বিশেষ প্রতিনিধিঃ
একজন মানুষ, এক বিশ্বাসের নাম—হাবিবুর রহমান। পিতা আব্দুল আওয়াল। নবীনগরের কৃষ্ণনগর বাজারের মোবাইল সিম, বিকাশ ও কাস্টমার সার্ভিস কেন্দ্রিক ব্যস্ত ব্যবসায় জীবনে হঠাৎ এক মোড় নেয় ২০২৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। সেদিন তিনি সব ছেড়ে অগ্রণী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করেন।
নতুন পথ, নতুন দায়িত্ব, নতুন স্বপ্ন। গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ, যারা মূল ব্যাংক শাখায় যেতে পারেন না বা ভয় পান, তারা ভরসা করলেন হাবিবুর রহমানকে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস টাকা জমা পড়তে থাকল তার এজেন্ট শাখায়। আস্থা আর নির্ভরতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
একজন গ্রাহক শারফিনা আক্তার বলেই ফেলেন—
“আমি তো অগ্রণী ব্যাংকে টাকা রাখছি না, টাকা রাখছি হাবিবুর রহমানের কাছে।”
কিন্তু ২১ জুন ২০২৫ সকাল। শারফিনা আক্তারের মোবাইলে আসে এক ছোট্ট বার্তা—
“অনিবার্য কারণে ২১/০৬/২০২৫ তারিখ থেকে ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং সেবাসমূহ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। গ্রাহকদেরকে নিকটস্থ শাখার মাধ্যমে লেনদেন করার জন্যে অনুরোধ করা হলো। – অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি।”
এ এক লু হাওয়া। মেসেজ দেখে হতবাক শারফিনা ফোন দেন হাবিবুর রহমানকে। হাবিবুর তখনো কিছু জানেন না। অস্থির হাতে ফোন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্যান্য এজেন্টদের। সবার কণ্ঠে একই শব্দ— “আমরা জানি না ঠিক কী হচ্ছে!”
পরিচিত দোকান বন্ধ করে এক বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন হাবিবুর রহমান। আজ সেই বিশ্বাসটাই প্রশ্নের মুখে।
শুধু কৃষ্ণনগর নয়— ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় হাবিবুরের মতো আরও ২৪ জন এজেন্ট আছেন, যারা রাতদিন পরিশ্রম করে গ্রামীণ জনগণের ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতেন। এখন সবাই শঙ্কিত— এই সেবার ভবিষ্যৎ কী? এই দায়িত্বশীলদের কর্মজীবনের ভবিষ্যৎ কোথায়? আর এই গ্রামের মানুষের জমাকৃত টাকা, নিরাপত্তা ও আস্থা কোন পথে যাবে?
একজন কেঁদে বললেন,
“ব্যাংকের কাগজে হয়তো আমি একজন এজেন্ট, কিন্তু গ্রামের মানুষের কাছে আমি তাদের সন্তানের মতো— এখন আমি কী মুখে বলব ওদের টাকা তুলতে শহরে যেতে হবে?”
এই মুহূর্তে গ্রাহকদের ভিড় জমেছে কৃষ্ণনগরের সেই ছোট্ট এজেন্ট ব্যাংকিং পয়েন্টে। হাবিবুর রহমান মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। কারও মুখে প্রশ্ন— টাকা কি ফেরত পাওয়া যাবে? কারও চোখে আতঙ্ক— আমার সঞ্চয় কি থাকবে নিরাপদ?
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার এক প্রান্তে এই এজেন্টরাই ছিলেন মানুষের সবচেয়ে কাছের আশা। আজ সেই আশার ভিত কাঁপছে।
সবার একটিই প্রশ্ন— এই ঝড় থামবে কবে?
