আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতকে অনেকেই খুব সহজ এক সমীকরণে দেখেন। এক পাশে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র, অন্য পাশে ইরান। মিসাইল, ড্রোন, আকাশ হামলা—সংবাদ শিরোনামে যুদ্ধ যেন এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু বাস্তবতা অনেক জটিল। এই যুদ্ধ কেবল দুটি রাষ্ট্রের মুখোমুখি সংঘর্ষ নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। কারণ ইরান এই লড়াই একা লড়ছে না। তার পেছনে রয়েছে আরও দুই শক্তিশালী রাষ্ট্র—রাশিয়া ও চীন।
যুদ্ধক্ষেত্রের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলাগুলো লক্ষ্যভেদে বেশ নিখুঁত— নির্দিষ্ট সামরিক স্থাপনা, গোয়েন্দা কেন্দ্র কিংবা কৌশলগত অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে আঘাত করা হচ্ছে। এমন নির্ভুল হামলার জন্য প্রয়োজন রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য: স্যাটেলাইট নজরদারি, নৌবাহিনীর গতিবিধি, রাডার অবস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডাটা।প্রশ্ন হলো—এই তথ্যের উৎস কোথায়?ইরানের নিজস্ব স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক এত বিস্তৃত নয় যে একা এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ নজরদারি চালাতে পারে। ফলে বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, এর পেছনে রাশিয়ার গোয়েন্দা সহায়তা থাকতে পারে। রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা কাঠামো বিশ্বের অন্যতম উন্নত। আর ইরান-রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতার উদাহরণও নতুন নয়। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ইরান রাশিয়াকে বিপুল সংখ্যক যুদ্ধড্রোন সরবরাহ করেছিল।
এখন মনে হচ্ছে সেই সম্পর্কের প্রবাহ উল্টো দিকেও যাচ্ছে—ইরান দিচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রে চাপ, রাশিয়া দিচ্ছে তথ্য ও কৌশলগত সহায়তা।চীনের ভূমিকা আবার ভিন্ন প্রকৃতির। চীন সাধারণত সরাসরি সংঘাতে নিজেদের জড়ায় না; তারা কাজ করে নীরবে, পেছনের সারিতে। অর্থায়ন, কূটনৈতিক চাপ, প্রযুক্তি স্থানান্তর কিংবা সামরিক সরঞ্জাম— এই সব ক্ষেত্রেই চীনের উপস্থিতি প্রায়শই পর্দার আড়ালে থাকে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান হয়তো উন্নত অ্যান্টি-শিপ মিসাইল কিংবা এমনকি হাইপারসনিক মিসাইল প্রযুক্তির মতো সক্ষমতা অর্জন করেছে—যেগুলো মূলত শক্তিশালী নৌবাহিনীকে হুমকির মুখে ফেলতে তৈরি।
চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চায় না। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে এমন একটি সংঘাত, যা পশ্চিমা প্রভাবকে দুর্বল করে, তা চীনের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিকও নয়।এই বাস্তবতা একটি স্তরভিত্তিক শক্তির কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। নিচের স্তরে রয়েছে আঞ্চলিক গোষ্ঠী ও মিলিশিয়া বাহিনী। তার উপরে ইরান। আর ইরানের পেছনে আড়ালে অবস্থান করছে দুই পরাশক্তি—রাশিয়া ও চীন।সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম স্থিতিশীল আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত দুবাই সাম্প্রতিক হামলার পর কিছুটা ভাবমূর্তির ধাক্কা খেয়েছে। যে বিনিয়োগকারীরা এতদিন উপসাগরীয় অঞ্চলকে প্রায় অটুট নিরাপদ মনে করতেন, তাদের অনেকেই এখন নতুন করে হিসাব কষছেন। পুঁজি ধীরে ধীরে অন্য আর্থিক কেন্দ্রের দিকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে—বিশেষত সিঙ্গাপুরের মতো জায়গায়।একই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির মানচিত্র।
যেসব দেশকে একসময় রাশিয়ার তেল কেনা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছিল, এখন তাদের অনেককেই নীরবে সেই তেল কেনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। যে নিষেধাজ্ঞাগুলো কিছুদিন আগেও কঠোর মনে হচ্ছিল, সেগুলো এখন অনেকটাই নমনীয় হয়ে উঠেছে।এই পরিবর্তনগুলো একটি বড় সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে—বিশ্বের জ্বালানি ও ভূরাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠনের পথে।সবাই যখন মিসাইল আর যুদ্ধের দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে আছে, তখন আরেকটি প্রশ্ন ধীরে ধীরে সামনে আসছে: এই যুদ্ধ শেষ হলে পৃথিবীটা কেমন হবে?সম্ভবত একটি বিষয় নিশ্চিত—এই সংঘাতের পর বিশ্বব্যবস্থা আগের মতো থাকবে না। ভবিষ্যতের ভূরাজনৈতিক বিন্যাস এখনই গড়ে উঠছে। আর সেই গল্প লিখছে শুধু ওয়াশিংটন বা তেল আবিব নয়; বেইজিং ও মস্কোও সমানভাবে তার অংশ হয়ে উঠছে।যুদ্ধক্ষেত্র হয়তো ইরানে। কিন্তু প্রকৃত প্রতিযোগিতা হচ্ছে—আগামী পৃথিবীর রূপ কে নির্ধারণ করবে!?
