নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
নরসিংদী শহর, ২২ আগস্ট: সকাল থেকে বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুৎ না থাকায় পানি সরবরাহ বন্ধ। ফলে নরসিংদী শহরের বিভিন্ন আবাসিক ভবনে রান্নাবান্না পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে তীব্র গরম, গ্যাস সংকট ও দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী।শহরের গাবতলী এলাকার বাসিন্দা আমির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকার কী আমাদের আবার টিউবওয়েলের যুগে নিয়ে যাবে?” তাঁর অভিযোগ, ফ্ল্যাটবাড়িতে এখন আর আগের মতো টিউবওয়েলের ব্যবস্থা নেই। বিদ্যুৎ না থাকলে মোটর চলে না, মোটর না চললে পানি আসে না।
ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকদের পানির সংকটেও পড়তে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে শিশুরা। একদিকে ভাদ্র মাসের প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে ফ্ল্যাটের ভেতরে বাতাস চলাচল কম— এর মধ্যে গোসলের পানিও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে শিশুদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন অভিভাবকেরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাসের তীব্র সংকট। অনেক এলাকায় গ্যাসের চুলা জ্বলার মতো অবস্থায় থাকলেও পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় রান্না করা যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভর করছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস—তিনটি মৌলিক নাগরিক সুবিধার সংকট যেন একসঙ্গে চেপে বসেছে নগরবাসীর ওপর।তবে নগরবাসীর অভিযোগ, এটি শুধু আজকের ঘটনা নয়।
নরসিংদী শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা ঘটে। একদিন এক এলাকায়, অন্যদিন অন্য এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। নরসিংদী সদর বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করা হলে প্রায়ই একই ধরনের উত্তর পাওয়া যায়—“লাইনে সমস্যা আছে, কাজ চলছে।”নগরবাসীর প্রশ্ন, বৈশাখ মাসে ঝড়-বৃষ্টির কারণে বৈদ্যুতিক লাইনে সমস্যা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এখন যদি বছরের প্রায় সব সময়ই বিদ্যুৎ লাইনে সমস্যা থাকে, তাহলে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান কোথায়?বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে নিম্নআয়ের মানুষের ওপরও। বিশেষ করে রিকশাচালকেরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা ঠিকমতো চার্জ দিতে না পারায় তাদের আয় কমে গেছে—স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের বেলায়ও একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যায়— কখনো কখনো সাত থেকে আটবার পর্যন্ত। এতে রিকশা চার্জ দেওয়া যেমন কঠিন হয়ে পড়ে, তেমনি দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও ব্যাহত হয়।
বিদ্যুৎ সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। নরসিংদীর বোয়াকুর মোড়ের পরিচিত খাবারের প্রতিষ্ঠান হোটেল রমিজে আজ ক্রেতার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের মধ্যে কর্মচারীদের পাশাপাশি ম্যানেজারকেও অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে কাজ করতে হচ্ছে। ম্যানেজার জানান, স্বাভাবিক সময়ে তাঁদের প্রতিদিনের বিক্রি প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় আজ বেচাকেনা প্রায় বন্ধের পথে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “হাসিনা সরকার ভালো ছিল।” তাঁর দাবি, বর্তমান সময়ে ব্যবসায়িক খরচও বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ময়দার বস্তাপ্রতি দামও প্রায় এক হাজার টাকা বেড়েছে। বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি যোগ হওয়ায় ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।অন্যদিকে হাসপাতাল, মার্কেট ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলো জেনারেটর ব্যবহার করে কোনোভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জেনারেটরের অতিরিক্ত খরচ বহন করা ছোট ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সবচেয়ে বড় বোঝা পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
নগরবাসীর প্রশ্ন— বিদ্যুৎ কি কেবল আলো জ্বালানোর জন্য? একটি আধুনিক শহরের পানি সরবরাহ, রান্নাবান্না, চিকিৎসা, ব্যবসা, পরিবহনসহ অসংখ্য সেবা বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন আর শুধু বিদ্যুতের সমস্যা নয়; এটি পরিণত হয়েছে পানি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, ব্যবসা ও জনজীবনের সামগ্রিক সংকটে।নরসিংদী শহরের মানুষের দাবি, সাময়িকভাবে “লাইনে সমস্যা আছে, কাজ চলছে”— এমন আশ্বাস নয়; তাঁরা চান সমস্যার স্থায়ী সমাধান। নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে পানি ও অন্যান্য নাগরিক সেবাগুলো স্বাভাবিক রাখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট থেকে দ্রুত পরিত্রাণ চান নরসিংদীর নগরবাসী।
