যুদ্ধের আড়ালে চীনের নীরব উত্থান: জ্বালানি, স্বর্ণ ও বৈশ্বিক প্রভাবের নতুন সমীকরণ।

লেখক: এমরানুর রেজা
প্রকাশ: ১ সপ্তাহ আগে

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট:

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আবারও বিশ্বের দৃষ্টি কেড়েছে। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের আরেক প্রান্তে চীন নীরবে এমন একটি পদক্ষেপ নিয়েছে, যা অনেক বিশ্লেষকের মতে যুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে— টানা বহু মাস ধরে স্বর্ণের রিজার্ভ বৃদ্ধি।এই দুই ঘটনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ খুব কম। কারণ একদিকে যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু জ্বালানি সরবরাহ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে স্বর্ণ এবং কৌশলগত সম্পদ।

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। পারস্য উপসাগর থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। বিশ্ব জ্বালানি বাজারে যে কোনো অস্থিরতা শুরু হলে প্রথমেই আলোচনায় আসে হরমুজের নিরাপত্তা। কারণ এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেন—”Iran should publicly announce that the Strait of Hormuz is open to everyone.” বাংলায় যার অর্থ—”ইরানের উচিত প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়া যে হরমুজ প্রণালী সব দেশের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।”এই বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। একটি প্রচলিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চায় আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন যেন কোনো একটি দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল না থাকে।

অন্যদিকে ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মূলত উপকূলীয় দেশগুলোর।তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে দাবি প্রচারিত হচ্ছে—কোনো গোপন MOU-এর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে দেওয়া হয়েছে— এ দাবির পক্ষে বর্তমানে কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি বা আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইকৃত প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। বিভিন্ন অনলাইন পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ওমানের পাশ দিয়ে বিকল্প একটি নৌ-করিডোর চালু করেছে এবং কিছু আরব দেশের জাহাজ সেখানে চলাচল শুরু করেছে। তবে এ দাবিরও স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যবস্থায় নতুন করিডোর চালু করা অত্যন্ত জটিল বিষয় এবং তা সাধারণত বহু দেশের সমন্বয় ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।ইরান বহুবার ঘোষণা করেছে, তারা প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার সক্ষমতা রাখে। তবে বাস্তবে পুরো প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ করা অত্যন্ত কঠিন এবং এর ফলে ইরানের নিজস্ব অর্থনীতিও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ফলে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে হরমুজের গুরুত্ব বেশি। যখন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের খবর শিরোনাম হচ্ছে, তখন চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে স্বর্ণ কিনে যাচ্ছে। বিগত বহু মাস ধরে তারা রিজার্ভ বাড়িয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় মাসিক ক্রয়ও করেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে—ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো।সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি হ্রাস।বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৈচিত্র্যময় করা।দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।যুদ্ধের সময় ব্যাংক হিসাব জব্দ হতে পারে, মুদ্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে, কিন্তু স্বর্ণকে একইভাবে নিষিদ্ধ বা অকার্যকর করা কঠিন।আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ জগতে বহুদিন ধরেই একটি ধারণা প্রচলিত—”ধনী মানুষ শুধু স্বর্ণ কেনেন না; তারা স্বর্ণখনির মালিক হন।” এর যুক্তি হলো— একটি স্বর্ণের মুদ্রা কেবল বাজারদরের সঙ্গে মূল্য বাড়ায় বা কমে। কিন্তু একটি লাভজনক খনি প্রতিনিয়ত নতুন স্বর্ণ উৎপাদন করে। অবশ্য এখানেও বড় ঝুঁকি রয়েছে। কারণ খনি ব্যবসা পরিচালনাগত ব্যয়, রাজনৈতিক ঝুঁকি, পরিবেশগত অনুমোদন, উৎপাদন ব্যর্থতা এবং বাজারমূল্যের ওঠানামার ওপর নির্ভরশীল। তাই “খনি সব সময় স্বর্ণের চেয়ে বেশি লাভ দেয়”— এমন ধারণা সর্বজনীন সত্য নয়।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীন বর্তমানে প্রায় ১.৪ টেরাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলেছে, যা তাদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করেছে। পাশাপাশি দেশটি ৯০ থেকে ১১০ দিনের অপরিশোধিত তেলের চাহিদা পূরণের মতো কৌশলগত মজুত গড়ে তোলায় বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রাথমিক ধাক্কা তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে।অন্যদিকে, যখন বিশ্বের অনেক দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, তখন সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে চীন।

সৌরশক্তি, ব্যাটারি প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV) এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জাম উৎপাদন ও রপ্তানিতে দেশটি এখন বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক।এর প্রতিফলনও ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্পষ্ট। দুই হাজার ছাব্বিশ সালের মে মাসে চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে, এপ্রিল মাসে দেশটির সৌর প্যানেল রপ্তানি প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে চীনের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রভাবেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইরান তাদের পারমাণবিক অবকাঠামোর কিছু কার্যক্রম পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে— এমন দাবি এখনো আন্তর্জাতিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করে আসছে এবং বিষয়টি এখনও বৈশ্বিক কূটনীতির অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু।হরমুজ প্রণালী আজ কেবল একটি সামুদ্রিক পথ নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামরিক ভারসাম্য এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সমুদ্রপথে অবাধ চলাচলের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে, অন্যদিকে ইরান এটিকে নিজের কৌশলগত শক্তির অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচনা করছে। এদিকে যুদ্ধের সমান্তরালে চীন স্বর্ণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কৌশলগত শিল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়ে ভিন্ন ধরনের শক্তি নির্মাণ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে নয়; বরং অর্থনীতি, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও নির্ধারিত হবে।হরমুজে উত্তেজনা কত দূর গড়াবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত— এই সংকটের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্ববাজার, জ্বালানির দাম, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য—সবকিছুর ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।