আলমডাঙ্গা বধ্যভূমি: নৃশংস হত্যাযজ্ঞের স্মৃতিস্তম্ভ ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য

লেখক: খাইরুল ইসলাম
প্রকাশ: ১ বছর আগে

১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় চুয়াডাঙ্গা দীর্ঘদিন শত্রুমুক্ত ছিল। সে বিবেচনায় চুয়াডাঙ্গাকে বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী করার প্রস্তাব করে ১০ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে সরকার গঠন ও শপথ গ্রহণের প্রস্তুতির সকল কার্যক্রম চূড়ান্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এ তথ্য জানাজানি হয়ে গেলে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী চুয়াডাঙ্গাতে ব্যাপক বোমা বর্ষণ করে। চুয়াডাঙ্গা হতে শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠান ৭ দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদনথতলাতে সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ওই সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানের নামে বৈদনাথতলার নামকরণ করেন মুজিবনগর। এ ঘটনার পরে চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানী বাহিনীর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। এ হত্যাযজ্ঞের নির্মম নিদর্শন হিসেবে পরিচিত আলমডাঙ্গা বধ্যভূমি।
১২ মে, পাকিস্তানি বাহিনী আলমডাঙ্গায় প্রবেশ করে। কুমার নদের উপর নির্মিত লালব্রিজের কাছে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ব্যাপক হত্যাকান্ড ও বাঙালি নর-নারীর ওপর অমানবিক ও পাশবিক নির্যাতনের সাক্ষী এই লালব্রীজ ও বধ্যভূমি। এই লালব্রীজের দুইপাশে পাকিস্তানী বাহিনীর ক্যাম্প ছিল। মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি সেনারা আলমডাঙ্গার স্টেশন হয়ে চলাচলকারি গোয়ালন্দ, সিরাজগঞ্জ, পার্বতীপুর, সৈয়দপুর, রাজশাহী, ঈশ্বরদী, দর্শনা,যশোর ও খুলনাগামী ট্রেনগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে বিভিন্ন বয়সের বাঙালি পুরুষ ও সুন্দরী নারীদের নামিয়ে নিত। ওই সময় এখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি হলুদ খালাসি ঘর ছিল। যা এখনো অক্ষত আছে। এ কক্ষেই স্বাধীনতাকামী যুবক, নারী-পুরুষকে নির্যাতন শেষে হত্যা করা হতো। হত্যা শেষে গর্ত করে লাশ পুঁতে রাখত বা ফেলে রাখত পাকিস্তানি পিশাচ ও তাদের এদেশীয় দোসররা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে বধ্যভূমিতে অনেকগুলি গর্ত পাওয়া যায়। যেখানে অসংখ্য মানুষের মাথার খুলি ও হাড় দৃষ্টিগোচর হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণামতে এখানে প্রায় ২ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে (প্রকৃত সত্য জানা সম্ভব হয়নি তবে সংখ্যাটি উল্লেখিত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম হতে পারে)। ‘টর্চার সেল’নামক সেই হলুদ খালাসি ঘরকে ঘিরেই বর্তমানে বধ্যভূমির কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের জুনের শেষ দিকে হতে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত নারকীয় নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞ ও ধর্ষণ চালানো হয় । এ নির্মম গণহত্যার প্রধান কুশিলব লেফ্টেন্যান্ট সালেহ জয়েন, কর্নেল আব্দুল গফুর, ক্যাপ্টেন মোজাফ্ফর হোসাইন নকভি, মেজর রানা, মেজর আজম খান, হাবিলদার এনায়েত ও পাকিস্তানের এদেশীয় স্থানীয় দোসরদের মধ্যে ছিল জামিল বিহারী,আনোয়ার বিহারী ও বশির বিহারী। এছাড়াও রাজাকারদের মধ্যে ছিল গোবিন্দপুরের খোন্দকার শামসুল, এরশাদপুরের হিজাব দফাদার, এরশাদপুরের ইউসুফ আলী মিয়া (চেয়ারম্যান শান্তি কমিটি) ও ছত্রপাড়ার আহমদ আলী বিশ্বাস (সেক্রেটারি শান্তি কমিটি)
দেশ স্বাধীন হলেও দীর্ঘদিন কেউ খোঁজ রাখেনি এ হত্যাকাণ্ডের। পাকিস্তানী শাসক ও সেনাবাহিনীর এ নারকীয় বর্বরতার নিদর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে জানানোর জন্য ২০০৯ সালে ‘আলমডাঙ্গা বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও বাস্তবায়ন কমিটি’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এ কমিটির উদ্যোগের প্রেক্ষিতে ২০১২ সালে নির্মাণ করা হয় বর্তমান স্মৃতিস্তম্ভটি।
বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভের নির্মাণশৈলী ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য: আলমডাঙ্গা বধ্যভূমির এ স্মৃতিস্তম্ভের উচ্চতা ৩০ ফুট। যা দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদকে স্মরণ করা হয়েছে। প্রস্থে দুপাশে দুটি দেয়ালের দৈর্ঘ ৫২ ফিট । যা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে স্মরণ করা হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভের ৫২ ফিটের যে দেয়াল আছে তা দেখলে মনে হবে আগুনে পোড়ানো বাড়ির দেয়ালের অবশিষ্টাংশ। যা পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক বাঙালিদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার মর্মার্থ প্রকাশ করে। উঁচু দেয়াল দুটিতে কপাটবিহীন বড় বড় দুটি ফোকর চোখে পড়বে। এ ফোকর দুটি যুদ্ধকালনী দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতহানীর চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আরো ভালোভাবে লক্ষ করলে স্তম্ভের দেয়ালের সামনে ও পেছনে দেখা মিলবে ছোট ছোট ৩০ টি ফাঁকা স্থান। যা দ্বারা মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদকে স্মরণ করা হয়েছে। স্তম্ভের গায়ে এলোমেলো কিছু ভাস্কর্য দেখা যাবে । যেটা পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক আলমডাঙ্গাতে নারী-পুরুষের উপর নির্মম-নির্যাতন ,ধর্ষণ ও হত্যার স্মৃতি বহন করে।
বধ্যভূমি স্তম্ভটি চতুর্ভুজ আকৃতির। কিন্তু সামনে থেকে দেখলে মনে হবে এটি ত্রিভুজ আকার। স্তম্ভটির উপরে ওঠার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ২৩ টি সিঁড়ি বা ধাপ। যা ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সময়কালে পাকিস্তানী শাসক শ্রেণির শোষণের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। সিঁড়ি বা ধাপের আকার নিচের দিক হতে বড় থেকে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে উপরের দিকে ওঠেছে। দেখতে অনেকটা মিশরের পিরামিডের মতো। যা পাকিস্তানী শোষণের চরম পর্যায় বোঝানো হয়েছে। স্তম্ভটির সামনে দাঁড়ালে মনে হবে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানী শাসনামলের ইতিহাসের একটি খোলা গ্রন্থ । স্তম্ভের প্রস্থের দুদিকে ৫২ ফুটের যে দেয়াল সেই গ্রন্থেরই যেন দুটি কভার। মূলস্তম্ভটির নিচে রয়েছে একটি ইতিহাসের সংগ্রহশালা। এ সংগ্রহশালায় ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৭১ সালের নানা স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয়েছে।
আলমডাঙ্গা বধ্যভূমির তাৎপর্যপূর্ণ এ নকশা প্রণয়ণ ও নির্মাণ কাজে অক্লান্ত সময় ব্যয় করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অন্যতম সহযোগী অধ্যাপক আব্দুস সালাম । তাঁর সাথে নিরলসভাবে সময় দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্বিবিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ২২ জনের একদল চৌকস শিক্ষার্থীর ।
স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানী ও তার স্থানীয় দোসরদের নারকীয়-নৃশংস ও অমানবিক ধ্বংসলীলা দেখতে প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থী এ বধ্যভূমিতে আসেন । অনেক দর্শনার্থী আজও এ বধ্যভূমিতে ’৭১ সালে নিখোঁজ হওয়া আত্মীয় স্বজনদের খুঁজে ফেরেন। এসকল দর্শনার্থীদের আবেদন বধ্যভূমিতে যাদের গণকবর দেওয়া হয়েছিল সম্ভব হলে তাদের নামের একটি তালিকা প্রকাশ্যে থাকা উচিৎ।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এ স্থাপনা অবহেলা অযত্নে পড়ে আছে। মাদকসেবী, মাদকব্যসায়ী এবং স্কুল কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অশ্লীলতার অভয়-আশ্রমে পরিনত হয়েছে স্থানটি। পাকিস্তানীদের শোষণ-নিপীড়ন-নির্যাতনের এ স্মৃতিস্তম্ভ সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
খাইরুল ইসলাম : গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী ।