বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের আগে ঘোষিত এক দফার ভিত্তিতে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে, চলতি মাসের শেষ সপ্তাহেই আনুষ্ঠানিকভাবে দলের ঘোষণা আসবে।
নতুন দলের প্রস্তুতি ও কাঠামো
দলের কাঠামো, গঠনতন্ত্র, নাম ও প্রতীক নির্ধারণ নিয়ে বর্তমানে চূড়ান্ত আলোচনা চলছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা জানান, ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে নতুন রাজনৈতিক শক্তির ঘোষণা আসতে পারে। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ২৪ ফেব্রুয়ারি দল গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার সম্ভাবনা বেশি, কারণ ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা হত্যাকাণ্ড দিবস হওয়ায় সে দিনটি এড়িয়ে চলার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে, দলটি আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামকে আহ্বায়ক করার বিষয়ে প্রায় নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সদস্য সচিব পদে কাকে রাখা হবে, তা নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং সদস্য সচিব আখতার হোসেন।
নেতৃত্ব ও সম্ভাব্য চমক
এই দলে নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় নেতারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকবেন। এর মধ্যে রয়েছেন সামান্তা শারমিন, আলী আহসান জুনায়েদ, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আরিফ সোহেল এবং আব্দুল হান্নান মাসুদ।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা আনতে বিভিন্ন দলের তরুণ নেতাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কেউ কেউ দল ঘোষণার সময়ই আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিতে পারেন, আবার কেউ নির্বাচনের আগে নতুন দলে যুক্ত হতে পারেন। বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এবং ইসলামী ছাত্র সংগঠনের কিছু নেতার নতুন দলে যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
নাহিদ ইসলাম নতুন দায়িত্ব নেওয়ার জন্য উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অন্যদিকে, তরুণ উপদেষ্টাদের মধ্যে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম আপাতত পদত্যাগ করবেন না। নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নতুন নেতৃত্ব গঠনের কাজও এগিয়ে চলেছে।
দলের নাম ও প্রতীক নিয়ে আলোচনা
নতুন দলের নাম ও প্রতীক নির্ধারণের জন্য জনগণের মতামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। অনলাইন ও সরাসরি জরিপের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত দেড় লাখের বেশি মানুষ মতামত দিয়েছেন। অধিকাংশ মতামতে “নাগরিক”, “বৈষম্যবিরোধী” ও “অধিকার” শব্দগুলো সংযুক্ত নামের প্রতি সমর্থন পাওয়া গেছে। প্রতীক নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে অভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো চিহ্ন ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।
গঠনপ্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সামান্তা শারমিন জানান, নতুন দলের কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক দলগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ভারতের আম-আদমি পার্টি, তুরস্কের একে পার্টি এবং পাকিস্তানের পিটিআই-এর গঠন প্রক্রিয়া বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। দলটি যেন জনবান্ধব হয়, আবার অভ্যুত্থানের চেতনাও বহন করে, সে বিষয়টি মাথায় রাখা হচ্ছে।
নাগরিক কমিটির সহ-মুখপাত্র সালেহ উদ্দিন সিফাত জানান, নতুন দলটি জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি এবং পরিবেশসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোকে গুরুত্ব দেবে। জনগণের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে এই দল গড়ে ওঠছে, যা দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
নাগরিক কমিটি ও ছাত্র আন্দোলনের ভবিষ্যৎ ভূমিকা
জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জানিয়েছেন, নাগরিক কমিটি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন অরাজনৈতিক ফোরাম হিসেবেই কাজ করবে। কেউ চাইলে নতুন রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে পারবেন, তবে সংগঠন দুটি রাজনৈতিক চাপে রাখার ভূমিকা পালন করবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সংগঠক আব্দুল হান্নান মাসুদ জানান, দল ঘোষণার আগেই গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র চূড়ান্ত করা হবে। গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরাই নতুন দলে মূল নেতৃত্ব দেবেন, যেখানে চমকেরও ইঙ্গিত রয়েছে। দলটি সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবে এবং একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
