Bangladesh kormosongthan-earn logo
নিজস্ব প্রতিনিধি:
বাংলাদেশ সরকারের ‘এমপাওয়ারিং অ্যাকশনস ফর রেজিলিয়েন্ট নিউ জেনারেশন’ (আর্ন) প্রকল্পটি দেশের যুব সমাজের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নেতৃত্বে এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যে ৯ লাখ তরুণ-তরুণীকে, যার মধ্যে ৫ লাখ নারী, উৎপাদনশীল কার্যক্রমে যুক্ত করা। এটি কেবল কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি উদ্যোগ নয়, বরং বাংলাদেশের যুব শক্তিকে দক্ষতা, নেতৃত্ব ও আত্মনির্ভরতার পথে পরিচালিত করার একটি সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রীয় স্বপ্ন।
নিট যুব নারীরা মূল কেন্দ্রে
বর্তমানে বাংলাদেশের ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী বিশাল যুব জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ “নিট” (Not in Education, Employment, or Training) অবস্থায় রয়েছে, অর্থাৎ তারা শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা কর্মসংস্থান কোনটির সাথেই যুক্ত নন। বিশেষ করে যুব নারীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, যা প্রায় ৭০ শতাংশ। ‘আর্ন’ প্রকল্প এই বঞ্চিত গোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রকল্পের আওতায়, প্রতি ১০০ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্তের মধ্যে অন্তত ৫৫ জন হবেন নারী, যারা গ্রাম, শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসবেন। তাদের জন্য থাকবে পৃথক প্রশিক্ষণ, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল, আত্মবিশ্বাস তৈরির আয়োজন এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা।
সময়োপযোগী খাত, দক্ষতা ও ক্ষুদ্রঋণ
‘আর্ন’ প্রকল্পের মাধ্যমে যেসব খাতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, তা দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনা করে তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং
- সবুজ প্রযুক্তি
- কৃষিভিত্তিক পণ্য প্রক্রিয়াকরণ
- সৌরশক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি
- হস্ত ও কুটির শিল্প
- গার্মেন্টস সহায়ক খাত
- সেবা ও বিপণন খাত
শুধু প্রশিক্ষণই নয়, উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক-বহির্ভূত ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা, ব্যবসায়িক পরামর্শ এবং একটি পূর্ণাঙ্গ সহায়ক কাঠামোও থাকবে। এর ফলে তরুণরা প্রশিক্ষণ শেষে নিজেরাই ব্যবসা শুরু করতে পারবেন, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এবং অর্থনৈতিক প্রবাহ বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া বলেন, “বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি আমাদের যুব সমাজ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই শক্তির একটি বড় অংশ আজও কর্মবিমুখ। ‘আর্ন’ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা সেই ‘নিট’ তরুণদের, বিশেষ করে পিছিয়ে থাকা যুব নারীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে চাই, যেন তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই গড়ে তুলতে পারে।” তিনি আরও যোগ করেন, “এই প্রকল্প শুধু চাকরির ব্যবস্থা নয়, বরং এটি আত্মকর্মসংস্থান এবং নেতৃত্ব তৈরির একটি প্ল্যাটফর্ম। প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব খাত এবং নারী উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে এই কর্মসূচি বাংলাদেশকে টেকসই উন্নয়নের পথে একধাপ এগিয়ে দেবে।”
সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও মানসিক সহায়তা
আর্ন প্রকল্প কেবল অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর জোর দিচ্ছে না, বরং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, মানসিক স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিত্ব বিকাশেও গুরুত্ব দিচ্ছে। অংশগ্রহণকারীদের জন্য থাকবে:
- স্থানীয় কমিউনিটি কাউন্সেলিং সেবা
- ক্যারিয়ার গাইডেন্স ও মেন্টরশিপ
- অনলাইন তথ্য সহায়তা প্ল্যাটফর্ম
- নারী-বান্ধব কর্মপরিবেশ গঠনে পরামর্শ
- পারিবারিক বাধা মোকাবিলার কৌশল ও সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগ
বিশেষ করে যুব নারীদের জন্য আলাদা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রশিক্ষণ থাকবে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস গঠনে সহায়ক হবে।
বাস্তবায়নের কাঠামো
- বাস্তবায়নকারী সংস্থা: যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর
- সমন্বয়কারী মন্ত্রণালয়: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়
- মেয়াদ: ২০২৫-২০২৮
- লক্ষ্যমাত্রা: ৯ লাখ তরুণ (৫ লাখ নারী), ২% ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, ১% বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন
- বাজেট: সরকার ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থায়নে
- পর্যবেক্ষণ: ডিজিটাল ট্র্যাকিং, ফিল্ড রিপোর্ট ও স্বতন্ত্র মূল্যায়ন
এই প্রকল্পটি ৬টি মূল ক্যাটাগরিতে প্রশিক্ষণ প্রদান করবে এবং ‘নিট’ জনগোষ্ঠীর উপযোগী করে প্রতিটি ধাপ সাজানো হবে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক ড. শামিমা করিম বলেন, “যুব জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার জন্য ‘আর্ন’ প্রকল্প নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী প্রয়াস। নারীদের বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি এটিকে আরও সময়োপযোগী ও প্রগতিশীল করে তুলেছে।” বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্রের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের ‘নিট’ তরুণদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই নারী। এই নারীদের কর্মে ফেরাতে পারলে দেশের জিডিপিতে গড়ে ১.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি যোগ হতে পারে।
ভবিষ্যতের পথে এক সাহসী পদক্ষেপ
সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঠামোয় যদি সত্যিকারের টেকসই পরিবর্তন আনতে হয়, তবে তার মূলে থাকতে হবে দক্ষ, আত্মনির্ভর ও উদ্যমী যুব সমাজ। ‘আর্ন’ প্রকল্প সেই কাঠামো গড়ার একটি সাহসী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে শুধু ৯ লাখ তরুণ-তরুণীর জীবনই বদলাবে না—পরিবর্তনের ঢেউ পৌঁছাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও নেতৃত্ব কাঠামোর গভীরে।
যখন দেশের গ্রামে, শহরে কিংবা পাহাড়ি অঞ্চলের কোনো এক তরুণী আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলবে, “আমি এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছি,” তখনই বুঝতে হবে ‘আর্ন’ প্রকল্প তার গন্তব্যে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
এই প্রকল্প সম্পর্কে আপনার কি আরও কিছু জানার আছে?