কখনো ভাবি নি এভাবেই স্বৈরাচারের পতন ঘটাবো, আজও আমার কাছে এটি স্বপ্নের মতই মনে হয়। আসুন আপনাদেরকে জানাই জুলাই আগস্ট আন্দোলনে আমার অংশ নেয়া আর আন্দোলনে কাটানো সেই দিনগুলির কথা।
সেদিন ১৫ ই জুলাই রাজধানীর রাজপথে নেমে আসে কোটা সংস্কার দাবিতে হাজারো শিক্ষার্থীরা সেই মিছিলে অংশ নেন কিছু নারী যুদ্ধারা! তাদেরকে প্রতিহত করতে খুনি হাসিনার লেলিয়ে দেয়া বাহিনী ছাত্রলীগ নামে রাস্তায় নির্যাতন চালান সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর তাদের নির্যাতনের হাত থেকে বাদ পড়েনি নারী শিক্ষার্থীরাও! এই খবর ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাংলাদেশে, আমি আমার পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানোর জন্য ফেসবুকে লিখি একটাই ক্যাপশন'(ছাত্রলীগকে উদ্দেশ্য করে) তুই কয় টাকার মাস্তান হইছস আমার বোনদের গায়ে হাত দেস এত বড় সাহস তোদেরকে কে দিল আমি আমার পক্ষ থেকে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই যারা এই ঘটনায় জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই। তারপরের দিন ১৬ই জুলাই আমি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি আদায়ের সমর্থনে নেমে পড়ি রাজপথে, প্রথমেই রাজধানীর মালিবাগ মৌচাক মোড়ে অবস্থান নেই সিদ্ধেশ্বরী কলেজ শিক্ষার্থীদের সাথে স্লোগানে মুখরিত করে তুলি মৌচাকের গোল চত্বর! তারপর থেকে অনলাইনেও প্রতিবাদে সরব হয়ে যাই, একের পর এক লিখতে থাকি স্বৈরাচার বিরোধী স্ট্যাটাস! দিনটা ১৭ই জুলাই আজকে অবস্থান নেই ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি সহ আরো কয়েকটি প্রাইভেট ভার্সিটির সাথে রামপুরা এলাকায়, সেদিন আমাদের সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয় ছাত্রলীগ ও পুলিশ লীগের সাথে, সেদিন আমাদেরকে সমর্থন দেন প্রথম শিক্ষক হিসেবে আসিফ মাহতাব উৎস স্যার! রাত আটটার পরেই চলে আসি বাসায়, পরের দিন ভোরে অর্থাৎ ১৮ই জুলাই নেমে পড়ি আবারো রাজপথে আজকের স্পট হল মালিবাগ সাফেনা ক্লিনিক ও রেলগেটের মাঝামাঝি জায়গায় সেদিন আমরা খুব অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ আন্দোলন করি এরই মাঝে চলে আসে পুলিশের কয়েকটি গাড়ি তারা এসেই আমাদের উপর গুলিবর্ষণ শুরু করে তখন সর্বপ্রথম পুলিশের সামনে স্লোগান তুলি আমি জিএম রাশেদ! কোটা না মেধা, মেধা মেধা তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার এই স্লোগানে মুখরিত করে তুলি পুরো মালিবাগ এলাকা, চলতে থাকে পুলিশের সাথে আমাদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া এরই মাঝে যখন পুলিশ আমাদের উপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করল আমাদের অনেক সহযোদ্ধাদের নাকে ও চোখে যন্ত্রণা হতে শুরু করল আমি চলে যাই রাস্তার মাঝখানে একটি টায়ার নিয়ে আগুন লাগাতে, ঠিক সেই সময় পুলিশ আমাকে উদ্দেশ্য করে গুলি ছোরা শুরু করে একটি গুলি এসে লাগলো আমার বা পায়ের হাঁটুর নিচে যন্ত্রণায় দৌড়াতে শুরু করলাম গলির ভিতর! টিয়ার গ্যাসের কারণে চোখে মুখে যন্ত্রণা শুরু করলো আর পায়ের ব্যথায় দৌড়াতে লাগলাম এরই মাঝে একজন বৃদ্ধ লোক আমাকে নিয়ে গেলেন তার বাসায় লাইটারের আগুন দিয়ে ঘোরাতে লাগলেন আমার মুখের উপর বাসার সবাই ততক্ষণে আমাকে নিয়ে ব্যস্ত ব্যান্ডেজ এনে লাগিয়ে দিলেন আমার পায়ে। (এই মুহূর্তে আমি কৃতজ্ঞতা জানাই সেই ভদ্রলোকটিকে সেদিন আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন তিনি) তারপর কয়েকদিন নামা হলো না আন্দোলনে এদিকে সারাদেশে ফ্যাসিবাদ সরকার বন্ধ করে দিলেন ইন্টারনেট ব্যবস্থা, কারো সাথে কোন যোগাযোগ করতে পারি নাই।
একুশে জুলাই প্রাথমিক চিকিৎসা শেষ করে আমি আবারো আন্দোলনে নেমে পড়ি এখন আর অলিতে গলিতে নয় সরাসরি চলে যাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে, সারাদিন আন্দোলন করে চলে আসি বাসায় এভাবেই কাটতে থাকে আমার আন্দোলনের দিনগুলি। দিনটি আঠাশে জুলাই আমরা সন্ধ্যার পরে অবস্থান নেই মালিবাগ আবুজর গিফারী কলেজের সামনে ঠিক তখনই কয়েক গাড়ি পুলিশ এসে ধাওয়া দিতে শুরু করে আমাদের সহযোদ্ধাদের কিন্তু আমি অবস্থান ত্যাগ করতে অনড়! দাঁড়িয়ে যাই পুলিশের সামনে, ততক্ষণে কয়েকজন এসে আমাকে উঠিয়ে নিলেন তাদের গাড়িতে নিয়ে গেলেন রমনা থানায়, প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা থানার ভিতরে আমাদের আটকে রাখে, বাহিরে ততক্ষণে বিক্ষোভরত ছাত্র জনতা আমাদের ছাড়ার জন্য আন্দোলন শুরু করে, পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে পড়ে আমাদের ছাড়তে বাধ্য হয় রমনা থানা কর্তৃপক্ষ। তারপরের দিন থেকে আবারো আন্দোলনে নেমে পড়ি আমি অবস্থান নেই শাহবাগ টিএসসি ও শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে, এভাবেই চলতে থাকে আমাদের আন্দোলন। দিনটি ৩ আগস্ট সেদিন আমরা নয় দফা দাবি থেকে চলে আসি এক দফায় অবস্থান নেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ, দুপুর দুইটার সময় ঢাকা ভার্সিটির একজন আপুকে বললাম আপু আমার গায়ে একটা গ্রাফিতি একে দেন, তিনি বললেন কি গ্রাফিতি এঁকে দিবো ভাইয়া? তখন আমি ভাবলাম শহীদ নূর হোসেনের কথা তিনি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নেমেছিলেন যে গ্রাফিতি এঁকে সেটাকে নিজের মধ্যে ধারণ করার জন্য আপুকে বললাম আপু আমার বুকের মধ্যে (স্বৈরাচার নিপাত যাক) এই গ্রাফিতিটি এঁকে দেন, আর পিঠে এঁকে দেন হাসিনা তুই ক্ষুনি আর গালের মধ্যে এক দফা, আমার কথা মত আপু আমাকে এই গ্রাফিতিটি এঁকে দিয়েছেন। খালি গায়ে তখন দাঁড়িয়ে পড়লাম পুলিশের সামনে রিকশার উপর বুক উঁচিয়ে স্লোগান দিতে থাকলাম ১২৩৪ হাসিনা তুই স্বৈরাচার, দড়ি লাগলে দড়ি নিয়ে হাসিনারে ফাঁসি দে।। এ ধরনের স্লোগান দিতে থাকলাম সেদিন পুলিশ আমাদেরকে গ্রেফতার করতে পারলেন না কারণ সেদিন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ পরিণত হয়েছে লাখো ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে! দিনটি চার আগস্ট সেদিন অবস্থান নেই শান্তিনগর ডেইলি রোড এলাকায় স্বাভাবিকভাবেই দফায় দফায় সংঘর্ষ হয় পুলিশ ছাত্রলীগ ও আওয়ামীলীগের কর্মীদের সাথে, সন্ধ্যার পর চলে আসি ভাষায় এসেই শুনলাম ৭ তারিখ নয় ৫ আগস্ট হবে ঢাকা টু লং মার্চ! আর তার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করি আমি পণ করলাম আগামীকাল হয়তো মরবো না হয় দাবি আদায় করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। ফজরের নামাজ পড়ে ই রওনা দিলাম শাহবাগের দিকে হেঁটে ই পৌঁছে যাই শাহবাগে, অবস্থান নেই ছাত্র জনতার ঐতিহাসিক মিছিলে, তখন সাড়ে নয়টা নাগাদ শাহবাগ থানার পাশেই স্লোগান দিতে শুরু করি আমি এরই মাঝে কয়েকজন পুলিশ এসে আটক করলেন আমাকে নিয়ে গেলেন তাদের ছাউনিতে, প্রায় এক ঘণ্টা আমাকে আটকে রাখে তারা এক ঘন্টা পর সেনাবাহিনী আসেন সেখানে এসে আমি সহ যারা তাদের হাতে আটক ছিলাম আমাদেরকে ছাড়িয়ে আনে সেনাবাহিনী! তারপরে আমরা রওনা দিলাম গণভবনের দিকে দুপুর 12 টার সময় আমাদের কাছে খবর আসলো সেনাপ্রধান দুপুর ২ টা বাজে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবে। তখন কিছুটা নিশ্চিত হয়েছিলাম যে, শেখ হাসিনা হয়তো ক্ষমতা ছেড়ে দিবে। কারওয়ান বাজার পর্যন্ত যাওয়ার পর শুনলাম শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে! সাথে সাথে সিজদায় পড়ে গেলাম আমি আদায় করলাম রবের কাছে শুকরিয়া। তারপরেই দৌড়াতে শুরু করলাম গণভবনের দিকে গণভবনে পৌঁছে পরিদর্শন করতে থাকলাম গণভবন তারপর ছুটে আসলাম সংসদ ভবনে এসেই সংসদ ভবনের সামনে সর্বপ্রথম কালিমার পতাকা উত্তোলন করি আমি জিএম রাশেদ এটা আমার জীবনে ঐদিন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল! তারপর নেমে পড়লাম সংসদ ভবনের পুকুরে গোসল ও সাঁতার কেটে উদযাপন করলাম সেই বিজয় মুহূর্ত!এখন আসি অনলাইন এক্টিভিটি নিয়ে আমার অবস্থান, ১৫ই জুলাই থেকে আমি অনলাইনে প্রতিবাদে সোচ্চার হই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন facebook, instagram, X সহ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন গ্রুপে লেখালেখি করি যার কারণে আমাকে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে ছাত্রলীগের কাছে, সরাসরি হত্যার হুমকি থেকে শুরু করে নানান ধরনের লাঞ্ছনার শিকার হয়েছি আমি জিএম রাশেদ, তবে ৫ আগস্ট এর সেই বিজয়ের পরে ভুলে গেছি সেই লাঞ্ছনার কষ্ট।
জি এম রাশেদ
(বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আইকনিক ফিগার! ও কচুয়া উপজেলার প্রতিনিধি)
