দিনাজপুর ভ্রমণ: ইতিহাস, প্রকৃতি ও মানুষের গল্প

লেখক: এমরানুর রেজা
প্রকাশ: ২ years ago

ভ্রমণ মানেই নতুন কিছু দেখা, শোনা, শেখা, অনুভব করা— আর যদি সেই ভ্রমণের গন্তব্য হয় দিনাজপুর, তাহলে তা হয়ে ওঠে ইতিহাস, প্রকৃতি আর সংস্কৃতির এক অনন্য মিশেল। আমার এবারের গন্তব্য ছিলো দিনাজপুর, এক ঐতিহ্যবাহী জনপদ যেখানে ইতিহাস, শিল্প, ধর্মীয় স্থাপত্য ও প্রকৃতি একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।

দিনাজপুর শহরে নেমেই প্রথম গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের মোটেল। শহরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে ভালো থাকার জায়গা, তবে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আপডেট হতে পারেনি। রুমের আসবাবপত্র, এসি, তোয়ালে, এমনকি সামগ্রিক পরিবেশও অনেক পুরনো। তবে নিরাপত্তার দিক থেকে মোটেলটি বেশ ভালো, আর পরিবেশটাও নিরিবিলি।
সকালে ঘুম থেকে উঠলাম প্রায় নয়টায়। তারপর নাস্তা— দুটি রুটি, একটি ডিম, একটি পানির বোতল, আর এক কাপ কফি। তবে অবাক করা বিষয়, যদি বাড়তি একটি রুটি চাই, তাহলে অতিরিক্ত বিল দিতে হবে! অথচ এক রাতের জন্য তারা নিয়েছে ৩২০০ টাকা। ভাবলাম, পর্যটন খাতে যদি একটু বেশি যত্ন নেওয়া হতো, তাহলে দিনাজপুরের মতো জায়গায় আরও বেশি পর্যটক আসতো।

নাস্তা শেষ করেই কান্তজিউ মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে, তাই একটা অটোরিকশা ঠিক করলাম ২০০ টাকায়। চালকের নাম আবুজার আলী, পেশায় অটোচালক, তবে ধর্মীয় দীক্ষায় একজন কোরআনের হাফেজ। সংসারে দুই সন্তান, জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা।

অটো ছুটছে রাস্তা ধরে। চারপাশে আমবাগান, লিচু বাগান, ধানের ক্ষেত, আখ ক্ষেত— সব মিলিয়ে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। পথিমধ্যে চোখে পড়লো হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি), আরেকটু সামনে চেহেল গাজী মাজার শরীফ। জনশ্রুতি অনুসারে, এখানে ৪০ জন সুফি সাধক শায়িত আছেন, যারা ধর্ম প্রচারের জন্য বাংলায় এসেছিলেন।
চারপাশের প্রকৃতির সৌন্দর্যে চোখ আর মন জুড়িয়ে গেল। ঠিক তখনই দূর থেকে দেখা মিলল কান্তজিউ মন্দিরের চূড়া।

দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নে, ঢেপা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে কান্তজিউ মন্দির। এক নিঃশব্দ প্রেমের স্মারক, ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে।
মন্দিরটি তৈরি করেছিলেন মহারাজা প্রাণনাথ রায়। ১৭০৪ সালে এর নির্মাণ শুরু হলেও তা শেষ হয় ১৭৫২ সালে, তার ছেলে রাজা রামনাথ রায়ের সময়ে। মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীতে রয়েছে ইন্দো-পারস্য কৌশলের নিদর্শন। একসময় মন্দিরের নয়টি শিখর ছিল, যা ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যায়।
মন্দিরের দেয়ালে টেরাকোটার কারুকাজ সত্যিই বিস্ময়কর! এখানে ফুটে উঠেছে রামায়ণ, মহাভারত, মুঘল বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। টেরাকোটার চিত্রে নারী-পুরুষের দৈনন্দিন জীবন, প্রেম, যুদ্ধের দৃশ্য এতটাই জীবন্ত, যেন কালের গর্ভ থেকে বেরিয়ে এসেছে! মন্দির নির্মাণে হিমালয়, আসাম, বিহার থেকে আনা হয়েছিল পাথর।

এক সময়ের নবরত্ন মন্দির, আজ ধ্বংসস্তূপের চিহ্ন বয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এর প্রতিটি ইট যেন বলে যায় বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতির অতীত গৌরবের গল্প।

কান্তজিউ মন্দিরের পাশেই রয়েছে নয়াবাদ মসজিদ। এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৭৯৩ সালে, ঠিক সেই সময়, যখন কান্তজিউ মন্দির তৈরি হচ্ছিল। মন্দিরের নির্মাণকাজে ইরান, তুরান ও পারস্য থেকে আসা মুসলিম শ্রমিকরা কাজ করতেন। তাদের জন্যই মহারাজ প্রাণনাথ ১.১৫ বিঘা জমিতে এই মসজিদ গড়ে দেন।
একজন হিন্দু রাজা মুসলমানদের ইবাদতের জন্য মসজিদ তৈরি করে দিচ্ছেন— ভাবতেই হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে যায়। সত্যিই, ধর্মের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই।

পরবর্তী গন্তব্য রামসাগর, বাংলাদেশের বৃহত্তম মানবসৃষ্ট দিঘি। আয়তন ৪৩৭,৪৯২ বর্গমিটার, গভীরতা প্রায় ১০ মিটার। তবে এর পেছনের ইতিহাস সত্যিই মর্মস্পর্শী।
প্রাণনাথ রায়ের সময়, রাজ্যে ভয়াবহ খরা দেখা দেয়। তিনি জনগণের পানির কষ্ট দূর করতে মাত্র ১৫ দিনে ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে রামসাগর খনন করান। তবে পুকুর খননের পরও এতে জল উঠছিল না। রাজা স্বপ্নে দেখেন, তার পুত্র রামনাথের জীবনের বিনিময়ে জল আসবে।
দয়ালু রাজার মন কাঁদলেও জনগণের তৃষ্ণার জন্য তিনি সন্তান বিসর্জন দেন। রামনাথ যখন পুকুরের নিচে তৈরি মন্দিরে প্রবেশ করেন, তখনই ঘটে সলিল সমাধি। এর পরেই পুকুরটি জলপূর্ণ হয়। সেই থেকেই এই দিঘির নাম রামসাগর।


আজ এখানে মাছ ধরা, বনভোজন, এমনকি তাবু টাঙিয়ে রাত কাটানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। বন বিভাগের বাংলোও আছে, যেখানে রাত কাটালে প্রকৃতির নীরবতা অনুভব করা যেতো!

কান্তজিউ মন্দির, নয়াবাদ মসজিদ কিংবা রামসাগরের মতো স্থাপত্য নিদর্শন ছাড়াও দিনাজপুরের গর্বের আরও একটি অংশ হলো দিনাজপুর সংগ্রহশালা। এটি শুধু একটি মিউজিয়াম নয়, বরং দিনাজপুরের অতীতকে জানার, ছুঁয়ে দেখার ও উপলব্ধি করার এক নিঃশব্দ পাঠশালা।

দিনাজপুর শহরের কেন্দ্রস্থলে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিকটেই অবস্থিত দিনাজপুর সংগ্রহশালা। এটি মূলত দিনাজপুর অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শহরের কোলাহল থেকে খানিকটা দূরে, এক শান্ত পরিবেশে অবস্থিত এই সংগ্রহশালা ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এক আকর্ষণীয় স্থান।

✅ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন: প্রাচীন দিনের পাথরের শিলালিপি, শঙ্খলিপি, পোড়ামাটির ফলক ও বিভিন্ন আমলের ভাস্কর্য।
✅ মুদ্রা ও শিলামুদ্রা: পাল, সেন ও মুঘল আমলের দুর্লভ স্বর্ণ, রৌপ্য ও তাম্র মুদ্রার বিশাল সংগ্রহ।
✅ রাজবাড়ির স্মারক: দিনাজপুরের মহারাজা গণেশ, রামনাথ রায় ও অন্যান্য রাজাদের ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র, অলংকার, তৈজসপত্র এবং রাজকীয় পোশাক।
✅ লোকজ শিল্প ও সংস্কৃতি: দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী পোড়ামাটির শিল্প, কাঠের অলংকৃত আসবাবপত্র, লোকগীতির পুঁথি ও প্রাচীন কারুশিল্পের নমুনা।

দিনের শেষ গন্তব্য ছিল খানপুর সীমান্ত ফাঁড়ি। এখানে এসে এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো— এক বাড়ির দেয়াল আরেক দেশের সীমানা। যে শিশুরা জন্ম নেয় এখানে, তারা ছোট থেকেই দেখে সীমান্তের কাঁটাতার, কঠোর বিধিনিষেধ। মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর বিভাজন হয়তো এই সীমান্ত রেখাগুলো।

দিনের ক্লান্তি নিয়ে ফিরে এলাম মোটেলে। কিন্তু রাতটা কেটেছে মশার কামড়ে! এত দামি রুমেও যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প কীভাবে বিকশিত হবে?
আমাদের দেশে যে পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা আছে, তা দিনাজপুরে এসে আরও ভালোভাবে বুঝলাম। কেবল সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক ব্যবস্থা, আর একটু যত্নের দরকার।
একটা অপূর্ণতার অনুভূতি নিয়েই ফিরে এলাম, কারণ কান্তজিউ মন্দিরে অর্ধেক দিন কাটানোর ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সময় ছিল কম। তবে এই অপূর্ণতাই হয়তো আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাবে দিনাজপুরের সবুজ, ইতিহাস আর মানবিকতার কাছে।