নির্বাচনী হালচাল: চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে দাঁড়িপাল্লার দুই না-কি ধানের শীষের পাঁচ!

লেখক: Arif Hasan
প্রকাশ: ৮ মাস আগে

বিশেষ প্রতিবেদন:

ত্রয়োদশ নির্বাচনকে সামনে নিয়ে বর্তমানে দেশের বড় দুদল ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি) ও ‘বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী’ভোটের চুলচেরা হিসেব কষছে। কোন আসনে কোন দলের প্রার্থী কত ভোটে বিজয়ী হবে তা সর্বমহলে আলোচনার মূল বিষয় হয়ে ওঠেছে । তারই ধারাবাহিকতায় আলমডাঙ্গা উপজেলা সম্পূর্ণ ও চুয়াডাঙ্গা সদরের কিছু অংশ নিয়ে চুয়াডাঙ্গা-১ নির্বাচনী আসন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বররে হিসাবানুযায়ী এ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা-৪,৮৪,৩৮৯ জন। এ আসনে বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে এবার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে অনেকে ধারণা করছেন।

প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লার ইতিহাস অনুসন্ধান করলে চমকপ্রদ ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায়। যা বর্তমান সময়ের অনেকেরই অজানা। ৭১ বছর পূর্বে ১৯৫৪ সালে আলমডাঙ্গাতে ভোটের রাজনীতিতে যা ঘটেছিল এবার তার পুণরাবৃত্তি হতে পারে।মুসলিম লীগকে রুখে দিতে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর, গঠন করা হয়েছিল যুক্তফ্রন্ট। মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যৌথ নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এবং শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক শ্রমিক পার্টি পূর্ব পাকিস্তানে ছিল বড় রাজনৈতিক দল। এ সময়ে ৫টি দল (পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম, গণতন্ত্রী দল, খেলাফতে রব্বানী পার্টি) নিয়ে নির্বাচনী জোট, যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। আলমডাঙ্গায় আওয়ামীলীগ প্রার্থী ছিলেন হাটবোয়ালিয়ার মরহুম ডা. রিয়াজ উদ্দিন (মেজর বজলুল হুদার বাবা) এবং কৃষক প্রজা পার্টির প্রার্থী ছিলেন মুন্সিগঞ্জের মরহুম এম রহমান (মকবুলার রহমান)।অবাক ব্যাপার হলো, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে দুই দল সারাদেশে মিলিতভাবে মুসলিম লীগের হারিকেন প্রতীকের বিরুদ্ধে একক প্রার্থী দিয়েছিল।

কিন্তু আলমডাঙ্গায় ঘটে ব্যতিক্রম। এই আসনে আওয়ামী লীগ ও কৃষক শ্রমিক পার্টির কেউ কাউকে ছাড় দিতে ছিল নারাজ। সেজন্য দৈনিক মিল্লাত পত্রিকার সম্পাদক জনাব মোতাহার হোসেন সিদ্দিকী সাহেব একক প্রার্থী নির্বাচনের জন্য আলমডাঙ্গায় আসেন। কিন্তু কোন সমন্বয় করতে না পেরে তিনি ফিরে যান। দ্বিতীয় দফায় স্বয়ং সোহরাওয়ার্দী সাহেব এসেও উভয় দলের মধ্যে সমন্বয় করতে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় উভয় পার্টির পক্ষে দুইজন প্রার্থীই মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। যিনি জয়লাভ করবেন তিনি যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী বলে বিবেচিত হবেন। তৎকালে এ অঞ্চলে আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন ডাঃ বজলুল হক। তিনি সাংগাঠনিকভাবে ছিলেন খুবই দুর্বল। অপরদিকে কৃষক শ্রমিক পার্টির সভাপতি ছিলেন সুতাইল গ্রামের ডাঃ আব্দুস সালাম। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রতীক ছিল নৌকা। যেহেতু জোটের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা তাই প্রশ্ন ওঠলো নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হবেন কে? উভয় প্রার্থীই নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে চাওয়াতে বাধ্য হয়ে লটারীর মাধ্যমে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। লটারিতে কৃষক-শ্রমিক পার্টির মকবুলার রহমান নৌকা প্রতীক পেয়েছিলেন। তাই নির্বাচনের প্রয়োজনে ডা. রিয়াজউদ্দিন প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লা মার্কা বেছে নিয়েছিলেন। নৌকার প্রতীকওয়ালার কপাল খারাপ- জয়লাভ করেছিলেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নেওয়া ডা. রিয়াজউদ্দিন। মুসলিম লীগ প্রার্থী ছিলেন বড় গাংনীর মিঞা মুনসুরের চাচাতো ভাই মঈনদ্দীন মিঞা। তাঁর নির্বাচনী প্রতীক ছিল ‘হারিকেন’। ‘৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়েছিল। ডা.রিয়াজউদ্দীন দাঁড়িপাল্লা মার্কা নিয়ে জয়লাভ করে যুক্তফ্রন্টের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এটিই ছিল প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লার প্রথম জয়।

অপরদিকে ১৯৯১ সালে মিঞা মুনসুর, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুন মাসের দুটি নির্বাচনে শামসুজ্জামান দুদু এবং ২০০১ সালে শহিদুল ইসলাম বিশ্বাস ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে জয় লাভ করে। সে হিসেবে এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি চারবার জয়লাভ করেছে।২০২৬ সালের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এবার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর মধ্যে। দু দলই আসন্ন নির্বাচনে জয়লাভের জন্য জোরে-শোরে নির্বাচনী কর্মকারণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। তবে নির্বাচনের প্রচার কৌশলে বিএনপির চেয়ে নানা দিক দিয়ে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী এগিয়ে রয়েছে। দু দলের ভোট প্রার্থনার মধ্যে রয়েছে আচরণগত ব্যাপক প্রার্থক্য । বিএনপির নেতা-কর্মীদের ভোট প্রার্থনার ধরণ সাধারণ জনগণ খুব ভালোভাবে গ্রহণ করছে বলে মনে হচ্ছে না। অপর দিকে জামায়াত ইসলামী দলটির বিনয়ীভাব, ভোট প্রার্থনা ও নানা কৌশল সাধারণ জনগণের মন জয় করতে সক্ষম হচ্ছে। পূর্বের ইতিহাস বলে জামায়াতের চেয়ে বিএনপি বড় দল । কিন্তু তাদের দলীয় আন্তকোন্দল বিভিন্ন আসনে জয়লাভের অন্তরায় হতে পারে। অপরদিকে জামায়াত ইসলামী দলটির দৃঢ় ঐক্য জামায়াতকে দিনের পর দিন জয়ের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে। সময় থাকতে বিএনপি তাদের অন্তরকোন্দল সমাধান করতে না পারলে, চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে দ্বিতীয় বারের মতো দাঁড়িপাল্লা জয়লাভ নিশ্চিত বলে সর্বসাধারণ অনুমান করছেন।খাইরুল ইসলামসাংবাদিক,গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী।