রহস্যের আড়ালে একজন সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার মৃত্যু: সত্য উদ্ঘাটন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্বসম্পাদকীয়।

লেখক: ডেস্ক রিপোর্টার
প্রকাশ: ৫ ঘন্টা আগে

সংবাদ সারাক্ষণ:

একজন মানুষের মৃত্যু কখনোই কেবল একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়; কিছু কিছু মৃত্যু রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা, নাগরিক নিরাপত্তা, বিচারব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দেয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মরদেহ রাজধানীর তুরাগ নদ থেকে উদ্ধারের ঘটনা তেমনই এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

গত ২৮ অক্টোবর নিখোঁজ হওয়ার পরদিন তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুর ঘটনাটি নিয়ে গুরুতর সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। এ ঘটনায় তাঁর বাবা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও ঘটনাটির তদন্ত করছে। ইতোমধ্যে তাঁর এক পরিচিত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের খবরও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার পেছনের উদ্দেশ্য এখনো তদন্তসাপেক্ষ। কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরিতাহসিফ সাউরির মৃত্যু ঘিরে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তিনি কেন নিখোঁজ হলেন? নিখোঁজ হওয়ার আগে কার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছিল? তাঁর মৃত্যুর পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, নাকি অন্য কোনো কারণ রয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা তদন্তকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্ব।বিশেষ করে তাঁর অতীত কর্মজীবন এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের একটি আলোচিত ভিডিওর সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তবে এসব বিষয়কে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে অনুমাননির্ভর আলোচনা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। আইনের শাসন ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নবাংলাদেশের একজন নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। তিনি সামরিক বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা হোন কিংবা সাধারণ নাগরিক—আইনের চোখে প্রত্যেকের জীবনের মূল্য সমান।কোনো ব্যক্তির পেশাগত পরিচয়, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা অতীত কর্মকাণ্ড কখনোই তাঁর নিরাপত্তার অধিকারকে খর্ব করতে পারে না। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার হবে প্রচলিত আইন ও যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ায়। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার রাখে না।

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনাটি তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের তদন্ত নয়; এটি দেশের সামগ্রিক নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্তএ ঘটনায় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর প্রতি আমাদের প্রত্যাশা অত্যন্ত স্পষ্ট। তদন্তের প্রতিটি ধাপ হতে হবে পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পরিচালিত।মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষা, ঘটনার আগে ও পরে তাঁর চলাচল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে তদন্তের নামে যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মনে রাখতে হবে, একটি আলোচিত ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত গ্রেপ্তার কিংবা প্রাথমিক বক্তব্যই শেষ কথা নয়। প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণের উপযোগী তদন্ত সম্পন্ন করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।রাষ্ট্রের কাছে কয়েকটি প্রত্যাশাআমরা মনে করি, এ ঘটনায় কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন

—১. মৃত্যুর প্রকৃত কারণ দ্রুত ও বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

২. ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।

৩. অতীত কর্মজীবন কিংবা অন্য কোনো ঘটনার সঙ্গে মৃত্যুর যোগসূত্র থাকলে তা প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকাশ করতে হবে।

৪. তদন্তের নামে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি করা যাবে না।

৫. অপরাধ প্রমাণিত হলে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৬. নিহতের পরিবারকে ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক সহযোগিতা দিতে হবে।

শেষ কথাএকটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু তার উন্নয়ন, অবকাঠামো কিংবা সামরিক সক্ষমতায় নয়; বরং তার নাগরিকেরা কতটা নিরাপদ এবং অপরাধের শিকার হলে কতটা ন্যায়বিচার পান, তার মধ্যেই রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতা প্রকাশ পায়।কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু ঘিরে যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার অবসান ঘটাতে হলে প্রয়োজন সত্যনিষ্ঠ তদন্ত এবং দৃশ্যমান বিচারিক অগ্রগতি। কোনো প্রভাব, পরিচয় কিংবা অদৃশ্য শক্তি যেন তদন্তের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।আমরা কারও বিরুদ্ধে আগাম রায় দিতে চাই না। আমরা চাই সত্য প্রকাশিত হোক, অপরাধী শনাক্ত হোক এবং নিরপরাধ কেউ যেন অন্যায়ের শিকার না হন।একজন সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং তাঁর পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ বিচারহীনতা শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকে অনিরাপদ করে তোলে।