একটি কবিতা, কয়েকজন পাঠক

লেখক: সম্পাদক ও সমালোচক
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

এই লেখাটি কোনো একক সমালোচকের নির্ধারিত মত নয়— সোহেল সেফাতের একটি কবিতা পড়া শেষে কয়েকজন পাঠকের স্বতঃস্ফূর্ত আড্ডা থেকে জন্ম নেওয়া কিছু কথা মাত্র। কবিতাটি আমাদের কারও কাছে ব্যক্তিগত স্মৃতির মতো এসেছে, কারও কাছে সময়ের ভাষ্য হয়ে উঠেছে, আবার কেউ কেউ পঙ্‌ক্তির ভেতর খুঁজে পেয়েছেন নীরব প্রশ্ন ও অস্পষ্ট প্রতিবাদ।

এই আলোচনা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায় না, বরং কবিতার সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ককে সামনে আনে—যেখানে বোঝাপড়া আছে, দ্বিধা আছে, মতভেদও আছে। কবিতার নিচে যে কথাগুলো রাখা হলো, সেগুলো আসলে কবিতারই আরেকটি পাঠ; আড্ডার ভাষায়, খোলামনে, শ্রদ্ধা রেখে বলা কিছু অনুভব ও ভাবনা।

— এমরানুর রেজা
০৯/০২/২০২৬

২২/০১/২৬
পৃথিবী আমার থেকেও বড়
সোহেল শেফাত

আমি বেঁচে থাকতে চাই হাজার বছর।
এ পৃথিবী উলটে–পালটে বেঁচে থাকতে চাই, আঙুল তোলে—
কে আছো আমাকে টলাতে?
আসো, আসো,
এসে দেখে যাও—আমার আঙুল কত কঠিন, কত নির্দয়।

আমার বাহুজোড়ে মৃত লাশের গন্ধ,
চোখে–মুখে শ্মশানের আগুন,
পদতলে পিষ্ট সকল নিয়ম–নীতি।
হিসেবের খাতায় শুধু ধ্বংস, ধ্বংস আর ধ্বংস।

আমি উল্কাপিণ্ডের মতো আছড়ে পড়ি লোকালয়ে,
ভেঙে, গুড়িয়ে, জ্বালিয়ে–পুড়িয়ে দিই সকল জনপদ,
তবুও রয়ে যাই—আনত আমরণ।

আমার জীবনজুড়ে কেবল অনিয়ম–উশৃঙ্খলতা,
বুকজোড়ে রক্তের পিপাসা।
হাতে লেগে আছে কত বিধবার চোখের জল,
তবুও বেঁচে থাকব—নিশ্চিত, হাজার বছর।

আমার জীবন আনাবিল সময়ের।
কে হারাবে আমায়—আসো,
কে নাড়াবে আমায়—আসো,
কে তাড়াবে আমায়—আসো।

জানি, আমার হন্তারক কেবলই আমি,
আমার মীমাংসা কেবলই আমি।
আমারও শেষ হবে—হোক তা হাজার বছর পরে।
আমারও বিলীন হবে কোনো এক সময়ের বাঁকে,
কোনো এক অচেনা পথে,
হয়তোবা বয়সে তখন অনেক প্রৌঢ়।

শুধু জেনে রেখো—
পৃথিবী আমার থেকেও বড়।

রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী কিংবা এ ধরণের বিখ্যাত সব কবিতায় আমরা মানুষের জীবনের যে সহজাত অথচ কঠিন বাস্তবতা নিয়ে কবিদের হাহাকার করতে দেখি, কবি সোহেল শেফাত রচিত “পৃথিবী আমার চেয়েও বড়” কবিতায়ও কবিকে প্রায় একই রকম একটা স্বাভাবিক অথচ কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে দেখা যাচ্ছে ।

মূলত বয়স, নিরেট বাস্তবতার আয়নায় নিজেকে দেখে ফেলা এবং নিজের সাথে বোঝাপড়াগুলো যখন একজন কবি কিংবা একজন চিন্তাশীল মানুষের পোক্ত(পরিপক্ক) হয়ে আসে তখনই মানুষ কবি এধরণের ভাবনায় ডুবতে থাকেন!

ভাষার বিন্যাস সর্বোপরি ভাবপ্রকাশে কবিকে কিছুটা যুদ্ধংদেহী বা ধ্বংসাত্মক গতির আশ্রয়ে দেখা যায়। কবিতার ভাববস্তু সাধারণ সুন্দর! তবে কবিতায় সাধারণ সুন্দরকে অসাধারণ করতে কবিকে তেমন চেষ্টা অর্থাৎ সময় নিতে দেখা যাচ্ছে না। যে সময়টুকু পেলে কবিতাটি ভাষার দুর্বলতা (এমনকি আঞ্চলিকতা ও চলিত ভাষা মিশ্রিত কবিতার ভাষায়) কাটিয়ে বিষয়বস্তু নিয়েই দৌড়ে যেতে পারতো অনেক প্রজন্মের পাঠকের কাছে।

জান্নাতুল ফেরদৌসী সনি
কবি ও শিক্ষক
০৯/০২/২০২৬

কবি সোহেল শেফাতের ‘পৃথিবী আমার থেকে বড়’ কবিতাটি আত্মঅহংকারের বিরুদ্ধে এক গভীর আত্মস্বীকারোক্তিমূলক উপলব্ধি। কবিতাটির মূল বিষয়-ভাব-বক্তব্য হলো ক্ষমতা, ধ্বংসপ্রবণতা।

কবিতার বক্তা নিজেকে অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করলেও ধীরে ধীরে সেই শক্তির অন্তর্নিহিত নিষ্ঠুরতা ও আত্মবিনাশী চরিত্র উন্মোচিত হয়। এখানে মানুষ, রাষ্ট্র বা সভ্যতার প্রতীকী রূপে এক ভয়ংকর সত্তার আত্মকথন লক্ষ্য করা যায়।

কবিতায় ধ্বংস, রক্ত, শ্মশান ও উল্কাপিণ্ডের চিত্রকল্প ব্যবহারে এক নির্মম বাস্তবতার ছবি আঁকা হয়েছে। মুক্তছন্দে রচিত কবিতাটি বিষয়বস্তুর উশৃঙ্খলতা ও অস্থিরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পুনরুক্তি ও আহ্বানমূলক বাক্য কবিতার গতিকে তীব্র ও আক্রমণাত্মক করেছে।
শেষ স্তবকে এসে বক্তার আত্মঅহংকার ভেঙে পড়ে এক দার্শনিক উপলব্ধিতে— ব্যক্তি বা শক্তির চেয়েও পৃথিবী বৃহৎ ও চিরস্থায়ী। এই উপলব্ধিই কবিতার ভাবগত পরিণতি ও নৈতিক মর্মবাণীকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে বলে মনে করি।

— কাজী বর্ণাঢ্য
কবি ও চিত্রশিল্পী
০৮/০২/২০২৬

আপাত দৃষ্টিতে অপরাজিত অপশক্তির আত্মদম্ভ ও সর্বগ্রাসী সহিংসতার প্রতিফলনই কবি সোহেল শেফাত রচিত “পৃথিবী আমার চেয়েও বড়” কবিতার মূল সুর। যে ধ্বংসের উন্মাদনায় চিরযৌবনা হয়ে পৃথিবীকে কাঁপিয়ে তোলে, সেই শক্তিও জানে—তার শেষ অনিবার্য। অনন্ত যৌবনের অহংকারে সবকিছু গুঁড়িয়ে দেওয়ার বাসনাই একদিন ধূলিসাৎ করবে তার দম্ভকে। তাকেও বিদায় নিতে হবে—এই কঠিন সত্যই কবিতার গভীরে ধ্বনিত হয়েছে।

“শুধু জেনে রেখো—পৃথিবী আমার থেকেও বড়”—এই পংক্তির মধ্য দিয়ে কবি উচ্চারণ করেছেন এক কালজয়ী উপলব্ধি। ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক যে কোনো সর্বগ্রাসী সহিংস শক্তির ঊর্ধ্বে রয়েছে পৃথিবী, সময় ও সত্য। যুগে যুগে অশুভ শক্তি আত্মদম্ভে টিকে থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়; ইতিহাসে স্থায়ী হয় শুভশক্তিরাই। এই আশাজাগানিয়া সত্য কবি নিপুণ ভাষাশৈলীতে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।

তবে কবিতায় শুভ–অশুভ শক্তির দ্বন্দ্বে অশুভের দাপট তুলনামূলকভাবে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যে শক্তির মাধ্যমে অশুভ পরাজিত হয়, তার প্রকাশ কিছুটা ম্লান। আরও গম্ভীর, ভারী ও দৃঢ় শব্দচয়ন হলে কবিতার দার্শনিক ও নৈতিক ওজন আরও বৃদ্ধি পেত।

সামগ্রিকভাবে, কবিতাটি শক্তিশালী প্রতীক, তীব্র কাব্যভাষা ও গভীর দর্শনে সমৃদ্ধ—যা পাঠককে সহিংসতার অস্থায়িত্ব ও সত্যের চিরস্থায়িত্ব সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

—তনুমা কায়াশ্রী হিল্লোল
শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী
০৮/০২/২০২৬

‘পৃথিবী আমার থেকেও বড়’ কবিতাটি অস্তিত্ববাদের চাদরে মোড়ানো এক আত্ম পর্যবেক্ষণ এবং আত্মোপলব্ধি মূলক কবিতা। সোহেল সেফাতের আত্মোপলব্ধির টানাপোড়নও আছে এ কবিতায়। এখানে কবির ধ্বংসাত্মক সত্তা এবং আত্মোপলব্ধির পরিণত সত্তা যেন সমান্তরাল গতিতে বয়ে চলে। আর সেটাই  আইডিয়াল না হয়ে খানিকটা দ্বন্দ্ব তৈরি করে। উল্কাপিণ্ডের মতো আছড়ে পড়া,ভেঙে, গুড়িয়ে, জ্বালিয়ে–পুড়িয়ে দেয়ার মাঝে ধ্বংসদেবতার অসীম ক্ষমতার উন্মাদনা আছে কিন্তু শব্দনির্মাণের অসতর্কতায় চিত্রকল্প অতিরঞ্জিত বলেই মনে হয়েছে। তারপরই ‘আনত আমরণ’–এই থেকে যাওয়ার দাবিই দ্বন্দ্ব তৈরি করে। কবি নিজেই স্রষ্টা হয়েও আমৃত্যু ঈষৎ নত থাকার বিষয়টি প্রশ্নও তৈরি করে।

‘আমি এবং আমার’ শব্দটিতে যে আগ্রাসন কিংবা মানুষের মনের টাইটানিক অহংকার প্রকাশ পেয়েছে তা শুধু কবির নিজের নয়; সামষ্টিক অসীম ক্ষমতালোভী মানুষের ধ্বংসলীলার পরিণতির প্রতি কবির সতর্ক উপলব্ধি বলেই মনে হলো শেষ স্বীকারোক্তিতে। মানুষ সত্তার অসীমত্ব এবং সীমানা মানুষ নিজেই নির্ণয় করে ভাবনায় এবং ভাষায় নিজের সৃষ্টিসত্তাকে খানিকটা পরিণত করে তুলেছে কবি। কবির অসীম শক্তিশালী সত্তা মহাবিশ্বের মহাকালের সীমানায় কতটা সীমিত সেই চিরায়ত সত্যের স্বীকারোক্তি প্রকাশ পেয়েছে ভিন্ন ভাবে কবিতার শেষে।

আয়তিলতা
০৯/০২/২০২৬
শিক্ষক ও সমালোচক