পাকিস্তান থেকে অস্ট্রেলিয়া, হাসানের উত্থানের গল্প।

লেখক: তানজিল
প্রকাশ: ১২ ঘন্টা আগে

স্পোর্টস ডেস্ক:

বাংলাদেশ ক্রিকেটে পেস বোলিংয়ের গল্পটা খুব একটা দীর্ঘ নয়। একটা সময় দেশের ক্রিকেটে পেসার মানেই ছিল নতুন বলে কয়েক ওভার বল করে স্পিনারদের হাতে বল তুলে দেওয়া। টেস্ট ক্রিকেটে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপকে গতি, সুইং আর বাউন্স দিয়ে চাপে রাখার মতো পেস আক্রমণ ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি।

তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। তাসকিন আহমেদ, এবাদত হোসেনদের পর এখন বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ে নতুন করে আলো ছড়াচ্ছেন এই লক্ষীপুর এক্সপ্রেস। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা শক্ত করছেন এই ডানহাতি পেসার।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইন টেস্টে দুর্দান্ত বোলিং করে সেই প্রমাণই দিয়েছেন হাসান। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়ার পর পুরো ম্যাচে তাঁর শিকার ৯ উইকেট। তাঁর বোলিংয়ের ওপর ভর করেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয় পেয়েছে বাংলাদেশ।
অস্ট্রেলিয়া সিরিজের আগে হাসানকে নিয়ে সাকিব আল হাসানের একটি মন্তব্যও বেশ আলোচনায় ছিল। বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে হাসানকেই সবচেয়ে পরিণত মনে হয় বলে জানিয়েছিলেন সাকিব।

সাকিবের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের কাছ থেকে এমন প্রশংসা হাসানের জন্য বড় ব্যাপার। কারণ হাসানের বোলিংয়ে এখন আগের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ দেখা যায়। তিনি শুধু গতি দিয়ে নয়, লাইন ও লেংন্থ ঠিক রেখেও ব্যাটারকে চাপে ফেলতে পারেন।

হাসানের টেস্ট ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আসে ২০২৪ সালের পাকিস্তান সফরে রাওয়ালপিন্ডিতে দ্বিতীয় টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫ উইকেট নেন তিনি। সেটি ছিল টেস্টে তাঁর প্রথম পাঁচ উইকেট।
সেই ম্যাচে বাংলাদেশের পেসাররা পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংসের ১০ উইকেটই তুলে নেন। বাংলাদেশ ম্যাচটি জিতে নেয় এবং পাকিস্তানের মাটিতে সিরিজও ২-০ ব্যবধানে জেতে।
সেই সিরিজের পর থেকেই টেস্ট ক্রিকেটে হাসানের ওপর আস্থা বাড়তে থাকে।
অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটেও খেলেছেন হাসান। কেন্টের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম ম্যাচেই দারুণ বোলিং করেন তিনি। ল্যাঙ্কাশায়ারের বিপক্ষে ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ৩ উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেট নেন। দুই ইনিংস মিলিয়ে তাঁর শিকার ছিল ৯ উইকেট।
কাউন্টি ক্রিকেটের এই অভিজ্ঞতা হাসানকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। লাল বলে দীর্ঘ সময় বোলিং করা, ধৈর্য ধরে একই জায়গায় বল করা এবং কন্ডিশন বুঝে বোলিং করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের আগে এই অভিজ্ঞতা তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে কোন লেংথে বল করতে হবে, সেটাও বুঝতে সাহায্য করেছে ইংল্যান্ডের অভিজ্ঞতা।

ডারউইন টেস্টে অস্ট্রেলিয়া টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামে। শুরু থেকেই বাংলাদেশের পেসাররা চাপ তৈরি করেন।
সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দেন হাসান মাহমুদ।
এক এক করে গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিতে থাকেন তিনি। ট্রাভিস হেড, জেক ওয়েদারাল্ড ও স্টিভ স্মিথের মতো ব্যাটাররা তাঁর শিকার হন। শেষ পর্যন্ত ৫৫ রান দিয়ে ৬ উইকেট নেন হাসান। অস্ট্রেলিয়া অলআউট হয় ১৯৮ রানে।

এটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো বাংলাদেশি বোলারের প্রথম পাঁচ উইকেটের কীর্তি।
হাসানের সাফল্য শুধু প্রথম ইনিংসে ছিল না। দ্বিতীয় ইনিংসেও গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রাখেন তিনি।

পুরো ম্যাচে ৯ উইকেট নিয়ে হন বাংলাদেশের জয়ের অন্যতম নায়ক।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে তাদের মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় তুলে নেয়।

হাসানের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর নিয়ন্ত্রণ। শুধু গতি দিয়ে ব্যাটারকে সমস্যায় ফেলেন না তিনি। বরং ভালো লাইন ও লেংথে নিয়মিত বল করে ব্যাটারকে ভুল করতে বাধ্য করেন।
নতুন বলে সুইং করাতে পারেন। আবার পুরোনো বলেও ধৈর্য ধরে একই জায়গায় বল করার ক্ষমতা আছে তাঁর।
পরিস্থিতি অনুযায়ী বোলিংয়ে পরিবর্তন আনতে পারাটাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করছে।
এ কারণেই সাকিবের পরিণত বোলার হিসেবে হাসানকে দেখার মন্তব্যটি এখন আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
হাসান মাহমুদের এই পারফরম্যান্স বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যও বড় সুখবর। কারণ টেস্ট ক্রিকেটে ভালো পেসার পাওয়া বাংলাদেশের জন্য সবসময়ই কঠিন ছিল।
এখন হাসান, তাসকিন, এবাদত ও নাহিদ রানাদের নিয়ে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী।
তবে হাসানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধারাবাহিকতা ধরে রাখা।
পাকিস্তানে পেয়েছিলেন প্রথম বড় সাফল্য। ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেট তাঁকে দিয়েছে নতুন অভিজ্ঞতা। আর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এসে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ইতিহাস গড়েছে।
সাকিবের আস্থা, নিজের পরিশ্রম আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে হাসান মাহমুদ এখন বাংলাদেশের টেস্ট দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেসার।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাঁর পারফরম্যান্স হয়তো শুধু একটি ম্যাচের গল্প নয়। এটি হতে পারে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে হাসান মাহমুদের বড় হয়ে ওঠার নতুন অধ্যায়ের শুরু।