খোঁজ
মঈনুল হাসান
বুক ধুকপুক সকাল থেকেই বুঝি
খুঁজছি তোমায় দুপুর রোদের পথে,
জল চিকচিক নদীর কূলেও খুঁজি
রোদের চমক সোনার অগ্নিরথে।
পথ গিয়েছে পথের সাথে মিশে
কোথাও বেঁকে হঠাৎ আবার সোজা
একটি দুটি পাখির সাড়া শিসে—
ভাবছি তবু কঠিন তোমায় বোঝা!
ছিন্ন পাতা খামখেয়ালির সুরে
ধুলোয় লুটায় তোমার কথা জেনে,
বকুলবাগান যায় সরে যায় দূরে
খমক বাজে দূরের লোকাল ট্রেনে।
তুমি আমায় পরশ দিয়েছিলে
শরণ ছিল, পরম দিনের মতো
হঠাৎ কেন মুখ ফিরিয়ে নিলে?
ভাবতে গেলেই রোদন বাড়ে যত।
ঢাকা
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
❀ ❀
মঈনুল হাসানের ‘খোঁজ’ কবিতাটি সাম্প্রতিক সময়ের পাঠক-প্রতিক্রিয়ায় একটি উল্লেখযোগ্য আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কবিতাটিকে ঘিরে যে পর্যালোচনাগুলো পাওয়া গেছে, তা কেবল একটি কবিতার মূল্যায়ন নয়; বরং সমকালীন কবিতা পাঠের রুচি, দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যাখ্যার বৈচিত্র্যেরও একটি ছোটখাটো দলিল হয়ে উঠেছে। কেউ কবিতাটিকে দেখেছেন সৌন্দর্যের অলিগলি পেরিয়ে এক মুগ্ধযাত্রা হিসেবে— যেখানে “পথ গিয়েছে পথের সাথে মিশে” কিংবা পাখির সাড়া শিসের মতো চিত্রকল্প পাঠককে টেনে নেয় এক নান্দনিক আবেশে। আবার কারও কাছে এটি ছোটগল্পের ঘ্রাণযুক্ত, সংযত কিন্তু ক্রমবর্ধমান এক অনুভবের যাত্রা, যেখানে প্রতিটি চার লাইনের স্তবক পরের অংশকে নতুন অর্থে উন্মোচন করে।
অন্যদিকে, কিছু সমালোচনামূলক পাঠে কবিতাটিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে দ্বৈত স্তরে— একদিকে স্রষ্টা-অন্বেষণ, অন্যদিকে ব্যক্তিগত প্রেম ও বিচ্ছেদের বেদনা। এই দ্বৈততা কবিতাটির অন্যতম শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। পাঠকের কাছে ‘খোঁজ’ শুধু কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতি নয়; বরং হারানো সময়, স্মৃতি, কিংবা অস্তিত্বের গভীর শূন্যতার প্রতীক হিসেবেও ধরা দিয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কবিতাটি আধুনিক বাংলা কবিতার সেই ধারার সঙ্গে সংলাপ স্থাপন করে, যেখানে ব্যক্তিগত অনুভব ধীরে ধীরে অস্তিত্ববাদী প্রশ্নে রূপ নেয়।
তবে সব মূল্যায়নই প্রশংসাসূচক নয়। কেউ কেউ ছন্দ ও ভাষার গদ্যধর্মিতাকে কবিতার গাম্ভীর্যকে খানিকটা শিথিল করেছে বলে মনে করেছেন। আবার কেউ অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহারকে পাঠকের জন্য কিছুটা বাধা হিসেবে দেখেছেন, যদিও তারা কাব্যরসের ক্ষয় হয়নি বলেও স্বীকার করেছেন। এসব মতভেদ কবিতাটির দুর্বলতা নয়; বরং এর পাঠ-উন্মুক্ততারই প্রমাণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—‘খোঁজ’ কবিতা পাঠকের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার একটি অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পেরেছে। কেউ এতে ব্যক্তিগত প্রেমের প্রতিচ্ছবি দেখেছেন, কেউ দেখেছেন দার্শনিক অন্বেষণ, আবার কেউ দেখেছেন আধুনিক নগর-চেতনার নিঃসঙ্গতা। এই বহুমাত্রিকতা-ই একটি কবিতাকে সময়ের পরিসরে টিকিয়ে রাখে।
সুতরাং, ‘খোঁজ’কে একক অর্থে সীমাবদ্ধ করা যায় না। এটি একই সঙ্গে অনুভব, প্রশ্ন এবং অনুপস্থিতির কবিতা—যা পাঠকের ভেতরে প্রতিধ্বনি তোলে, এবং সেই প্রতিধ্বনিই তাকে নতুন করে পড়তে বাধ্য করে।
— এমরানুর রেজা
১০/০৪/২০২৬
মঈনুল হাসানের ‘খোঁজ’ অসাধারণ একটি কবিতা। মুগ্ধপাঠে ঘুরে আসা যায় সৌন্দর্যের অলিগলি। এভাবেও কাউকে খোঁজা যায়, দারুণ সব উপমা নির্ভর কবিতাটি না পড়লে জানা যেতো না। “পথ গিয়েছে পথের সাথে মিশে/ কোথাও বেঁকে হঠাৎ আবার সোজা/ একটি দুটি পাখির সাড়া শিসে/ ভাবছি তবুও কঠিন তোমায় বোঝা!” কালজয়ী হওয়ার মতো পঙক্তি যা পাঠকমনে চমকের সৃষ্টি করবে বলেই আমার বিশ্বাস।
—আখতার জামান
১৮. ০৩. ২৬
কবি মঈনুল হাসানের ছোট্ট প্রাঞ্জল কবিতা ‘খোঁজ’। ভালো লাগার মতো একটা লেখা। সহজ সুন্দর শব্দ চয়ন লেখাটাকে সমদ্ধ করেছে। চার লাইন পড়ে একটু থেমে ভাবতে হয়। পরের চার লাইন প্রথম চার লাইনকে এগিয়ে নিয়ে যায় একটা শান্তিপূর্ণ সমাপ্তির দিকে। কবিতাটার মধ্যে একটা ছোটগল্প ছোটগল্প ঘ্রাণ আছে।
শেষ লাইনটা শেষ হওয়ার পরেও মনে হয় শেষ হয়নি—আরো কিযেনো রয়ে গেলো।
— সাদেক মুকুল
১৮-০৩-২০২৬
মঈনুল হাসানের ‘খোঁজ’ কবিতাটি এক গভীর অন্বেষণের অনুভূতি জাগায়। প্রথমাংশে এই খোঁজ যেন স্রষ্টার প্রতি—প্রকৃতি, পথ ও সময়ের ভেতর দিয়ে এক অধরা সত্তার সন্ধান।
“একটি দুটি পাখির সাড়া শিসে- ভাবছি তবু কঠিন তোমায় বোঝা!”—পংক্তিগুলো সেই অজ্ঞেয়তারই ইঙ্গিত বহন করে।
এ ভাবনার ভেতর রবী ঠাকুরের
—“তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনা-জালে”-এর প্রতিধ্বনি লক্ষ করা যায়।
পরবর্তী অংশে কবিতাটি সূক্ষ্মভাবে মোড় নেয় ব্যক্তিগত প্রেমের দিকে। স্মৃতি, বিচ্ছেদ ও বেদনার আবহে প্রিয়জনের অনুপস্থিতি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
“হঠাৎ কেন মুখ ফিরিয়ে নিলে?”— এই প্রশ্ন কবিতার আবেগকে তীব্রতায় পৌঁছে দেয়।
‘খোঁজ’-এর সার্থকতা তার দ্যর্থক দ্যোতনায়। এটি একই সঙ্গে স্রষ্টা-অন্বেষণ ও মানবিক প্রেমের কবিতা, যা পাঠককে ভাবায় এবং নীরব অনুভূতিতে স্পর্শ করে।
তবে ছন্দের প্রয়োগ কখনও কখনও ভাবের গাম্ভীর্যকে খানিকটা শিথিল করেছে; গদ্যছন্দের অধিক উপস্থিতি কবিতাটিকে আরও স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত করতে পারত।
— তনুমা কায়াশ্রী হিল্লোল
৩রা চৈত্র, ১৪৩২
মঈনুল হাসানের “খোঁজ” কবিতাটি জীবনানন্দীয় নৈঃশব্দ ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আধুনিক বেদনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি স্বতন্ত্র কণ্ঠ তৈরি করে। কবিতাটি অনুপস্থিত প্রিয়জনকে ঘিরে এক সংযত অথচ গভীর অনুসন্ধানের কাব্য যেখানে ব্যক্তিগত প্রেমবেদনা ধীরে অস্তিত্বগত শূন্যতায় রূপ নেয়। খোঁজা এখানে কেবল মানুষ নয়—একটি হারানো সময়, স্পর্শ ও আশ্রয়ের অনুসন্ধান।
প্রকৃতি— রোদ, নদী, বকুলবাগান, ছিন্ন পাতা এই অনুসন্ধানকে দৃশ্যমান করে কিন্তু আশ্রয় দেয় না; বরং অধরাত্বই বাড়ায়। এই ব্যবহারে জীবনানন্দ দাশ-এর স্মৃতি জাগে, তবে তাঁর মতো প্রশান্তি এখানে অনুপস্থিত। অন্যদিকে “হঠাৎ কেন মুখ ফিরিয়ে নিলে?”—এই প্রশ্ন ও “লোকাল ট্রেন”-এর নগর-ধ্বনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আধুনিক বেদনার সঙ্গে সাযুজ্য তৈরি করে। যদিও এখানে আবেগ বিস্ফোরিত নয়, বরং নিবৃত।
“খোঁজ” একটি কোমলস্বরে উচ্চারিত প্রেমের কবিতা—যেখানে অনুভূতি তীব্র কিন্তু প্রকাশ সংযত; আর অভাববোধই তার প্রধান সত্য।
—আয়তিলতা
২৩/০৩/২০২৬
মঈনুল হাসানের কবিতা পাঠ করছিলাম, মনে হচ্ছিল চিত্রপটগুলো চোখের সামনে ভাসছে। আমিই যেন এভাবে কাউকে খুঁজে চলেছি। পাঠক নিজেকে কবিতার মধ্যে খুঁজে পাচ্ছে; এই যে আবহ এবং কাব্যরস কবি সৃষ্টি করতে পারলেন- কবির এই মুন্সিয়ানা প্রশংসার দাবিদার। কবিতার শৈলীটা পুরোনো, তবে অলংকার, উপমা এবং চিত্রপটের যুতসই ব্যবহার নতুনত্ব যোগ করেছে। দু-একটি অপ্রচলিত শব্দ আছে। সাধারণ পাঠককে হয়তো অভিধানের সাহায্য নিতে হবে, তবে কাব্যরস আহরণ তাতে একটুও কমতি হবে না। কবির জন্য শুভকামনা।
—শ্রীমন্ত দিবা
০২/০৪/২০২৬
মাত্রাবৃত্তের ছন্দে কবি হারানো প্রেমকে খুঁজছেন যা আসলে সে-অর্থে তার প্রেম ছিলোওনা। দুর্বোধ্য প্রেম সবসময়ই মানুষকে যন্ত্রণা দেয়, পাওয়া না পাওয়ার দোলাচলে ভোগায়! কবির ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।
— জান্নাতুল ফেরদৌসী সনি
০৩/০৪/২০২৬
