“সত্যই তো আর পুতুল নয় মানুষ। অদৃশ্য শক্তি বা অন্য অন্য মানুষের আঙ্গুলে বাঁধা সুতোর টানে সত্যই তো মানুষ পুতুলের মত নাচে না।”
বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতার সমগ্রতাকে ধারণ করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮–১৯৫৬) মানুষের মনের অতলান্তের নিত্য দোলাচলের রূপায়ণ ঘটিয়েছেন ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ (১৯৩৬) উপন্যাসে।উপন্যাসে শশী-কুসুম-যাদব-কুমুদ প্রমুখ চরিত্রের মধ্য দিয়ে মানুষের মনোরহস্য, রহস্যপ্রবৃত্তির ও প্রকৃতির অন্তর বহিররহস্যের প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত জীবনকথা ও নিরপেক্ষ নিরীক্ষা করেছেন।
শশী এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। গল্পের নায়ক শশী পেশায় একজন ডাক্তার। কলকাতা থেকে পাশ করা একজন প্রগতিশীল ডাক্তার। ঈশ্বর, গ্রাম্য সংস্কার এসবের ওপর তার বিশ্বাস নেই। সমস্ত উপন্যাসেই তার সাথে বিভিন্ন দ্বন্দ্ব দেখা যায়। নিজের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে গ্রাম্য কুসংস্কারের দ্বন্দ্ব, পিতা-পুত্রের জেনারেশন গ্যাপের দ্বন্দ্ব। সনাতন আর আধুনিক মূল্যবোধের দ্বন্দ্ব, পুঁজিবাদের সাথে অপুঁজিবাদের দ্বন্দ্ব, এমনকি শেষের দিকে শশীর এক সত্তার সাথে আরেক সত্তার দ্বন্দ্বও ছিল প্রবল! এক হিশেবে এই উপন্যাসের কাহিনি শশী ডাক্তারেরই কাহিনি। তবে তার অস্তিত্ব নিহিত হয়ে আছে আরো বিভিন্ন চরিত্র ঘটনা উপঘটনার সাতকাহনে। এই শশীকেই হারু ঘোষের বজ্রাহত মরদেহ আবিষ্কার করে গ্রামে নিয়ে আসতে হয়েছে। পরানের বৌ কুসুমের প্রতি আকর্ষণ-বিকর্ষণের দ্বন্দ্বে দোদুল্যমান থাকতে হয়েছে, যাদব পণ্ডিতের ‘স্বেচ্ছামৃত্যু’ নামক প্রহসনের নির্বাক সাক্ষী হতে হয়েছে, মাতৃসমা সেনদিদির প্রতি এক রহস্যময় সম্পর্কের বেড়াজালে আবদ্ধ হতে হয়েছে। আবার, এই শশীকেই সবিস্ময়ে দেখতে হয়েছে কুমুদ-মতির প্রবল জীবনাগ্রহ এবং নিয়তি নামক অলীক সত্তার সুতো ছিঁড়ে জীবন-উপভোগের মহাযজ্ঞে বেরিয়ে পড়ার দৃশ্য। এমন সব ঘটনায় দশ বছরের কালপরিসরে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন চরিত্রের নিয়তির প্রতি আত্মসমর্পণ ও বিদ্রোহের ইতিকথা।
তাই শশী ও তার পরিপার্শ্বের মানুষ ও ঘটনা থেকে মনে সহসাই প্রশ্ন জাগে- কে বা কারা পুতুল? আর কে-ই বা ওই পুতুলের সুতো ধরে টানছে? আর কারাই বা এই পুতুলনাচ না নেচে নিজেদের মানুষ করে তুলছে? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মীমাংসিতভাবেই বিজ্ঞানমনস্ক অর্থাৎ কার্যকারণ চেতনাচালিত জীবনে বিশ্বাসী। তাঁর জীবনপাঠ থেকে অন্তত তাই অনুমেয়।
মানিক বন্দোপাধ্যায় সর্বদাই তার রচনায় মানুষের বিশেষ করে নারীদের মনোজাগতিক চিন্তাকে উন্মোচিত করেছেন।এই ক্ষেত্রে কুসুমও তার ব্যতিক্রম নয়।পৃথিবীর জৈবিক দৈহিক অভিঘাত কুসুমের অন্তর্দেশে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে তার বাস্তব রূপায়নই কুসুমের অস্তিত্বকে এক কম্পলেক্স প্রোজেকশনে রূপ দিয়েছে।
এই উপন্যাসের প্রধান নারী চরিত্র পরাণের স্ত্রী তেইশ বছরের মেয়ে ‘কুসুম’।প্রকৃতপক্ষে কুসুম এক অস্থির, বেপরোয়া,ও দূর্বোধ্য গ্রাম্য রমণী।পুতুল নাচের ইতিকথা উপন্যাসে লেখক কুসুমের মৃতপ্রায় অস্তিত্বের এক ভিন্ন রূপ উন্মোচন করে নারী সম্পর্কে আমাদের আবহমান ধারনাকে ভেঙ্গে দিয়ে এক নতুন ধারনার জন্ম দেন।এই উপন্যাসে কুসুম শুধু একজন নারীই নয়,অসম্ভব প্রানবিহ্বল, মনোদৈহিক কামনা বাসনার অন্তর্দহনে জ্বলমান এক বিমূর্ত রূপ।যার কাছে দেহ ও মনের দাবী সমানভাবে মূল্যবান। কুসুম তার মনোদৈহিক আকাঙ্ক্ষার পরিপূর্নতার জন্য সমাজের প্রচলিত সংস্কারকে ভেঙ্গে দিতেও ছিলো দ্বিধাহীন। আর তাইতো গাওদিয়া গ্রামের একঘেয়ে জীবনে অভ্যস্ত কুসুমের অন্তঃপুর নতুনভাবে জেগে উঠে গ্রামের সুদখোর মহাজন গোপালের কলকাতা ফেরত ডাক্তার ছেলে শশীর আবির্ভাবে।মনের গভীর কোনে কুসুম শশীর জন্য লালন করে গভীর প্রণয়। কুসুম তাই সামাজিক নিয়তি আর নারীর সহজাত ভীরু অস্তিত্বের দ্বিধাকে অস্বীকার করে অকপটে প্রকাশ করে তার ভালোবাসার কথা। প্রবল প্রেমাবেগে কুসুম শশীকে বলে ‘ এমনি চাঁদনি রাতে আপনার সঙ্গে কোথাও চলে যেতে সাধ হয় ছোটবাবু’।
কিন্তু শশীর নিস্পৃহতা,তার নিরবলম্ব ব্যাক্তিত্বের নিষ্ক্রিয়তা কুসুমকে আশাহত করে। শশী বলে–
“শরীর! শরীর! তোমার মন নাই, কুসুম?”
কিন্তু কুসুমের দিক থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ইঙ্গিত পাওয়া সত্ত্বেও শশীর অনগ্রসরতা তাদের সম্পর্ককে এক বিয়োগাত্মক পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। সব ছেড়েছুড়ে নিজের জৈবিক ট্র্যাজেডিকে ভুলে কুসুম যখন স্বামীর সাথে গাওদিয়া ছেড়ে চলে যেতে চায়। তখনই একা আর পরাজিত শশী সম্পর্কের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে তার প্রেমের মহার্ঘ্য নিবেদন করে কুসুমের কাছে। শশীর আহ্বানে আর সাড়া দেয় না কুসুম। বরং কুসুম তখন ব্যক্তিগত ব্যক্তিত্বের সচেতন প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে—
“লাল টকটকে করে তাতানো লোহা ফেলে রাখলে তাও আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হয়ে যায়, যায় না?”
তাতানো লোহার মত কুসুম তখন একেবারেই ঠাণ্ডা। দ্বিধাহীন প্রশ্নবাণ ছুড়ে দেয় প্রথাগত শশীর মননে—
“চিরদিন কি একরকম যায়??মানুষ কি লোহার গড়া যে সে চিরদিন একরকম থাকবে,বদলাবে না?বলতে বসেছি যখন তখন কড়া করেই বলি, আজ হাত ধরে টানলেও আমি যাবোনা।আপনি কি ভেবেছিলেন আপনার সুবিধামতো সময়ে আমাকে ডাকবেন আর আমি চলে আসবো?”
আবারো কুসুমের প্রশ্ন—
“কুসুম কি বেঁচে আছে? সে মরে গেছে।”
শশী তার হৃদয় সংবেদনের জয় ঘটাতে পারেনি। শশী যে কেবল শশীই নয়, সে শশীডাক্তার। আবার, মার্কসীয় সামন্তসমাজ দৃশ্যমান না হলেও শশীর সমাজ সামন্তসমাজ। তার বাবা গোপাল দাস নানা দোষে দুষ্ট এক সামন্ত ব্যক্তি। তাই শশীর এ পরাজয়ের অদৃশ্য কোনো শক্তির কাছে পরাজয় বলা যায় না। বলা যায়- সমাজ ও সংস্কারে শৃঙ্খলের সুতোয় বন্দি সে। অন্যদিকে, ঔপনিবেশিকতা এ উপন্যাসে প্রচ্ছন্ন হলেও শশীর এই পুতুল সত্তায় তা নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে।
“শশী তিরিশের উপনিবেশের মধ্যবিত্ত জীবনের নিহত উচ্চাকাঙ্ক্ষায় প্রতিভূ। শশীর জীবনে এবং মনে গাওদিয়ার জটিল প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমেই তাই গাওদিয়া রূপময় হয়ে ওঠে।”
শশী-কুসুমের প্রেম বাঙালি সমাজের সনাতনী দৃশ্য। বর্তমানে নাগরিক, যান্ত্রিক এবং প্রযুক্তিক বিকাশে সেই প্রেমের দৃশ্যও আধুনিক থেকে আধুনিকতর হচ্ছে। প্রেমের পথ সহজ হচ্ছে
কিন্তু মুক্তি ঠিক আসছে না। মুক্তির বিশুদ্ধ আদর্শিকচর্চা হচ্ছে না বলেই হয়তো!
শশী-কুসুম সম্পর্কটি মানবিকতার দিক থেকে যতোই সমর্থনযোগ্য হোক না কেন, তৎকালীন গ্রামীণ সমাজবাস্তবতায় তার বাস্তব রূপদান সত্যিই দূরূহ। এখানে শশীর টানাপোড়েন নিয়তির সঙ্গে বাস্তবতার নয় বরং বাস্তবতার সঙ্গে বাস্তবতার টানাপোড়েন। একদিকে মনের অবচেতন জগতের আহ্বান, অন্যদিকে ওই মনেই শেকড়-গেড়ে-বসা সমাজসত্য। তবে সেই সমাজসত্য কিংবা শেকড় তাকে কেবল দোদুল্যমান করেছে; আদর্শিক করে তুলতে পারেনি।
শশীর মনন দ্বিমুখী। সে কী চায়, সে নিজেও জানে না। সে কখনো চায় নিজের গাঁয়ের ভালোবাসায় আমৃত্যু বেঁচে থাকতে। আবার কখনো ভাবে, কী হবে এই অজ পাড়াগাঁয়ে পড়ে থেকে? তখন তার কল্পনার দৃষ্টি তাকে নিয়ে যায় অনেক দূরে, অন্য কোনো উন্নত দুনিয়ায়। শহরের চাকচিক্যময় জীবনের স্বপ্নও দেখে সে। ফ্রয়েডে অনুরক্ত মানিক শশীকে দেখিয়েছেন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে ভোগা এক তরুণ, যে কিনা প্রতিনিয়ত তার মনের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। ইগো, সুপার-ইগোর এই দ্বন্দ্বে পড়ে দিশাহারা অবস্থা হলেও শশীর মূল কিন্তু এই গাঁয়েই বাঁধা! সে মূল উৎপাটন করবে কে? বরঞ্চ কুসুম, মতির মতো চরিত্ররা সেই মূল আরও গভীরে প্রোথিত করে। এদের কাউকে আশ্রয় করে সে বাঁচতে চায়। কাকে? হয়তো কুসুমকে! হয়তো মতিকে!
শশীর চরিত্রে আসলে মানিকের নিজের চরিত্রের বেশ মিল পাওয়া যায়। উপন্যাসে কিছু দ্বন্দ্বের সমাধান লেখক সহজ জয়-পরাজয় দিয়ে সমাধান করলেও অধিকাংশের সমাধান নিজে করে দিয়ে যাননি। বইয়ের অন্য ঘটনাটি পুঁজিবাদে অনাসক্ত উড়নচণ্ডী হিপ্পি শহুরে কুমুদ আর গ্রামের সরলা বালিকা মতির। সে গল্পের মধ্যেও হাজারটা দ্বন্দ্ব আর সমাধান। ভালোবাসার ঘটনাগুলোও তাই, মানিক ফ্রয়েডীয় মতবাদ আর ভালবাসায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাই এই গল্পের ভালবাসাগুলোও সামাজিক নিয়মকানুন মানেনা। বন্ধুর পত্নী কুসুম আর শশীর ভালবাসা, কুমুদ আর মতির ভালবাসা সবগুলোই গতানুগতিক নিয়ম মানেনা।
কুমুদ ভারি চমৎকার লোক। ব্যক্তিত্বে, সম্মানবোধে আর চাল-চলনে সে ব্যতিক্রম_ আর দশজনের চেয়ে আলাদা করে তাকে চোখে পড়ে সবার। বাড়ি থেকে, চাকরি থেকে বিতাড়িত কুমুদ। জীবন থেকে পিছিয়ে-পড়া কুমুদ। দেমাগ থেকে ছিটকেপড়া কুমুদ শেষে জায়গা করে নেয় যাত্রাদলে। তার ছাত্রজীবনের বন্ধু শশী তাদের গ্রামে আসা যাত্রাদলে কুমুদকে পেয়ে অবাক হয়। শশীর বাড়িতে কুমুদ আতিথ্য গ্রহণ করলে সে খুশী হয়। কুমুদ মতির দেখা হয়। কথা হয়। মুগ্ধতা তৈরি হয়। মতির মনে কুমুদ এজগতের রক্তমাংসের মানুষ নয়, রূপকথার রাজপুত্র, মহাতেজা, মহাবীর্যবান, মহা-মহা প্রেমিক। কুমুদ মাটি-পৃথিবীর কেউ নয়। পৃথিবীর সেরা লোক শশী, কুমুদ শশীর মতোও নয়।
অহঙ্কারী কুমুদ, উদ্ধত কুমুদ, যাযাবর কুমুদ শেষ পর্যন্ত সংসারী হতে চায়। বিয়ে করতে চায় মতিকে। শশী আপত্তি করলে কুমুদ বিয়ের পরে মতিকে মনের মতো গড়ে তোলার প্রত্যয় নেয়। কিন্তু শশী প্রবল সন্দেহে সচেতন চিরায়তপ্রশ্নটি নিজের মনে জাবর কাটে—
“মনের মতো গড়িয়া তুলিতে গেলে মানুষ যে মনের মত হয় না, এটুকু জ্ঞান কি কুমুদের নাই?”
নিয়তির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে মানুষ হয়ে ওঠার গল্প কুমুদ-মতির গল্প। যাত্রাদলের প্রবীর তথা মোনালিসার কুমুদ, শেলি বায়রন হুইটম্যানের কুমুদ, পেগ খাওয়া কুমুদ, নীলাম্বরীর প্রেমিক কুমুদ তখন অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসী।
“খনি থেকে তোলা হীরের মতো ওকে আমি গ্রহণ করেছি— নিজে কাটব, ঘষব, মাজব, উজ্জ্বল করে তুলব। ওর মনের কোনো গড়ন নেই, তাই ওকে বিয়ে করতে আমার এত আগ্রহ। ওর মনকে আমি গড়ে নেব। আমার সঙ্গিনী হতে পারে, এমন মেয়ে জগতে নেই ভাই —সঙ্গিনী আমার সৃষ্টি করে নিতে হবে আমাকেই।”
উদাসীন, ভবঘুরে মতির নিশ্চিত পরাজিত ভবিষ্যৎ সত্যের ইঙ্গিত দিতে গিয়ে তপস্বীরূপী শশী বলেন—
“ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিবার প্রতিভা আছে কুমুদের— স্বপ্নকে সফল করিবার তপস্যা নাই। মতির মুখের পেলব ত্বকে দুদিনে সে দুঃখের রেখা আনিয়া দিবে।”
জীবনের হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে তার, মতির প্রেমে পড়ে। আর পাঠক যেন পেয়ে যান অন্য কুমুদকে। নমিত, প্রেম-ভাবাবেশ-আবিলতাপূর্ণ কুমুদকে। বিস্ময় মানে পাঠক। বিস্ময় মানে তার পরিচিতজনরাও। কুমুদের বন্ধু জয়ার ভাষ্য—
“তুই অবাক করেছিস মতি। রূপ-গুণ, বিদ্যা-বুদ্ধি, নাচ-গান দিয়ে কেউ যাকে বাঁধতে পারেনি, তাকে তুই কাবু করলি, এক ফোটা মেয়ে? কম তো নোস তুই।”
কুমুদ, মতিকেই কেবল জয় করেনি। বরং শশীর বন্দিত্বকেও প্রকটিত করে তুলেছে। ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও কুমুদ যা পারে, শশীর পক্ষে তা সম্পন্ন করা অসম্ভব। শশীর অসহায়ত্ব কেবল অন্তর্চাপে সৃষ্ট নয়, বহির্চাপেও শশী পিষ্ট। তাই এই অসহায়ত্বকে সে কোনোভাবেই যুক্তি-বুদ্ধির তলোয়ার দিয়ে শিরচ্ছেদ করতে পারে না।
কুমুদ-মতির গল্প একদিকে তৎকালীন উপনিবেশ-শাসিত সমাজে শহর ও গ্রামের বিস্তর পার্থক্যকে দৃশ্যমান করেছে, তার চেয়েও বেশি শশীর মন ও বহির্জাগতিক বন্ধনকেও নির্দেশ করেছে। যাত্রাদলের প্রবীর সেজে এক গ্রাম্য-অশিক্ষিত-অসংস্কৃত নারী মতির হৃদয় জয়, মতির সঙ্গে কুমুদের বিয়ে, অতঃপর কলকাতার শাহরিক জীবনের সঙ্গে মতির পরিচয় ও যাযাবর জীবন যাপনের যাত্রী, শেষে নিরুদ্দেশ পথ পাড়ি দেবার দৃশ্যপটগুলোতে যেন কেবলই কথিত নিয়তির বিপক্ষে মানুষের তীব্র হুঁশিয়ার অনুরণিত হয়েছে। তবে ঔপন্যাসিক এই উপকাহিনিকে প্রক্ষিপ্ত বললেও এটি উপন্যাসের অন্তর বয়ানে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবের দাবিদার।
খুব ছোটো পরিসরে হলেও নন্দ-বিন্দুর গল্পটিকেও পুতুল হওয়া না হওয়ার সমীকরণে যাচাই করা যায়। শশীভগিনী বিন্দুর পরিণতিকে নিয়তির খেলা বলে মনে হলেও তা যথেষ্ট কার্যকারণ সূত্রে বিচারযোগ্য। কারণ- বাবা গোপালের শঠতা, প্রতারণা আর গোয়ার্তুমির ফলেই বিন্দুকে নন্দের রক্ষিতা হতে হয়। তাই তো শশী তাকে স্বাভাবিক পরিবেশে মুক্তির জন্য ফিরিয়ে আনে। ধীরে ধীরে বিন্দুর মনকে সুস্থ করে তুলবে। গ্রামের শান্ত পরিবেশে ওর মনে শান্তি আসবে। তার স্নেহ যত্ন সাহচর্যে স্বামীহীনা নারীর যত রস ও আনন্দ জীবনে থাকা সম্ভব ক্রমে ক্রমে সব আসবে। বই পড়িতে এবং ভাবিতে শিখিয়ে একটি অপূর্ব অন্তর্লোক ওর জন্য সে সৃষ্টি করে দিবে। তা যে কতদূর অসম্ভব তা বুঝতে শশীর বাকী থাকে না।
‘বই পড়া’র অভ্যাস অবশ্যই মুক্তির জন্য যুক্তিক। শশীর এই সিদ্ধান্তটি দায়িত্বশীল, চমৎকার এবং আদর্শিক ছিল। কিন্তু বিন্দুর যে সেরকম নেশাটাই নেই। দিন রাত সমাজের কিছু কমন শব্দ– ‘পরের ঘরে হেঁসেল ঠেলবে তার আবার লেকাপড়া’ যখন নারীকে জব্দই করে তখন বইপড়া শব্দটা নেশা ধরাতে পারে না। তাই তো ‘ত্যাজ’ কবিতার সাজলির মতো খাড়া পাহাড়ে উঠার বহুত দম আর ত্যাজটুকু সবার থাকে না। সন্তান উত্তম হোক সেটা সবাই চায়। কিন্তু উত্তম হবার অভ্যাস যে ঘর থেকে শুরু করতে হয় কেবল সে চর্চাটুকুই এখনও খুব করে শুরু হয়নি। বিন্দু আমাদের সমাজের সেই ত্যাজহীন,হীনমন্য খুব চেনা হাজারও নারীর প্রতিচ্ছবি—
“মনের মধ্যে দিন-রাত হুহু করিয়া জ্বলে? কার জন্য জ্বলে, কেন? জীবনটা ব্যর্থ হইয়া গেল বলিয়া মানুষ কি শোকে এমন নির্জীব মৃতপ্রায় হইয়া যায়? নন্দর প্রতি তীব্র বিদ্বেষই তো বিন্দুকে দুদিন সুস্থ ও সবল করিয়া তোলার পক্ষে যথেষ্ট। বিদ্বেষ যদি নাও হয়, আঁকাশ ছোঁয়া অভিমান বিন্দুকে নব জীবন দিতেছে না কেন? নন্দ ক্ষমা করিবে এই আশায় এতগুলি বছর বিন্দু যে আশায় কাটাইয়া আসিয়াছে তাহাতে যদি আজ নন্দর জন্যই বিন্দুর মন হাহাকার করে শশী তাহাতে বিস্মিত হবেই না। সংসারে এ রকম অদ্ভুত মেয়ে দু চারটে থাকে। কিন্তু নন্দর জন্য মন কেমন করিলে বিন্দুর তো উচিত অস্থির চঞ্চল হইয়া থাকা, কাজ ও অকাজের ভানে ছটফট করা। এমন সে অলস ও অবসন্ন হইয়া আসিবে কেন— তৈলহীন প্রদীপের মতো কেন সে নিভিয়া যাইতে থাকিবে?”
শশীর আলমারি থেকে বইয়ের বদলে সে যখন বিষ তুলে নেয় তখন শশী বাস্তবসত্যকে উপলব্ধি করে শিরায় শিরায়–
“কিন্তু কি হবে বাঁচিয়ে?বিন্দু ছেলেমানুষ নয়, জীবন সম্বন্ধে দুষ্প্রাপ্য অভিজ্ঞতা তার, ভেবে চিন্তে দুঃখের হাত এড়াবার চরম পন্থাই সে যদি অবলম্বন করা ঠিক করে থাকে,বাঁধা দেয়া কি উচিত হবে?… শশী ভাবে, কেন সে এমন অক্ষম, এত অসহায়? শান্তি দিবে বলে যাকে সে কুড়িয়ে এনেছিল, রাতদুপুরে তাকে মদ পরিবেশন করতে হয় কেন?”
অভ্যস্ততা নামক ব্যাধিতে বিন্দু ততোদিনে সচেতন, অচেতন এবং অবচেতন মনে আক্রান্ত হয়ে গেছে। ঔপনিবেশিক সামন্ত শাসকের আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া গেল নন্দের মধ্যে এবং বিন্দুর ট্র্যাজেডিতে।
” লাভ হল বৈকি দাদা! চলে না এলে কি করে বুঝতাম ওখানে ওমনিভাবে থাকা ছাড়া আমার গতি নেই? এবার আর কিছু না হোক, মুক্তির কল্পনা করে অযথা ব্যাকুল হব না। হয়তো এবার মনও বসবে। হয়তো এবার খুব সুখেই থাকব।”
তাই, বিন্দুর পরিণতি অলৌকিক বা নিয়তি নির্ভর নয়, লৌকিক। বিন্দু যদি পুতুল হয়েও থাকে তবে তা একান্তই মনুষ্যনির্মিত নোংরা বিধানের অভিশাপে।
যাদব পণ্ডিত ও পাগলদিদির ‘ইচ্ছামৃত্যু’ যেন আরেক রহস্যের জালে আমাদের আবদ্ধ করে আবার সেই রহস্য এক ভিন্ন সত্যের ইঙ্গিত দেয়। আপাত অর্থে যাদবকে আধ্যাত্মিক, সূর্যবিজ্ঞান, জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাসী মনে হলেও আদতে সে প্রবলভাবে জীবনবাদী, জীবনপিপাসু ও ঐহিক।
উপন্যাসের কাহিনিতে তার আগমন ঘটে সাপের ভয়ে লাঠি ঠুকে ঠুকে—
“লাঠি ঠুকিয়া ঠুকিয়া পথ চলেন। শশী জানে- এত জোরে লাঠির শব্দ করা সাপের জন্য। মরিতে যাদব কি ভয় পান- জীবন-মৃত্যু যাঁর কাছে সমান হইয়া গিয়াছে?”
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই যাদবই তার এক চকিত মন্তব্যের বাস্তবায়ন করে মৃত্যুউৎসবের মধ্য দিয়ে। বলা যায়, নিজের ভাগ্যকে সে নিজেই গড়লো। ‘ইচ্ছামৃত্যু’ নামক এক প্রহসন মঞ্চস্থ করলো এবং তার একমাত্র দর্শক বা সাক্ষী শশী, নিয়তি বা অদৃশ্য কোনো শক্তি নয়। এক হিশেবে যাদব যেন শশী নামক পুতুলের প্রতি ব্যঙ্গ হাসি হাসলো। অথচ ‘ইচ্ছামৃত্যু’ মূল রহস্য জেনেও শশী এক নির্বিকার দর্শকমাত্র। শশী যদি সেই সত্যকে একবার প্রকাশ করতে পারতো, তবে কিছু সময়ের জন্য হলেও সে মানুষ হয়ে উঠতে পারতো। মূলত, যাদবের মৃত্যু এ উপন্যাসের নিছক উপকাহিনি নয়, বরং শশী চরিত্র ব্যাখ্যায় এক অপরিহার্য সহভাগী।
তারপর কী হয় শশীর? কুসুমও নেই, মতিও নেই– তারাই তো এতদিন তার আত্মাকে এ গ্রামে বেঁধে রেখেছিল। নিজের বাপ গোপালকে কখনো মন থেকে ভালোবাসতে পারেনি শশী। মতি আর কুসুমের প্রস্থানে এই গাওদিয়ায় তার জন্য আর কেউ রইলো না। তবে কি শশী নিজের স্বপ্নের দুনিয়ায় চলে যাবে? যেখানে কোনো পিছুটান নেই, নেই মায়ার ভ্রান্তি। কিন্তু মৃত্যুর আগে যাদব যে তাকে নতুন দায়িত্ব দিয়ে যায়। গাঁয়ে হাসপাতাল বানানোর কাজ, সেই হাসপাতালের ভার গ্রহণের কাজ। চিরকাল গ্রামের বদ্ধ জীবন থেকে ছুটে পালিয়ে যেতে চাওয়া শশীকে অবশেষে সেই আরেক নতুন বন্ধনের ফাঁদে পড়ে যেতে হয়। যে ফাঁদ থেকে বের হওয়ার আর কোনো উপায় থাকে না তার হাতে। গ্রামের হাসপাতালের স্থায়ী ডাক্তার হিসেবে শশীর নতুন জীবন শুরু হয়।
শশী শৃঙ্খল থেকে বের হতে পারলো না। পুতুলের সুতো ছেঁড়ার সাহস বা ক্ষমতার যে কিছুটা ঘাটতি তার মাঝে ছিল- একথা এখন বলা যায়। সেই গাওদিয়া গ্রাম, যাদব পণ্ডিতের হাসপাতাল, পিতার পৈতৃক ভিটা এসবেই শশীর আশ্রয়। কুসুমজয়ের স্বপ্ন, বিলেত যাওয়ার স্বপ্ন, জীবনকে উপভোগ করবার স্বপ্ন কেবল স্বপ্নই থেকে যায়। উপন্যাসের শেষ বাক্যেও যেন সেই স্বপ্নভঙ্গের হতাশা নিনাদিত হয়—
“মাটির টিলাটির উপর উঠিয়া সূর্যাস্ত দেখিবার শখ এ জীবনে আর একবারও শশীর আসিবে না।”
‘পুতুলনাচের ইতিকথা’য় কোথাও আক্ষরিক পুতুলনাচের দৃশ্য নেই। তবে মানুষের মাঝেই পুতুল যে নানাভাবে খেলা করে অথবা মানুষই পুতুল হয়ে নাচে আর সুতোছেড়া প্রকৃত মানুষের উপস্থিতিতে পুতুলের স্বাতন্ত্রীকরণ স্পষ্ট হয়- তাই পুতুলনাচের ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত হয়েছে। মূলত, পুতুল হওয়া না হওয়ার যুগপৎ দ্বন্দ্ব ও মিথস্ক্রিয়ায় উপন্যাসটির নামকরণ ব্যঞ্জনাময় এবং আলংকারিক বিবেচনায় অনেকখানিই যথার্থ।
তবুও কেন এই উপন্যাসের নাম ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’, তা যেন কিছুটা রহস্যাবৃতই মনে হয়।
মানুষের উপায়হীন পরাজয়, নির্বিকার আত্মসমর্পণ ও অসহায় অস্তিত্বচেতনার সঙ্গেই পুতুল-প্রসঙ্গটি জড়িত। মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা বিশ্বাস ও সেই বিশ্বাসের কাছে ও সংস্কারের কাছে উপায়হীন আত্মসমর্পণই মানুষকে পুতুল করে দেয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সচেতনভাবে এক গ্রামীণ আবহে অথচ কলকাতা ফেরত আধুনিক শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত শশীডাক্তারের মনোজাগতিক জটিলতাকে উপজীব্য করেছেন আলোচ্য উপন্যাসে। মানিক এখানে বহির্বাস্তববাদী যতটুকু তার চেয়ে তিনি একান্তই মনোবাস্তবতার শিল্প।
“মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নেহাৎ-বস্তুবাদী শিল্পী নন- অনেকখানি আন্তর্বাস্তবতার শিল্পী। এর সাক্ষ্য তাঁর চরিত্রের মনোবাস্তবতায় যেমন প্রাপ্তব্য, তেমনি পাওয়া যাবে তাঁর রহস্যময়তার ব্যবহারে।”
উপন্যাসের বিভিন্ন অংশেই নিয়তি-প্রসঙ্গ চলে আসে। কিন্তু এই নিয়তি কে বা কী? এই নিয়তি কি কোনো অদৃশ্য শক্তি নাকি তা বাস্তবতারই আরেক রূপ?
‘পুতুলনাচের ইতিকথা’য় কেবল পুতুলদের কথাই ব্যক্ত হয়নি, বরং মানুষ সত্তা নির্মাণের মধ্য দিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পুতুল ও মানুষের দ্বৈরথ নির্মাণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে সমালোচকের মত-
“কখনো একক চরিত্রকে উপলক্ষ করে, কখনো-বা বিপরীত যুগল চরিত্র সৃজন করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়তির পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তিকে দাঁড় করিয়ে দেন। …’পুতুলনাচের ইতিকথা’য় ভাগ্যবিড়ম্বিত এবং ভাগ্য নির্মাতা চরিত্রের চলাচল বিস্তর। মানিক সমগ্র উপন্যাসটিতে এই দুই পক্ষ মানুষ এবং কথিত অদৃশ্য ভাগ্যদেবতার কথা সংলাপে-বর্ণনায়-ভাষ্যে নানাভাবে উপস্থাপন করেছেন।”
