মৃত্যুক্ষুধা এবং আমাদের জগৎ

লেখক: আয়তিলতা
প্রকাশ: ১ বছর আগে

“ক্ষুধা আছে বলেই ওরা কেবলই পরস্পরের সর্বনাশ করে।”

‘ক্ষুধা’ শব্দটি এখন শুধু ভোজনইচ্ছা অর্থাৎ খাবারের ইচ্ছের প্রতিনিধি নয়। ‘ইচ্ছা’ শব্দের অসীমতা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছেয়ে গেছে। অর্থ এবং মাহাত্ম্যের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে ইচ্ছের সংজ্ঞা এবং প্রকারভেদ ভিন্ন থেকে ভিন্নতর হয়ে উঠছে। ক্ষুধা কিংবা চাহিদা শব্দটি শুধু ভালো থাকার অপর নাম। ভালো থাকার সাথে ভালো রাখার বিষয়টি ‘প্রিয় সম্পর্কের’ কাছে দায়বদ্ধ। ভালো রাখার জন্য প্রিয় হয়ে উঠা জরুরি। নতুবা বিপ্লবী নজরুল ‘মৃত্যুক্ষুধা’ শব্দটির জন্ম দিতেন না। হয়তো স্টিভ জবসকেও তার এক ভাষনে বলতে শুনতাম না — “কেউই মরতে চায় না। এমনকি যারা স্বর্গে যেতে চায় তারাও স্বর্গে যাওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি মরতে চায় না।”

মরতে না চাইলেও মৃত্যুর পরিকল্পনাছক এখন আর্টে পরিণত হচ্ছে। বাতাসে ভেসে উড়ে উড়ে খুব দূরে চেনা কোন সুরেই বেজে উঠছে মৃত্যুর শব্দ। খুব স্বাভাবিক হয়ে উঠছে অগুনতি লাশের দৃশ্য। ইচ্ছের গভীরতা না থাকলে বাসে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারতেন না মিছিল কিংবা হরতালে। দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর গল্প থাকতো না ইতিহাসে। বাস, ট্রেন কিংবা গার্মেন্টসে অগুনতি মৃত্যুতে দায়হীন ভাষা শুনতে হতো না কখনো। সম্ভবত এটাই কারণ মরে যারা তারা প্রিয় নয়; প্রয়োজন। এজন্যই হয়তো লেখক ‘দেব জ্যোতি ভক্তে’র কলমে প্রতিবাদ ভাষা পায় —

“ভেবেছিলাম মানুষ পুড়ে মরছে। পরে শুনি – মানুষ না; শ্রমিক পুড়ে মরছে!”

অপরাধটা তাদেরই যারা ঘর থেকে বের হয় কাজের জন্য। শ্রমিক হয় খাবারের জন্য। অপরাধ তারই যে স্লোগানে স্লোগান দেয় মানুষ মানুষের জন্য। মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসের মেজ বৌও অপরাধী। কারণ তিনি মানুষ হতে মিশনারি ম্যামদের সাথে গিয়েছিলেন। আনসারের অপরাধ আরও গুরুতর। কারণ মানুষের ক্ষুধা মুক্তির জন্য তার এতটা কান্না কেন?

১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী অস্থির সময়ের সাথে বর্তমান করোনা মহামারির চলমান বাস্তবতা প্রায় সমার্থক। কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৭–১৯৩০ সালের কৃষ্ণনগরের ‘চাঁদ সড়ক’ এলাকার জীবন বাস্তবতার নিরিখে বিশ্বমানবের বিবেককে জাগ্রত করার রোল মডেল তৈরি করেছেন। যুদ্ধোত্তর যুগের অর্থসংকট, শ্রেণিবৈষম্য, নগরচেতনার প্রকাশ এবং উপলব্ধিতে সার্থক। এ উপন্যাস রচনায় নজরুলের দ্বৈতসত্তা পাশাপাশি কাজ করেছে। একদিকে তিনি সংগীতামোদী, প্রাণচঞ্চল অন্যদিকে ধ্যানী, শিল্পী, প্রেমিক, সংসার-অনাসক্ত, সংস্কারনিষ্ঠ এবং দেশ ও জাতীর প্রয়োজনে সর্বস্ব ত্যাগী। এ দ্বৈতসত্তার প্রকাশ ঘটেছে প্যাঁকালে ও আনসার চরিত্রের মধ্যে। এ উপন্যাসের চরিত্র প্লট ও ভাষা জীবনস্পর্শী। এ উপন্যাসের ভাষা একান্তই নজরুলীয় বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ। তিনি চরিত্রের স্বাভাবিকতার স্বার্থে যার যার মুখে যে সংলাপ প্রযোজ্য তাই রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। ভাষায় যমক, শ্লেষ, উৎপ্রেক্ষা বা অলঙ্কার বিশিষ্টতা নজরুলের গদ্য রচনার অনন্যতা। প্রাত্যহিক শব্দের নতুনতর ব্যঞ্জনা এবং ভাষার ধ্বনিময়তা উপন্যাসের গ্রহণযোগ্যতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। নজরুলের এ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সাম্যবাদী চেতনার উপন্যাস। যদিও অস্থির পরিবেশে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ পাঠক এ উপন্যাসে পাবে না। এই করোনার সময়েও এই বাংলাদেশে কতটুকু স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ আছে তা কেবল প্রশ্নবোধক চিহ্নটির মাঝেই উত্তর আছে। একদিকে ক্ষুধা, একদিকে মৃত্যু। অর্থাৎ মৃত্যুর ক্ষুধা।

“পুতুল খেলার কৃষ্ণনগর।
যেন কোন খেয়ালি শিশুর খেলা শেষের ভাঙ্গা খেলাঘর।”

উপন্যাসের শুরুটা তিনি পুতুল, খেলা, কৃষ্ণনগর এই তিনটি শব্দ দিয়েই করেছিলেন। পুতুল খেলা পরিচালনার জন্য কোন সংবিধান নীতির প্রয়োজন নেই। নেই মানবিক হৃদয়অভিধান। শুধু নতুন খেলাঘর বাঁধার জন্য খেলাঘর ভাঙার আয়োজন। পুতুল খেলার এই বর্তমান দৃশ্য অনেকটা বাংলা তথাকথিত সিনেমার মতো– শুরুটা দেখে শেষটা ভাবা যায়। খেলা বললে অনেকটা সার্কাস খেলার মতো চলছে।

‘মৃতুক্ষুধা’ উপন্যাসের উপজীব্য কৃষ্ণনগরের চাঁদ সড়কের এক বস্তি এলাকা। এখানে বাস করে এক দরিদ্র মুসলিম পরিবার। বৃদ্ধা মা, তিনটি বিধবা পুত্রবধূ ও তাদের কয়েকটি সন্তান। আবার ঊনিশ বছরের একটি ছেলে, স্বামীর বাড়ি ফেরৎ একটি মেয়ে নিয়ে তার হতদরিদ্র সংসার। বৃদ্ধার ছেলের নাম প্যাঁকালে।প্যাঁকালে চরিত্র প্রতিনিধিত্ব করেছে নজরুলের কৈশোর জীবনকে। আর আনসার করছে নজরুলের পরিণত ও আদর্শায়িত জীবনকে। তবে তুলনামূলকভাবে প্যাঁকালে চরিত্র অনেক বেশি উজ্জ্বল ও বাস্তব। প্যাঁকালে টাউনের থিয়েটার দলে নাচে, সখীসাজে গান করে, কাজও করে- রাজমিস্ত্রির কাজ। বাবুঘেঁষা হয়ে সেও একটু বাবু গোছের হয়ে গেছে। টেরি কাটে, সিগারেট টানে, পান খায়, চা খায়। পাড়ার মেয়ে মহলে তার মস্ত নাম। বলে- যেমন গলা তেমনি গান, তেমনি সৌখিন। থিয়েটারে নাচে, বাবুদের থিয়েটারে। মুহূর্তেই আমাদের মনে পড়ে যায় লেটোর দলের গান লেখক গায়ক অভিনেতা নজরুলকে। প্যাঁকালে গভীর সহানুভূতিশীল ও বিবেচক। পুরো সংসারটা তার ঘাড়ের উপর। একটা আয়না কেনার জন্যে রোজ সে চার আনা পয়সা রাখে। কিন্তু বাজার করতে গিয়ে যখন দেখে ছ আনায় সকলের খাবার মতো চালই পাওয়া যায় না তখন বাধ্য হয়ে লুকোনো সিকিটা বের করতে হয়। প্যাঁকালে জীবন ও জীবিকার তাগিদে খান সাহেবের বাড়িতে কুড়ি টাকায় চাকরি নিয়েছিল। যেমন নজরুলও খ্রিস্টান গার্ড সাহেবের ‘বয়’-এর চাকরি নিয়েছিলেন পঁচিশ টাকায়। প্যাঁকালে (ওমান কাতলি (রোমান ক্যাথলিক) মধু ঘরামির কন্যা কুর্শিকে) ভালোবেসেছিল। এই ভালোবাসাকে সার্থক করার জন্য সে ধর্মান্তরিত হতেও দ্বিধা করেনি। অবশ্য সে শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছে সস্ত্রীক স্বধর্মে।

প্রথম কাহিনিতে মৃত্যু আছে, ক্ষুধাও আছে। কিন্তু দ্বিতীয় কাহিনিতে মৃত্যু আছে, ক্ষুধা নেই। দ্বিতীয় কাহিনিটি সংসার-বিবাগী দেশপ্রেমিক বিপ্লবী আনসারের। বৈপ্লবিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী সে। গোপন আস্তানায় তাদের সাংগঠনিক এবং বিভিন্ন সামাজিক কার্যকলাপ পরিচালিত হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তরালে এই কার্যক্রম চালাতে গিয়ে এসব বিপ্লবীকে অনেক ঝক্কি ঝামেলাও পোহাতে হয়। পুলিশী ওয়ারেন্ট নিয়ে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াতে হয়। ছন্নছাড়া, দিশেহারা এবং অনিশ্চিত জীবনের ঘানি টানতে টানতে কখনও বা কোথাও গিয়ে আস্তানা গাড়ে কয়েক দিনের জন্য। দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মোচনে উদ্দীপ্ত আনসার সমাজের ছোটখাটো অনেক ঘটনারও অংশীদার হয়ে যায়। সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রত্যাশিত ঘটনাপ্রবাহ বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি করে যা সামগ্রিক ব্যবস্থাকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যায়।

ক্ষুধা যদি নাই থাকে তবে আনসারের জন্য সংসার-বিবাগী, দেশপ্রেমিক কিংবা বিপ্লবী শব্দগুলো বলা কেন? কেন? সে সময় ক্ষুধার জ্বালায় মা তার ছেলের হাত থেকে কেড়ে খাচ্ছে। নিজের ছেলে মেয়েকে নরবলির জন্য বিক্রি করছে দু’মুঠো অন্নের জন্য। আনসারের, রুবির, লতিফার মতো হয়তো আরও অনেকেরই ক্ষুধা নেই। অর্থাৎ একটা শ্রেণি প্রয়োজনের বেশি জমিয়ে রাখার আয়োজন করে বলেই অন্যরা বঞ্চিত হয়। আনসারও তাদের দলে যারা বঞ্চিত। তাই তো সে প্রিয় বঞ্চিতের দুঃখকে উপলব্ধি করতে পারে। দু মুঠো অন্নের অভাবে ওদের আত্মা আজ সকল রকমের মলিন। তুই বুঝবিনে বুঁচি(লতিফা), ওদের অভাব কত অসীম, ওদের দুঃখ কত অপরিমেয়। আলোচনা তখন—‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’ প্রবাদটিই উঠে আসে। আর অভিযোগ বক্সটি তারাই খোলা রাখে যারা দুধে- ভাতে উৎপাতে থাকে। তাই তো আনসার লতিফাকে বলে —-

“—অন্তত ওদের দোষ দিসনা আমার কাছে কখনো!”

বর্তমান সময়ে বঞ্চিতের প্রতি অভিযোগ, তার জন্য ভাংচুর খুব সহজেই কি দেখতে পাওয়া যায় না চোখের সামনে? রাস্তা -ঘাটে, টেলিভিশনে, মোবাইল কিংবা সংবাদ পত্রে? তাদের অপরাধ একটাই তারা আর যায় হোক উঁচুতলার মানুষ নয়! তারা প্রিয়জন নয়; কখনো কখনো কেবলই প্রয়োজন!

নজরুল মানুষকে সম্বোধনে ‘বন্ধু’ শব্দটি ব্যবহার করতেন। নজরুলের পরিণত রূপ আনসারের মুখে ভেসে আসে ‘বন্ধুগণ’ শব্দটি। অধিকার বঞ্চিতের অধিকারের লড়াইয়ে যে সামনে এগিয়ে আসে তার জন্য রাষ্ট্র জেলখানাকে নিরাপদ মনে করে। ইতিহাসের পাতায় এর চেয়ে চমৎকার কোন গল্প নেই! আনসারের জন্য এর বিপরীতে হিত হয় কি করে? তাকে জেলে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় জনতার উদ্দেশ্য বলে —

“বন্ধুগণ! আমার বিদায় কালে তোমাদের প্রতি আমার একান্ত অনুরোধ, তোমরা তোমাদের অধিকারের দাবী কিছুতেই ছেড়ো না!তোমাদেরও হয়তো আমার মতো করে শিকল পড়ে জেলে যেতে হবে, গুলি খেয়ে মরতে হবে। তোমারই দেশের লোক তোমারি পথ আগলে দাঁড়াবে, সকল রকমের কষ্ট দেবে, তবু তোমরা তোমাদের ছেড়ো না, এগিয়ে যাওয়া থেকে নিভৃত হয়ো না। আগের দল মরবে বা পথ ছাড়বে, পিছনের দল তাদের শূন্যস্থানে গিয়ে দাঁড়াবে। তোমাদের মৃতদেহের উপর দিয়ে আসবে তোমাদের মুক্তি।”

কোনো আনসারই হয়তো জানে না — মুক্তির জন্য আর কতো মৃতদেহের প্রয়োজন? জীবনানন্দ দাশ কি নীরবধ্যানে যুগান্তরের এমন সময়কেই লিখেছিলেন—

“অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোন প্রেম নেই প্রীতি নেই করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাঁদের হৃদয়।”

জেল থেকে আনসারের শেষ চিঠি লতিফা হাতে পেয়ে বুঝতে পারে জীবনকে আর যায় হোক কাক, শকুন কিংবা শেয়ালের খাদ্য করা যাবে না–

“আমাদেরই পথের পথিক যারা রয়ে গেল— তাদের মাঝেই আমায় দেখতে পাবি। এই কারায়, এই ফাঁসিমঞ্চে আমরা ত আজ এসে দাঁড়ায় নি, আমাদের কণ্ঠে শত জন্মের শত লাঞ্ছণা রক্ত– লেখা হয়ত আজো মুছে যায় নি। পিঞ্জরের দ্বার ভেঙ্গে মুক্ত লোকের উর্ধ্বে উড়ে গান গাওয়ার এ সাদ কেন জাগলো? জীবনকে আমরা জীবিতের মত ব্যয় করে গেলাম, মৃতের মত কার্পণ্য করে কাক-শকুনের খাদ্য করি নি!”

উপন্যাসের মেজ বৌও নিজেকে মানুষ করতে চেয়েছিলেন। কাক – শকুনের খাদ্য নয়। সে অত্যন্ত সুন্দর দেহে যেমন– মনেও তেমনি। অত্যন্ত উদার হৃদয়, স্নেহপ্রবণ, সহানুভূতিশীল। দারিদ্র্যের দগ্ধ মরুতে সে যেন এক সুশীতল মরুদ্যান। দরিদ্র ঘরের রূপসী বিধবার প্রতি লালসা আর কামনার দৃষ্টি কটাক্ষ, হাতছানি চারদিকে। এসব থেকে নিজেকে অত্যন্ত কৌশলে বাঁচিয়ে রেখেছে। এ চরিত্রটি অপার সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছিল। তাঁর অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বহির্দ্বন্দ্ব উপন্যাসের উৎকর্ষকে অন্য মাত্রা দেবার সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু নজরুল সে পথে যান নি। যথেষ্ট কারণ ছাড়াই ঔপন্যাসিক মেজবৌকে ধর্মান্তর করালেন। মিশনারী ম্যামদের মানবিক সেবাপরায়ণতা তাকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গেল। সে ছেলেমেয়ের খাওয়া-পরার জন্য খ্রিস্টান হলেন, তাদেরকে ফেলে রেখে চলে গেলেন অনেক দূরে- বরিশালে। ধর্মান্তরিত হওয়া যে তার বিলাসিতা মানসিকতা নয় তা তার শব্দে উঠে আসে—

“আমিতো মেমসাহেব হতে আসিনি ভাই, মানুষ হতে এসেছিলুম। আলো-বাতাস প্রাণের বড় অভাব আমাদের সমাজে, তাই খাঁচার পাখির মতো শিকলি কেটে বেরিয়ে পড়েছিলাম। কিছু ভালো হয়নি আমার, তা বলব না। এখন যা শিখেছি, তাতে করে যেখানেই থাকি দুটো পেটের ভাত যোগার করার অসুবিধে হবে না। “

ছেলের অসুখের সংবাদ জেনে ফিরে এলেন বাড়িতে। দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ থাবায় মৃত্যু হয় ছেলেরও। এক ছেলেকে হারিয়ে পাড়ার সকল ছেলের মা হয়ে উঠে সে। ক্ষুধাতুর শিশুদের খাওয়াতে খাওয়াতে কোলে তুলে, আদর করে, চুমু খায়। যে খোকাকে দেখে, তার মুখেই সে তার খোকার মুখ দেখতে পায়! সে যেন জগজ্জননী হয়ে উঠে! রবীন্দ্রনাথের কল্যাণী কিংবা সিনেমায় সব হারিয়ে শেষ শক্তিকে ‘শিক্ষকতা’ শব্দটির মাঝে যেমন করে আদর্শিক করে তোলে তেমন করে মেজ বৌ ছোট ছোট সকল ছেলেমেয়েদের সকাল- সন্ধ্যে পড়াতে শুরু করে। সে তখন মা হয়ে মাতৃভূমিকে ধারণ করে হৃদয়ে। মানুষ চায়লেই অনেক পরাজয়কে জয়ের সিঁড়ি করে তুলতে পারে।

“এ যেন তার আর এক জন্ম! সে যেন নবজন্মের নতুন লোকের নতুন মানুষ। “

আনসার ভালোবাসতো ময়মনসিংহের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কন্যা রুবীকে। রুবীও ভালোবাসতো তাকে। কিন্তু মা-বাবা রুবীকে বিয়ে দেয় এক অর্থ লোলুপ যুবকের সাথে। রুবী তাকে স্বামী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। অবশ্য অল্পদিনের মধ্যেই রুবীর স্বামী মৃত্যুবরণ করে। মানুষের জন্য জাতির জন্য, দেশের জন্য আনসার সর্বত্যাগী হয়েছে। এমনকি নিজের জীবনও সঁপে দিয়েছে মৃত্যুর নির্মম শীতল হাতে। সে নজরুলের যোগ্যতম প্রতিনিধি। আনসার রাজবন্দী অবস্থায় ক্ষয়রোগে(যক্ষা) আক্রান্ত হয়। রুবী এ সংবাদ পেয়ে ছুটে যায় আনসারের কাছে।আনসার বলে–

“রুবি,চিরদিনই বিষ খেয়ে বড় হয়েছি, আজ মৃত্যুর ক্ষণে তুমি অমৃত পরিবেশন কর! আমি মৃত্যুঞ্জয়ী হই।”

রুবি জানে আনসারের যে ক্ষুধায় পেয়ে বসেছে তা — মৃত্যুক্ষুধা। এ মৃত্যু তার একার নয়, ওর বুকের মৃত্যু-জীবাণু তাকেও আক্রমণ করবে। এবং আক্রমণ করেও। এমন মৃত্যু- জীবাণু করোনা ভাইরাসের আক্রমণে দুটো প্রাণের চিরবিদায়ের দৃশ্যও কম নয়। প্রিয় সম্পর্ক তখন —

নতুন জীবন
নতুন তারায়
নতুন দেশে
নতুন প্রেমে বেঁচে থাকে।