শিক্ষা নাকি ব্যবসা? নরসিংদীর বেসরকারি স্কুল নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন।

লেখক: জহির আহমেদ
প্রকাশ: ১৪ ঘন্টা আগে

ডেস্ক রিপোর্টঃ

শিক্ষার মানোন্নয়ন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও ভালো ফলাফলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেশে দ্রুত বাড়ছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নরসিংদী জেলা শহরেও গত কয়েক বছরে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি বেসরকারি স্কুল। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটি অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করলেও কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়ে উঠছে অবকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, আর্থিক স্বচ্ছতা ও সরকারি তদারকি নিয়ে প্রশ্ন।স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, কিছু স্কুল নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসের পরিবর্তে ভাড়া করা আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটিতে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগারসহ শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সীমিত বলে অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান বিচার করা যায় না। শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ, খেলাধুলা, ব্যবহারিক শিক্ষা, পাঠাভ্যাস ও সৃজনশীলতা বিকাশের জন্যও প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ ও অবকাঠামো।ফি নিয়ে প্রশ্ন, স্বচ্ছতা কতটা?বেসরকারি স্কুলগুলোর শিক্ষাব্যয় নিয়েও রয়েছে অভিভাবকদের নানা প্রশ্ন। স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবকের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, মাসিক বেতন, পরীক্ষা ও অন্যান্য খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ নেওয়া হলেও সেই অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য তারা পান না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, “আমরা সন্তানের ভালো শিক্ষার জন্য টাকা দিতে প্রস্তুত। কিন্তু স্কুলের আয়-ব্যয় ও শিক্ষার মানোন্নয়নে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা দরকার।”শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় ও পরিচালনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা থাকলে অভিভাবকদের আস্থাও বাড়ে।বিজ্ঞাপনের চাকচিক্য বনাম বাস্তবতাশিক্ষার্থী আকর্ষণে প্রচার-প্রচারণা এখন বেসরকারি শিক্ষা খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যানার, পোস্টার ও বিভিন্ন প্রচারসামগ্রীতে ভালো ফলাফল, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা, ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জনসহ নানা সুবিধার কথা তুলে ধরা হয়।

তবে স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবকের প্রশ্ন, প্রচারে যে সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হয়, বাস্তবে সেগুলোর সবকিছু শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে কি না, তা কীভাবে যাচাই করা হবে?শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক সাজসজ্জা নয়, বরং শিক্ষকতার মান, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের প্রতি যত্ন, পাঠ্যবহির্ভূত কার্যক্রম এবং শিক্ষার ফলাফল দিয়েই একটি স্কুলের প্রকৃত মান নির্ধারণ করা উচিত।শিক্ষক নিয়োগ ও বেতনেও উদ্বেগশিক্ষার মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের বিকল্প নেই। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে কিছু বেসরকারি স্কুলে কম বেতনে শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষক পরিবর্তনের হার বেশি—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।শিক্ষকদের ঘন ঘন পরিবর্তন হলে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি অভিজ্ঞ শিক্ষক ধরে রাখতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মানেও প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।সরকারি নজরদারি কতটা কার্যকর?

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, শিক্ষক, পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কিন্তু স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবি, সব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ও কার্যকর পরিদর্শন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।তাদের মতে, শিক্ষার্থী সংখ্যা কিংবা প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয়তা বিবেচনা না করে প্রতিটি বেসরকারি স্কুলের অবকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার পরিবেশ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়মিত পরিদর্শন করা উচিত।বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান ভাড়া করা ভবনে পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, আলো-বাতাস, স্যানিটেশন, অগ্নিনিরাপত্তা ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা রয়েছে কি না—তা নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।শিক্ষা কি ব্যবসায় পরিণত হচ্ছে?

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ শিক্ষার সুযোগ বাড়িয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান মানসম্মত শিক্ষা দিয়ে অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করেছে। তবে শিক্ষা খাতে অতিরিক্ত বাণিজ্যিক প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।শিক্ষা গবেষকদের মতে, একটি স্কুলের সাফল্য শুধু কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হলো কিংবা কত টাকা আয় হলো—তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষা, নৈতিক বিকাশ, দক্ষতা অর্জন, সৃজনশীলতা এবং নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশই হওয়া উচিত সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড।বাংলাদেশের শিক্ষা খাত নিয়ে কাজ করা এক গবেষকের ভাষায়, “স্কুল সাধারণ কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব তাদের। তাই মুনাফা কখনোই শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হতে পারে না।

”অভিভাবকদের দাবি স্বচ্ছতারঅভিভাবকদের অনেকেই চান, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের যোগ্যতা, অবকাঠামো, ফি কাঠামো এবং সরকারি অনুমোদন ও বিধিবিধান মেনে চলার বিষয়ে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হোক।তাদের মতে, সন্তানের শিক্ষার জন্য তারা যে অর্থ ব্যয় করছেন, তার বিনিময়ে কী ধরনের শিক্ষা ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।নরসিংদীতে বেসরকারি স্কুলের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—এসব প্রতিষ্ঠান কি শিক্ষার মানোন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে, নাকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষার সঙ্গে বাণিজ্যিক স্বার্থও অগ্রাধিকার পাচ্ছে?এর উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন নিয়মিত সরকারি পরিদর্শন, আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ এবং অভিভাবকদের কার্যকর অংশগ্রহণ। কারণ শিক্ষা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম নয়; এটি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্মাণের বিষয়।