নিজস্ব প্রতিনিধি:
গাজীপুর শিল্পনগরীর অপরাধ পরিস্থিতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এখানকার মানুষের প্রতিদিনের নিরাপত্তাহীনতার প্রতিচ্ছবি। সন্ধ্যা নামলেই শহরের রাস্তায় চলাফেরা আতঙ্কে পরিণত হয়। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অপহরণ, ধর্ষণ থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ড—সবই যেন এখানে নিত্যদিনের ঘটনা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুলিশ অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। আগের মতো টহল, তল্লাশি বা নজরদারি নেই। ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। পুলিশের সদর দপ্তরের এক প্রতিবেদনে গাজীপুরের আইনশৃঙ্খলার অবনতিকে ‘খুবই খারাপ’ বলা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, গাজীপুর মহানগরে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা বেড়েছে। দিনের বেলাতেও এসব অপরাধ ঘটছে, অথচ পুলিশ অনেক সময় নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকছে।
৩৩০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের গাজীপুর মহানগরে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ বসবাস করেন। দেশের রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য গাজীপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হলেও সন্ধ্যা নামলেই শহরে ভয়ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে জিএমপিতে মাত্র ১ হাজার ৭৬৫ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন, যার মধ্যে ৮টি থানা অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু পুলিশি কার্যক্রমের ঘাটতির কারণে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যেমন গত ১৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সাংবাদিক আশরাফুল আলম টঙ্গীর কাদেরিয়া গেটে ছিনতাইকারীদের হাতে আক্রান্ত হয়ে আহত হন এবং তার মোবাইল ও টাকা লুট হয়। একই এলাকায় আরও বেশ কিছু ছিনতাইয়ের ঘটনার কথা বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
আবার গত ১১ জুলাই রাতে টঙ্গী সড়ক ও জনপথ কার্যালয়ের সামনে কলেজ শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান ছুরিকাঘাতে খুন হন।পুলিশ ও স্থানীয়দের মতে, গাজীপুর মহানগরের ১৯টি স্থানে ছিনতাইয়ের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। এসব জায়গার মধ্যে রয়েছে—টঙ্গীর সান্দারপাড়া রাস্তার মাথা, হোন্ডা গলি, শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের পেছন দিক, মিলগেট, ন্যাশনাল টিউবস রোডের মাথা, সফিউদ্দিন রোড, হোসেন মার্কেট কাঠপট্টি, গাজীপুরা বাঁশপট্টি, তারগাছ, চান্দনা চৌরাস্তা, টঙ্গী স্টেশন রোড, টঙ্গী ব্রিজ, টঙ্গী বাজার, জয়দেবপুর বাজার, লক্ষ্মীপুরা, কোনাবাড়ী, বাসন এলাকা, ভোগড়া বাইপাস ও গাজীপুর উড়ালসড়কের নিচের অংশ।বিশেষ করে চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ছিনতাই বেশি হয়।
এখানেই সাংবাদিক আসাদুজ্জামানকে কুপিয়ে হত্যা করেছিল ছিনতাইকারীরা। পরে পুলিশ জানায়, ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ৯ জনই পেশাদার ছিনতাইকারী।বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যার পর অল্পবয়সী ছিনতাইকারীরা ধারালো অস্ত্রের মুখে রিকশা বা অটোরিকশা থামিয়ে টাকা-পয়সা ও মূল্যবান জিনিস কেড়ে নেয়। কখনো অন্ধকারে পথ আটকায়, আবার কখনো থেমে থাকা বাসের জানালা দিয়েও ফোন ও গয়না ছিনিয়ে নেয়। বাধা দিলে ছুরিকাঘাত পর্যন্ত করে।সাধারণত পুলিশের কাছে ছিনতাইকারীদের তালিকা থাকার কথা, কিন্তু জিএমপির কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, কারা কোথায় ছিনতাই করে, সে বিষয়ে তাদের কাছে কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই—এই ছয় মাসে ছিনতাই ও দস্যুতার অভিযোগে ৩৪টি মামলা হয়েছে। আগের ছয় মাসে মামলা হয়েছিল ২৬টি। তবে অনেক ভুক্তভোগী হয়রানির আশঙ্কায় মামলা করেন না। তাই প্রকৃত অপরাধচিত্র পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয় না।এদিকে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত অভিযানে ছিনতাইয়ের অভিযোগে ৮৬৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪৯ জন জামিনে বেরিয়ে গেছে।সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) গাজীপুর জেলা সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার শিশির বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই মূল অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
আগে রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতারা কিশোর গ্যাং ও মাদকসেবীদের নিয়ন্ত্রণ করতেন, এখন ক্ষমতার পালাবদলের পর নতুন প্রভাবশালীরা নিয়ন্ত্রণ করছে।গাজীপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার নাজমুল করিম খান জানান, ছিনতাই দমনে রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ছিনতাইপ্রবণ এলাকায় ৮ থানার ওসিদের মাধ্যমে ফাঁকা গুলি ছোড়া ও মোটরসাইকেল টহল চালু করা হয়েছে।তিনি আরও বলেন, সাংবাদিক আসাদুজ্জামান হত্যার পর হঠাৎ হঠাৎ ডিবি পুলিশ নগরের ব্যস্ত এলাকায় গিয়ে ঘেরাও দিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তার করছে।
