আলমডাঙ্গা প্রতিনিধি:
আলমডাঙ্গা উপজেলাটি চুয়াডাঙ্গা জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা। এ উপজেলার মধ্যদিয়ে বয়ে গেছে মাথাভাঙ্গা, কুমার,ভাটুই,পাঙ্গাসী, নবগঙ্গাসহ বেশ কয়টি নদ-নদী। রয়েছে অনেকগুলি মরা নদী ও খাল-বিল। এ অঞ্চল ছিলো স্বাভাবিক ভূমির তুলনায় অনেক নিচু । ১৮৬২ সালে আলমডাঙ্গাতে নির্মিত রেলওয়ে লাইন দেখলে তা স্পষ্ট বুঝা যায় । এ কারণে ব্রিটিশ শাসনামলে রেললইন ও স্টেশন স্থাপন অনেক উঁচু করে স্থাপন করতে হয়েছে। একটু লক্ষ্য করলেই বুঝা যাবে কালিদাসপুর, কুমারি, বেলগাছি ইউনিয়ন ও আলমডাঙ্গা পৌরসভার বিভিন্ন গ্রামগুলি অনেক নিচু জমিতে গড়ে ওঠেছে। মধ্য যুগ থেকেই এদেশের উচ্চ স্থানকে ‘ডাঙ্গা’ ও নিচু স্থানকে ‘দহ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যেমন- নাগদাহ,ডিঙেদহ,জোড়াদহ,শিলাইদহ, পোড়াদহ ইত্যাদি অঞ্চলগুলি ছিল তুলনামূলক নিচু। অপরদিকে যেসকল স্থান তুলনামূলক উচু ছিল তাকে ডাঙ্গা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যেমন- চুয়াডাঙ্গা, কার্পাসডাঙ্গা নতিডাঙ্গা, পোলতাডাঙ্গা, কয়রাডঙ্গা, আলফাডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা ইত্যাদি।
আলমডাঙ্গা শহরটির নামকরণের সঠিক ইতিহাস জানা যায় না। আবার এ শহরটির গোড়াপত্তন কোন সময়ে তারও সঠিক তথ্যও পাওয়া যায় না। আলমডাঙ্গা শহরের চারিদিকে কুমার ভাটু্ই, পাঙ্গাসী (যা বর্তমানে মরানদী বা মরগাঙ নামে পরিচিত) নদী দ্বারা বেষ্টিত। নদী বেষ্টিত অঞ্চলের মধ্যেই কোথাও কোথাও চর বা স্থল জেগে ওঠতো যা স্থানীয় ভাষায় ড্যাঙ্গা নামে পরিচিত । ড্যাঙ্গাগুলিতে ধীরে ধীরে জনবসতি গড়ে ওঠতে থাকে। জনবসতি দিনদিন বড়তে থাকায় অনেক ব্যবসায়ীগণও সেখানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে । এ সকল ব্যবসায়ীরা বেশির ভাগই ছিলেন কলকাতার হিন্দু মাড়োয়াড়িরা। যারা বিভিন্ন সময়ে ভৈরব, মাথাভাঙ্গা, কুমার নদ হয়ে এখানে পৌছাতেন। মানুষ উন্নত জীবন ও জীবিকার আশায় কালক্রমে এসকল নদী ও বিল পাড়ি দিয়ে ড্যাঙ্গা জায়গায় স্থায়ীবসতি গড়ে তোলে । আলমডাঙ্গা শহরের নামকরণের সঠিক ইতিহাস জানা যায় না। তাই নামকরণের ব্যাপারে সৃষ্টি হয়েছে নানা কিংবদন্তি। নিচে কয়েকটি কিংবদন্তি উল্লেখ করা হল-
প্রথমত: জনশ্রুতি আছে- এক সময় এক বুড়ি অনেক কষ্টে বন্যার পানি পেরিয়ে (কেউ বলেন নান্দায় বা চাড়িতে ভাসতে ভাসতে) বর্তমান জনবসতির কাছে চর বা ডাঙায় এসে সস্থির নি:শ্বাস ফেলে বলে, ‘বাবা, এলাম ডাঙায়।’ সেই এলাম ডাঙা-ই কালক্রমে আলমডাঙ্গা নামের জন্ম দিয়েছে। বুড়ি কোথা থেকে এসেছিলন কোথায় ওঠেছিলেন তার কোন হদিস মেলে না। আবার বুড়ির এ কাহিনী কে কবে শুরু করেছিল তা কেউ বলতে পারে না। এ জনশ্রুতির সত্যতা যাচাই করা অসম্ভব।
দ্বিতীয়ত: আলমডাঙ্গা নামকরণের আরেকটি তথ্য জানা যায়, আলাম একটি আরবি শব্দ عالم ( Alam) থেকে এসেছে। ‘আলাম’ শব্দের অর্থ বিশ্ব বা পৃথিবী । এই অঞ্চলে একসময় অনেক উঁচু ঢিবি বা টিলা ছিল, যার ফলে স্থানটি উঁচু এবং পৃথিবীর অন্যান্য অংশের চেয়ে ভিন্ন মনে হতো। এই ‘আলম’ বা পৃথিবী শব্দের সঙ্গে ‘ডাঙ্গা’ (উঁচু ভূমি) শব্দটি যুক্ত হয়ে আলমডাঙ্গা নামটির উৎপত্তি হয়েছে বলে বর্তমান সময়ে অনেকেই বিশ্বাস করেন। তবে এ ধারণাকেও সঠিক বলে মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সিলেট-চট্টগ্রাম বা কুমিল্লা জেলার মতো আলমডাঙ্গাতে ঢিবি বা টিলার কোন অস্তিত্ব নেই।
তৃতীয়ত: জেলা প্রশাসনের ‘নবারুণ’ ম্যাগাজিনে আলমডাঙ্গার ইতিহাস নিবন্ধে মো. নাসিরউদ্দিন মঞ্জু আলমডাঙ্গা নামকরণের উপর যে বক্তব্য রেখেছেন তার মর্মকথা এমন যে, সুদূর অতীতে এ স্থানের জনহীন নিবিড় ঘন জঙ্গলে আলম নামের এক কামিলিয়াত ফকির আস্তানা স্থাপন করেন। ফকিরকে কেন্দ্র করে পরে জনবসতি গড়ে উঠলে ও তার মুরিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে স্থানটি উক্ত ফকিরের নামানুসারে এ জনপদের নাম হয় আলমডাঙ্গা। তবে একথার যৌক্তিকতা নেই। কারণ আলম ফকিরের আস্তানা এবং মুরিদের কথা বলা হলেও ফকিরের আস্তানা ও অনুসারীরা কোথায় হারিয়ে গেল? কেন হারালো তার সঠিক তথ্য নেই। আলম ফকিরের নাম থেকেই যে আলমডাঙ্গা নামকরণ করা হয়েছে তা সর্বৈব সঠিক নয়।
চতুর্থত: মোগল সম্রাট প্রথম শাহ আলমের সময়কালে, অর্থাৎ ১৭০৭ থেকে ১৭১২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, বাংলার সুবাদার হিসেবে মুরশিদ কুলী খান দায়িত্ব পালন করেন। এ দায়িত্ব পালন কালে সম্রাটের আনুগত্যের প্রমাণ হিসেবে আলমডাঙ্গা নামকরণ হতে পারে। নদীয়া জেলার নদ-নদী ও বিলের বিভিন্ন স্থানে যে ডাঙ্গা বসতিগুলি গড়ে ওঠেছিল সেগুলিকে একত্রে মোগল সম্রাট শাহ আলমের নামের সাথে ডাঙ্গা যুক্ত করে আলমডাঙ্গা নামকরণ করাটা অস্বাভাবিক নয় । এ মতবাদের পক্ষে-বিপক্ষে নানা বিতর্ক থাকতে পারে।
পঞ্চমত: আলমডাঙ্গা শহরের গোড়াপত্তন ও নামকরণের ব্যাপারে সাহিত্যিক পিন্টু রহমান যে ধারণা দেন তার সারমর্ম হল- আরবি অ্যালেম শব্দ রূপান্তরের মাধ্যমে আলমডাঙা নামে রূপান্তরিত হয়েছে। জনাব রহমানের মতে- ‘ইংরেজদের আগমনের পূর্বে ভিনদেশি আফগান-আরব ও পারস্যের মুসলমানরা এ পথে যাতায়াত করত। তাঁদের মাধ্যমেই শহরের পত্তন। ব্যবসার পাশাপাশি তাঁরা ধর্মও প্রচার করত। নিজ দেশ ছেড়ে তাঁরা দীর্ঘদিন বিভিন্ন দেশে বাণিজ্য ও ইসলাম প্রচার করত। সে ধারাবাহিকতায় তাঁরা কুমার নদের পশ্চিম পাশে বসতি গড়ে তুলেছিল। এই ব্যবসায়ী ও ধর্ম প্রচারকগণ অ্যালেম (জ্ঞানী) হিসেবে পরিচিত । নদ-নদী বিধত উঁচ্চ বা ডাঙ্গা স্থানে অ্যালেমগণ একত্রে অস্থায়ীভাবে বসত করত। তাই তাঁদের বসতের স্থান আশপাশের জনগণের নিকট অ্যালেমডাঙ্গা নামে পরিচিত পেতে থাকে। সেই পরিচিতি থেকেই সময় ও শব্দের বিবর্তনে অ্যালেমডাঙ্গা থেকে বর্তমান আলমডাঙ্গা নামকরণ হয়ে থাকতে পারে।’ জনাব রহমানের তথ্যটি আংশিক সঠিক বলে গ্রহণ করা যেতে পারে। কারণ ওই আলেম সামাজের স্থায়ী বসতির প্রামাণিক বা দালিলিক কোন নিদর্শন আমাদের নিকট নেই।
যাইহোক আলমডাঙ্গা নামের দৃশ্যমান যে প্রমাণ পাওয়া যায় তা হলো- আলমডাঙ্গা রেলস্টেশন। ১৮৩২ সালে নীলকুঠি হিসেবে নির্মিত লাল দালনটিকে ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর হতে রেলস্টেশন হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে ব্রিটিশ রেলকোম্পানি। ১৮৬২ সালে স্টেশনের নামফলকে সর্বপ্রথম আলমডাঙ্গা নামের উল্লেখ করা হয় । সেই থেকে আলমডাঙ্গা নামটি ব্রিটিশ-ভারত-আরব ব্যক্তিগণের নিকট সুপরিচিত হয়ে আছে।
