৭ মার্চের ভাষণ: ঘটনার আড়ালে নানা ঘটনা।

লেখক: খাইরুল ইসলাম
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

বিশেষ প্রতিবেদন:

বাঙালি জাতির জীবনে ১৯৭১ সালের মার্চ মাস ছিল উত্তাল মাস। ঢাকায় যখন মার্চে প্রতিবাদ দিবস পালন করা হচ্ছে, তখন ৭ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (রেসকোর্স ময়দান) শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন বলে সকলে অনুমান করেছিলেন। তবে ২, ৩, ৪ মার্চের ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় শেখ মুজিবুর রহমান ভোর ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল জারি রেখে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে ৫ ও ৬ তারিখ চিন্তা করার সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। ৬ মার্চ রাতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ফোনে কথা বলেন এবং কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দেন।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও চাপ।

৬ মার্চ রাতে শেখ মুজিবুর রহমানের দুই প্রতিনিধি গোপনে একজন পাকিস্তানি জিওসির বাসভবনে যান। সেখানে মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা জানান যে, আওয়ামী লীগের তরুণ চরমপন্থী নেতারা শেখ মুজিবুর রহমানকে ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার জন্য নানাভাবে হুমকি দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে তা প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব ছিল না। তিনি নিজেকে দলের ভেতরের চরমপন্থীদের চাপ থেকে বাঁচাতে সামরিক বাহিনীর হেফাজতে থাকার অনুরোধ করেছিলেন।

মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা জানান, শেখ মুজিব কীভাবে চাপের মুখে পরিস্থিতি সামলাতে হয় তা ভালোভাবেই জানেন। খাদিম হোসেন আরও বলেন, “তাকে জানিয়ে দিয়েন তাকে রক্ষা করার জন্য আমি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কাছেই থাকব। পাকিস্তানের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে কিছু বললে বা স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে ঢাকাকে আমি মাটির সাথে মিশিয়ে দেব।” জবাবে শেখ মুজিব বলেন, তিনি একজন দেশপ্রেমিক এবং পাকিস্তানকে ভেঙে ফেলার কোনো দায় নিতে চান না।
এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার জেনারেল পীরজাদা গভর্নর আহসানকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী শেখ মুজিবকে গভর্নর হাউজে ডেকে নিয়ে জানানো হয় যে, প্রেসিডেন্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য অধিবেশন স্থগিত করেছেন। শেখ মুজিব তখন বলেছিলেন, নতুন তারিখ না দিলে তিনি এটি ইস্যু করবেন না। তিনি আরও জানিয়েছিলেন, যদি নতুন তারিখ মার্চের মধ্যে হয় তবে তিনি পরিস্থিতি সামলাতে পারবেন, কিন্তু এপ্রিল বা অনির্দিষ্টকাল হলে তা তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে।

৭ মার্চের প্রস্তুতি:
৭ মার্চের কর্মপরিকল্পনা ও ভাষণ কেমন হবে তা নিয়ে আওয়ামী লীগের হাই কমান্ড ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাসভবনে বৈঠক করেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটি ৩৬ ঘণ্টা বৈঠক করেও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারায় ড. কামাল হোসেন ইংরেজিতে একটি বক্তব্য লিখে দেন। বলা হয়, শেখ মুজিব ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা ছিল সেই বক্তব্যেরই বাংলা অনুবাদ।
ভাষণের আগের দিনগুলোতে নানা চাপ ছিল:

  • প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবকে ফোনে বলেছিলেন এমন কোনো পদক্ষেপ না নিতে, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
  • যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড শেখ মুজিবকে জানিয়েছিলেন যে, তিনি যেন তার বিচ্ছিন্নতাবাদী খেলায় ওয়াশিংটনের দিকে তাকিয়ে না থাকেন।
  • আওয়ামী লীগের কিছু চরমপন্থী ছাত্রনেতা ভাষণ দেওয়ার আগে শেখ মুজিবকে তার বাসায় ঘিরে ফেলেছিলেন।
  • ৭ মার্চের ভাষণ:
    অবশেষে অনেক দেরিতে শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পৌঁছান। স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে ১৯ (মতান্তরে ১৮) মিনিটের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ শুরু হয়। ১,১০৮ শব্দের সেই ভাষণে চারদিকের দাবির প্রতিফলন ও দিকনির্দেশনা ছিল। শেখ মুজিব সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা না দিয়ে কৌশলী ভাষণ দেন, যা একইসাথে স্বাথীনতাকামী ও তাকে চাপ দেওয়া পক্ষগুলো—উভয়কেই শান্ত রাখে। ৭ মার্চ বিকেলেই ঢাকার রাস্তায় ছাত্র-জনতা রাইফেল নিয়ে মিছিল শুরু করে দেয়।