পাহাড়, মরুভূমি আর মিসাইল: ইরানের নীরব শক্তির গল্প

লেখক: এমরানুর রেজা
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক সমীকরণও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রতিবেশী Afghanistan অতীতের বিভিন্ন সময়েই ইরানের পাশে অবস্থান করেছে— এমন ধারণা অনেক বিশ্লেষকের মধ্যে প্রচলিত। ইতিহাসের নানা আঞ্চলিক সংঘাতে দুই দেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত সম্পর্ক একটি বাস্তবতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ফলে সম্ভাব্য যেকোনো সংঘাতে এই সমীকরণ নতুন করে আলোচনায় আসে, যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার প্রয়োজন পড়ে না।

অন্যদিকে, ইরানের প্রস্তুতি শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়—জীবনধারণের মৌলিক উপাদান নিয়েও তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। শুষ্ক জলবায়ুর দেশ হওয়ায় বহু আগে থেকেই সেখানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। অনেক পরিবার নিজস্ব ব্যবস্থায় বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে, বড় বড় সংরক্ষণ পাত্রে তা সংরক্ষণ করে রাখে।

পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতেও পানি সংগ্রহের নানা পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে—যেখানে প্রাকৃতিক ঢাল ও প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে পানি সংরক্ষণ করা হয়। এই নীরব প্রস্তুতি প্রমাণ করে, সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় ইরান শুধু যুদ্ধের নয়, টিকে থাকার লড়াইটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখে।

ইরানকে বুঝতে হলে মানচিত্রের দিকে তাকানো যথেষ্ট নয়— তার ভূগোলকে অনুভব করতে হয়। পশ্চিমে Zagros Mountains, উত্তরে Alborz Mountains— এই পাহাড়গুলো নিছক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, বরং ইতিহাসের বহু যুদ্ধের নীরব সাক্ষী, একেকটি প্রাকৃতিক দুর্গ। এই দেয়াল অতিক্রম করলেই বদলে যায় দৃশ্যপট— শুরু হয় Dasht-e Kavir এবং Dasht-e Lut-এর নির্মম বিস্তৃতি বালুময় মরুভূমি। এখানে শত্রু শুধু মানুষ নয়—তাপ, তৃষ্ণা, আর অসীম দূরত্বও একেকটি প্রতিপক্ষ।

দক্ষিণে নামলেই আবার অন্য এক নাটক— Persian Gulf ও Gulf of Oman-এর সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে Strait of Hormuz— মাত্র কয়েক মাইল প্রশস্ত এক জলপথ, অথচ এর ওপর নির্ভর করে বিশ্বের জ্বালানি অর্থনীতি। এখানে উত্তেজনা মানে শুধু আঞ্চলিক সংঘাত নয়— এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির হৃদস্পন্দনে চাপ।

কিন্তু ইরানের শক্তি কেবল ভূগোলের দেয়ালে আটকে নেই— তা ছড়িয়ে আছে আকাশে, মাটিতে, সমুদ্রে। তাদের অস্ত্রভাণ্ডারে রয়েছে Shahab-3 missile, Sejjil missile, Fateh-110 missile— যেগুলো কেবল দূরত্ব মাপে না, কৌশলও নির্ধারণ করে। আর আকাশে ভেসে বেড়ায় Shahed 136 drone ও Mohajer-6 drone— ছোট, তুলনামূলক সস্তা, কিন্তু ভয়ংকর কার্যকর। এখানেই আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য— কয়েক লাখ টাকার একটি ড্রোন থামাতে লাগে কোটি টাকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। যুদ্ধ আর শুধু শক্তির নয়, অর্থনীতিরও খেলা।

সমুদ্রপথেও ইরান গড়ে তুলেছে এক ভিন্ন কৌশল। পারস্য উপসাগরে তাদের দ্রুতগামী ছোট নৌযান, ছড়িয়ে থাকা সমুদ্র মাইন— এগুলো বড় বড় যুদ্ধজাহাজের জন্য অদৃশ্য ফাঁদের মতো। আর এর বাইরেও আছে এক বিস্তৃত ছায়া—Hezbollah, Hamas, Houthis— যারা ইরানের প্রভাবকে সীমান্তের বাইরে বহন করে। ফলে কোনো সংঘাত আর একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না— তা ছড়িয়ে পড়ে বহু ভূখণ্ডে, বহু বাস্তবতায়।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা একটাই— ইরান কি শুধু একটি দেশ, নাকি এটি এমন এক ভূরাজনৈতিক বিন্যাস— যেখানে পাহাড়, মরুভূমি, সমুদ্র আর প্রযুক্তি একসাথে মিলে তৈরি করেছে এক জটিল, দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের গল্প?

ইরান দাবি করছে তারা Sejjil-2 missile ব্যবহার করেছে— যাকে অনেকে “ড্যান্সিং মিসাইল” বলে। শব্দের চেয়ে বহু গুণ বেশি গতিসম্পন্ন এই ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে দিক পরিবর্তন করতে পারে। ফলে এটাকে প্রতিহত করা কঠিন— এটাই যুক্তরাষ্ট্রের বড় মাথাব্যথা।

তবুও, এই উত্তেজনার মাঝেও আছে এক ভিন্ন ছবি।
Kish Island—পারস্য উপসাগরের বুকে এক শান্ত দ্বীপ। একসময় নির্জন ছিল, আজ হয়ে উঠেছে আধুনিক শহর, পর্যটনের কেন্দ্র। যুদ্ধের কেন্দ্র নয়—বরং অর্থনৈতিক ও নীরব এক জগৎ। তবুও, বলা হয়—এই দ্বীপও প্রস্তুত, এক অদৃশ্য সামরিক কৌশলের অংশ হিসেবে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় গল্পটা হয়তো অস্ত্রের নয়—খাবারের।
উপসাগরীয় দেশগুলো— Qatar, Kuwait, Bahrain, United Arab Emirates, Saudi Arabia— তাদের খাদ্যের প্রায় ৯০% আমদানিনির্ভর। আর সেই খাদ্যের ৭০% আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। যদি এই পথ বন্ধ হয়ে যায়— থেমে যাবে শুধু জাহাজ নয়, থেমে যাবে কোটি মানুষের খাবারের প্রবাহ।

শুধু খাদ্য নয়— বিশ্বের প্রায় ৩০% নাইট্রোজেন সারও এই পথ দিয়ে যায়। Qatar একাই সরবরাহ করে বিশাল অংশ ইউরিয়া। চেইন রিঅ্যাকশনটা ভয়ংকর—হরমুজ বন্ধ → খাদ্য আমদানি বন্ধ → সার রপ্তানি বন্ধ → ফসল কমে যায় → খাদ্যের দাম বাড়ে → ক্ষুধা ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাস বলছে— Arab Spring শুরু হয়েছিল রাজনীতি দিয়ে নয়, রুটির দামের আগুন দিয়ে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে ব্যবহৃত Uranium hexafluoride (UF₆) একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পদার্থ। এটি সাধারণ বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস করা ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এতে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে, যা মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই কারণেই সরাসরি সামরিক হামলার পরিবর্তে কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক নজরদারিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ইরানকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়— এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।উপসাগরের আকাশে যে ধোঁয়া ভাসছে, তা শুধু যুদ্ধের নয়— এটি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা— ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার নতুন সাপলুডুচাল।