ডেস্ক রিপোর্ট:
আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (আনসার-ভিডিপি) সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। এবারের নির্বাচনে প্রায় ৬ লাখ আনসার সদস্য মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন। তারা ভোটকেন্দ্রে প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর হিসেবে কাজ করবে এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করবে।গতকাল বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) আনসার ও ভিডিপির সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাহিনীর মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, “এই নির্বাচনে প্রশিক্ষিত আনসার সদস্যদের ভোটকেন্দ্রে মোতায়েন করা হবে। তারা সদরদপ্তরের সঙ্গে ডিজিটাল সিস্টেমে যুক্ত থাকবে, ফলে নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তা থাকবে। নির্বাচনের দিন আনসার বাহিনী জনগণের নিরাপত্তা ও আস্থার প্রতীক হয়ে কাজ করবে।”ডিজিটাল মনিটরিংয়ে নতুন উদ্যোগডিজি জানান, এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম চালু করা হচ্ছে।
প্রতিটি আনসার সদস্যের এনআইডি নম্বর, কিউআর কোড ও কর্মতথ্য একীভূতভাবে সফটওয়্যারে সংরক্ষণ থাকবে। এর মাধ্যমে সদস্যদের অবস্থান, দায়িত্ব পালন ও আচরণ রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি কার্যক্রমমহাপরিচালক বলেন, “গত বছরের ৬ আগস্ট থেকে আনসার সদস্যদের বিভিন্ন মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে লিডারশিপ ট্রেনিং, অ্যাডভান্স ট্রেনিং ও ইয়ুথ লিডারশিপ ট্রেনিং। এই প্রশিক্ষণ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত চলবে।”তফসিল ঘোষণার পর দুই বা তিন দিনের রিফ্রেশার ট্রেনিং আয়োজন করা হবে, যেখানে শেখানো হবে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, আচরণবিধি, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগের কৌশল।তিনি আরও জানান, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লা ও টাঙ্গাইলসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অধিকসংখ্যক সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে দ্রুত মোতায়েন করা যায়।বাড়তি জনবল ও নতুন কাঠামোনির্বাচনে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সদস্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো মেগাসিটিতে প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়।
গত বছর ১ লাখ ২০ হাজার সদস্যের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে, বর্তমানে চলছে আরও দেড় লাখ সদস্যের প্রশিক্ষণ। নতুন করে ৩ লাখের বেশি ফ্রেশ সদস্য তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। পুরোনো সদস্যদের মধ্য থেকে ফিল্টারিং করে নিরপেক্ষ ও অভিজ্ঞ সদস্যদের দায়িত্বে রাখা হবে।তরুণ ও নারী সদস্যদের অন্তর্ভুক্তিমহাপরিচালক জানান, এবার প্রশিক্ষণে শুধু নিয়ম নয়, মনোভাব পরিবর্তনের অনুশীলন গুরুত্ব পাচ্ছে। যুব ও নারী সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করতে আনসার বাহিনীর বয়সসীমা ১৮ থেকে ২৫ বছর করা হয়েছে, যাতে তরুণ ও কর্মক্ষম সদস্যরা যুক্ত হতে পারে। বর্তমানে বাহিনীতে নারী সদস্যের হার প্রায় ৫০ শতাংশ, এবং নারী-পুরুষ সমানভাবে নেতৃত্বে অংশ নিচ্ছেন। প্রতিটি উপজেলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে একজন পুরুষ ও একজন নারী প্রশিক্ষক রয়েছেন, যা মাঠপর্যায়ে সমতা নিশ্চিত করছে।নতুন সরঞ্জাম ও ইউনিফর্মএবারের নির্বাচনে সশস্ত্র ও নিরস্ত্র উভয় ধরনের আনসার সদস্য দায়িত্বে থাকবেন। তাদের জন্য নতুন ইউনিফর্ম, জ্যাকেট ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছে, যাতে তারা অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারেন। সদর দপ্তর থেকে সরাসরি মনিটরিংয়ের ব্যবস্থাও থাকবে।
ফলে আনসার সদস্যরা ভোটকেন্দ্রের ‘ফ্রন্টলাইন সিকিউরিটি ফোর্স’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।ডিজি আরও বলেন, “বাহিনী এখন আর ব্যক্তিনির্ভর নয়, বরং সিস্টেম নির্ভর। অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় বড় পরিবর্তন এসেছে। কোনো সদস্য আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে দ্রুত তদন্ত ও শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”উন্নয়ন ও সমাজসেবা কার্যক্রমে আনসারতিনি বলেন, “আনসার বাহিনী শুধু নির্বাচনের সময় নয়, সারা বছরজুড়ে উন্নয়ন, দুর্যোগ মোকাবিলা ও সামাজিক সচেতনতামূলক কাজে ভূমিকা রাখছে। এটি এখন একটি উন্নয়নমুখী জাতীয় বাহিনী।”বর্তমানে দেশের আনসার ও ভিডিপি সদস্য সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ, যাদের মধ্যে ৫৯ লাখই স্বেচ্ছাসেবক বা অস্থায়ী সদস্য। তাদের জীবনমান উন্নয়নে বাহিনী হাতে নিয়েছে একাধিক প্রকল্প। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ‘সঞ্জীবন প্রকল্প’, যা আনসার উন্নয়ন ব্যাংক ও ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত।এই প্রকল্পের মাধ্যমে সদস্যরা ক্ষুদ্রঋণ, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ ও আত্মকর্মসংস্থান সহায়তা পাচ্ছেন। পাশাপাশি ড্রাইভিং, ইলেকট্রিক্যাল কাজ, কেয়ারগিভিং, ট্যুরিজম, নার্সিং ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণও যুক্ত করা হয়েছে।
