মনোহরদীর বিলে অতিথি পাখি: সৌন্দর্য নাকি কৃষকের উপদ্রব?

লেখক: এমরানুর রেজা
প্রকাশ: ৬ মাস আগে

নিজস্ব প্রতিনিধি:

নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার বেকুয়ার বিল ও আশপাশের বিস্তীর্ণ জলাভূমি শীত মৌসুমে অতিথি পাখির আগমনে মুখর হয়ে ওঠে। শীত এলেই দূরদেশ থেকে আসা এসব পাখি খাবারের খোঁজে নেমে আসে বিল ও ধানক্ষেতে। বেকুয়ার বিলের পাশের বিলটির নাম চাতল বিল—স্থানীয়ভাবে পরিচিত হলেও এর অবস্থান অনেকের কাছেই রহস্যময়।ধানগাছের ফাঁকে ফাঁকে পড়ে থাকা শস্যই অতিথি পাখিদের প্রধান খাবার। আর সেই খাবারের টানেই তারা ধানক্ষেতে নামে। এতে বিপাকে পড়েন স্থানীয় কৃষকরা। কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি অতিথি পাখির ওজন প্রায় দুই থেকে তিন কেজি।

এত ভারী পাখি যখন নরম মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা ধানগাছে নামে, তখন ধানগাছ ভেঙে পড়ে, অনেক সময় মাটির সঙ্গে মিশে যায়। ফলে এসব পাখিকে তারা প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, বরং ফসলনাশকারী উপদ্রব হিসেবেই দেখেন।ধান বাঁচাতে কৃষক মাঠ পাহারা দেন, আর খাবার সংগ্রহে পাখিরা সুযোগ খোঁজে— এভাবেই চলে কৃষক ও অতিথি পাখির এক ধরনের ‘চোর–পুলিশ খেলা’। তবে এই খেলায় পাখিরাই যেন বেশি চালাক। মাঠ ফাঁকা থাকলেই তারা আকাশ থেকে নেমে আসে ধানক্ষেতে, খাবার সংগ্রহ করে আবার উড়ে যায় নির্দিষ্ট গাছে। সেসব গাছেই তারা রাত কাটায়। ভোর হলেই আবার শুরু হয় বিল থেকে বিল, জল থেকে জলে খাবারের সন্ধান।চাতল বিলের সন্ধানে বাইকযোগে সারাদিন ঘুরেও নিশ্চিত তথ্য মেলেনি। কেউ বলেন, অতিথি পাখি আগে আসতো, এখন আর আসে না। কেউ বলেন, একটু আগেই ছিলো— এখন কোথায় যে গেলো! গাবলা বিল, বাইক্কার বিল, গালা বিল— একের পর এক নাম শোনা যায়, কিন্তু সঠিক অবস্থান জানা কঠিন।গামলা বিলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অতিথি পাখির দেখা মেলেনি।

স্থানীয়দের মতে, এখন বিল শুকনো— আর শুকনো বিলে অতিথি পাখি আসে না। বড়চাপা ইউনিয়নের কাহেতেরগাও গ্রামের মানুষজন এমনটাই জানান।অবশেষে মাগরিবের পর পঞ্চাশকুর এলাকায় এসে চাতল বিলের খোঁজ মেলে। মনোহরদীর মূল এলাকা থেকে খুব দূরে নয় এই বিল। তবে বর্তমানে সেখানে অতিথি পাখির উপস্থিতি নেই। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিলে হালকা পানি থাকাকালীন তারা ছিলো। এখন ধানগাছের নিচে অল্প পানি থাকলেও রোদ উঠলেই পাখিরা বিল ছেড়ে পাশের কোনো বিলে কিংবা গাছে আশ্রয় নেয়।মনোহরদীর বিলগুলোতে চলাচল বরাবরই চাঞ্চল্যকর। শোনা যায় অনেক সুন্দর বিলের কথা— কিন্তু সব সৌন্দর্য মানুষের কথায় ধরা পড়ে না। গ্রামঘেঁষা বিল, বিলঘেঁষা গ্রাম— এই মিলনই মনোহরদীর প্রকৃত পরিচয়। নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যায় না এই জলাভূমির নীরব গল্প, দ্বন্দ্ব আর সৌন্দর্য।মনোহরদী যেন প্রকৃতির এক “লিটল বিট অ্যাম্বিয়েন্স”— যেখানে অতিথি পাখির ডানার শব্দ আর কৃষকের দুশ্চিন্তা একসাথে বাস করে।