নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
নেপালের হিমালয় অঞ্চলে একের পর এক ভয়াবহ পাহাড় ধ্বসে শত শত মানুষের মৃত্যু হৈছে। রাস্তা, বাড়িঘর, ব্রিজ নিমিষেই মাটির সাথে মিশে গেছে। প্রশ্ন উঠছে—এটা কি শুধুই প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নাকি মানুষের তৈরি জলবায়ু সংকটের ফল? উত্তর হলো: দুইটাই। এগুলো নিয়া কিছু কথা বলা দরকার। বাংলাদেশও যে এর বাইরে নয়,এটা বুঝে জরুরি পদক্ষেপ না নিলে চরম বিপদ!
✅ নেপালের পাহাড় ধ্বসের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ৫টি মূল কারণ:
কারণ ১: অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত ও মেঘভাঙা বৃষ্টি হিমালয় এখন আগের চেয়ে বেশি গরম হচ্ছে। বাতাসে জলীয় বাষ্প বাড়ছে। ফলে অল্প সময়ে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে যাকে “Cloudburst” বলে। ২০২৪ সালে নেপালে ২৪ ঘণ্টায় ৫০০ মিমি বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। এই পানি মাটির ভেতরে ঢুকে পাহাড়ের স্তরগুলোকে আলগা করে দেয়। মাটি আর পাথর ধরে রাখার শক্তি হারায়, তারপর ধ্বসে পড়ে।
কারণ ২: হিমবাহ গলা এবং GLOF – Glacial Lake Outburst Floodনেপালে ৩,০০+ হিমবাহী হ্রদ আছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ দ্রুত গলছে। গলা পানি জমে বিশাল হ্রদ তৈরি হচ্ছে। হ্রদের চারপাশের বরফের বাঁধ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। সামান্য ভূমিকম্প বা ভারী বৃষ্টিতেই সেই বাঁধ ভেঙে ১০-১৫ মিনিটে নিচের উপত্যকা ভাসিয়ে দিচ্ছে। ২০২৪ সালে থামে অঞ্চলে এমন GLOF এর কারণে পুরো গ্রাম ধ্বংস হয়েছে।
কারণ ৩: পারমাফ্রস্ট গলা – Frozen Ground Melting হিমালয়ের ৪০ মিটারের উপরে মাটি সারাবছর বরফ হয়ে থাকে। এটাকে বলে পারমাফ্রস্ট। এটা পাহাড়ের “আঠা” হিসেবে কাজ করে। তাপমাত্রা বাড়ায় এই বরফ গলে যাচ্ছে। ফলে পাহাড়ের পাথরগুলো আর আটকে থাকছে না। সামান্য বৃষ্টিতেই বড় বড় বোল্ডার নিচে গড়িয়ে পড়ছে।
কারণ ৪: ঘন ঘন খরা ও ভূমিকম্পের পর দুর্বল মাটিজলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা-বন্যা চক্র বেড়েছে। দীর্ঘ খরায় মাটি ফেটে যায়। তারপর হঠাৎ বৃষ্টি হলে সেই ফাটল দিয়ে পানি ঢুকে পুরো পাহাড় নরম হয়ে যায়। ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পের পর অনেক পাহাড় এমনিতেই দুর্বল ছিল। জলবায়ুর চাপে সেগুলো এখন একটার পর একটা ধসছে।
কারণ ৫: মানুষের হস্তক্ষেপ ও জলবায়ু পরিবর্তন, ফলে ডাবল ঝুঁকিরাস্তা কাটা, অপরিকল্পিত বসতি, গাছ কাটা—এগুলো তো আছেই। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন এই সমস্যাকে ১০ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে যে বৃষ্টিতে ধ্বস হতো না, এখন ২ ঘণ্টার বৃষ্টিতেই ধ্বস হচ্ছে। ২. এরকম ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য কতটুকু ?বাংলাদেশে হিমালয় নেই, তাই নেপালের মতো GLOF বা পারমাফ্রস্ট গলার ঝুঁকি নেই। কিন্তু বাংলাদেশের ৩টি অঞ্চল ঠিক একই কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে।ঝুঁকি অঞ্চল ১: পার্বত্য চট্টগ্রাম – রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এটাকে বাংলাদেশের “নেপাল” বলা যেতে পারে ।
মিল: পাহাড়ি ঢাল, ভারী বর্ষণ, মাটি আলগা।
জলবায়ুর প্রভাব: ২০১৭ সালে রাঙামাটির ধ্বসে ১২০+ মানুষ মারা যায়। তখন ৪৮ ঘণ্টায় ৩৪০ মিমি বৃষ্টি হয়েছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, পার্বত্য এলাকায় বৃষ্টির তীব্রতা প্রতি দশকে ১৫% করে বাড়ছে। মেঘভাঙা বৃষ্টি এখন নিয়মিত।
অতিরিক্ত ঝুঁকি: পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি, জুম চাষ। গাছ কাটায় মাটি ধরে রাখার কেউ নেই। জলবায়ুর অতিবৃষ্টি + মানুষের ভুল ফলে ভয়াবহ ধ্বস।
ঝুঁকি অঞ্চল ২: সিলেট ও সুনামগঞ্জের পাহাড়ি টিলাজাফলং, বিছানাকান্দির টিলাগুলো ঝুকিপূর্ণ । এখানে পাথর উত্তোলন আর বৃষ্টিতে টিলা ধসে মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনা প্রতি বছর ঘটছে। ভারতের মেঘালয়ে অতিবৃষ্টি হলে সিলেটের পাহাড়ি ঢল নামে। জলবায়ুর কারণে এই ঢল এখন আরও আকস্মিক ও শক্তিশালী।
ঝুঁকি অঞ্চল ৩: উপকূলীয় ভাঙন – “সমতলের পাহাড় ধ্বস”নেপালে পাহাড় ধ্বসলে মাটি পড়ে। বাংলাদেশে নদী ভাঙন ও উপকূলীয় ক্ষয় হয়। এর কারণ একই জলবায়ু।
