, যা চোখে দেখা যায় না। সেই শক্তির নাম পেট্রোডলার ব্যবস্থা। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে এই ব্যবস্থাই আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের আধিপত্য বজায় রেখেছে। তেল ও ডলারের এই অদৃশ্য জোট কেবল অর্থনীতিই নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির গতিপথও নির্ধারণ করেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে ১৯৪৪ সালে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রে থাকবে মার্কিন ডলার।তখন ডলারের মূল্য স্বর্ণের সাথে যুক্ত ছিল। অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিমাণ ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল।কিন্তু ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Richard Nixon ডলারের সাথে স্বর্ণের সম্পর্ক ভেঙে দেন। ফলে ডলার সম্পূর্ণ আস্থাভিত্তিক মুদ্রায় পরিণত হয়। অনেক অর্থনীতিবিদ তখন মনে করেছিলেন, এতে ডলারের আন্তর্জাতিক প্রভাব কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টো ঘটনা।

১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও Saudi Arabia একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছায়। সেই সমঝোতায় সৌদি আরব প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করবে শুধুমাত্র মার্কিন ডলারে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে সামরিক সুরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতা দেবে।এরপর বিশ্বের অন্যান্য বড় তেল উৎপাদক দেশও একই নিয়ম অনুসরণ করতে শুরু করে। এভাবেই গড়ে ওঠে পেট্রোডলার ব্যবস্থা— যেখানে তেলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা হয়ে ওঠে মার্কিন ডলার।

১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে যে অর্থনৈতিক-নিরাপত্তা সমঝোতা হয়, তার পেছনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেন রাজা ফয়সাল, আর তেলনীতি ও আলোচনায় বড় ভূমিকা রাখেন তেলমন্ত্রী আহমেদ জাকি ইয়ামানি। মক্কার একটি ইসলামী আইনজ্ঞ পরিবারের মধ্যে জন্ম নেওয়া Ahmed Zaki Yamani প্রথমে ইসলামী আইন অধ্যয়ন করেন। পরে তিনি Cairo University থেকে আইনে ডিগ্রি এবং তুলনামূলক আইনশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন New York University ও Harvard Law School থেকে। তিনি সৌদি আরবের প্রথম ব্যক্তি যিনি একটি বেসরকারি আইন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর আইনি দক্ষতা ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞার কারণে তিনি দ্রুতই সরকারি পদমর্যাদায় উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হন।তেল আধুনিক সভ্যতার প্রধান জ্বালানি। শিল্প, পরিবহন, কৃষি— সবখানেই এর ব্যবহার অপরিহার্য। যখন তেলের বাণিজ্য ডলারে নির্ধারিত হলো, তখন বিশ্বের প্রায় সব দেশকেই তেল কিনতে আগে ডলার সংগ্রহ করতে হয়। ফলে বৈশ্বিক বাজারে ডলারের জন্য একটি স্থায়ী চাহিদা তৈরি হয়।

এই ব্যবস্থার ফলে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি বড় সুবিধা পায়— প্রথমত, ডলারের শক্তি বজায় থাকে, কারণ বিশ্বজুড়ে তার চাহিদা রয়েছে।দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক কম সুদে ঋণ নিতে পারে, কারণ অনেক দেশ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিসেবে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড কিনে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সহজ হয়, কারণ অধিকাংশ আন্তর্জাতিক লেনদেন ডলারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ডলার আয় করে। সেই ডলার তারা আবার বিনিয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে—ট্রেজারি বন্ড, কোম্পানির শেয়ার, রিয়েল এস্টেট বা আর্থিক বাজারে।

ফলে একটি অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হয়— ডলার দিয়ে তেল কেনা হয়। তেলের ডলার আবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ফিরে আসে। ডলার শক্তিশালী থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রভাব বজায় থাকে।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে BRICS জোটের দেশগুলো নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি China তেল কেনাবেচায় ইউয়ান ব্যবহারের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক একে “পেট্রোইউয়ান” ব্যবস্থার সূচনা বলেও উল্লেখ করছেন। অন্যদিকে Russia ও চীন তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ডলারের ব্যবহার কমিয়ে নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন বাড়িয়েছে।সাম্প্রতিক সংঘাতের ১৫তম দিনে ইরান একটি ঘোষণা দেয়।তারা বলে— হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল করতে পারবে, কিন্তু যদি সেই তেল চীনা ইউয়ানে লেনদেন হয়। ডলারে নয়। ইউয়ানে।

বিশ্বের প্রায় ২০% তেল প্রতিদিন এই প্রণালী দিয়ে যায়। অর্থাৎ ইরান চেষ্টা করেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথকে ব্যবহার করে ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে।ডলারে লেনদেন ও “ডি-ডলারাইজেশন” প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান কিছুটা বাস্তববাদী ও মধ্যপন্থী। ভারত সরাসরি ডলারকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেয়নি, কিন্তু প্রয়োজনে বিকল্প মুদ্রায় বাণিজ্য করার পথও খুলে রেখেছে।রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারত রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কিনেছে। এই লেনদেনের অনেক অংশ ডলার ছাড়া অন্য মুদ্রা— যেমন রুপি, দিরহাম বা অন্যান্য মুদ্রায় সম্পন্ন হয়েছে। এতে ভারত একদিকে সস্তায় তেল পেয়েছে, অন্যদিকে ডলারের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, পেট্রোডলার ব্যবস্থা এখনো শক্তিশালী।

ডলার এখনও বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা। তবে ধীরে ধীরে একটি বহুমেরু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যেখানে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি নিজেদের মুদ্রার ব্যবহার বাড়াতে চাইছে। তেলের বাণিজ্য, ভূরাজনীতি এবং আর্থিক ব্যবস্থার এই পরিবর্তন আগামী দশকগুলোতে বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোকে নতুনভাবে রূপ দিতে পারে।