নিজস্ব প্রতিনিধি:
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট নতুন কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শ্রমবাজারটি যেমন অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্নের কর্মস্থল, তেমনই এই দেশে যেতে হলে প্রবাসে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর শ্রমিকদের পদে পদে সিন্ডিকেটের বেড়াজালে আটকা পড়তে হয়। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। সেই সময় মাত্র ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো যেত।
এরপর, ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর একটি নতুন সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে সেই বাজার খুলতে দীর্ঘ ৩ বছর সময় লেগেছিল। ২০২২ সালের আগস্ট মাসে দেশটিতে আবারও বাংলাদেশি কর্মীদের যাওয়া শুরু হয়। তখন প্রথমে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনুমোদন দেওয়া হলেও পরবর্তীতে সেই সংখ্যা বাড়িয়ে ১০১টি করা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে মালয়েশিয়া আবারও কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয়। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেট কর্তৃক সংঘটিত দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণেই মূলত দেশটি এই সিদ্ধান্ত নেয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও এই সিন্ডিকেট সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। এই সমস্যার সমাধানে সহায়তা চেয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সদস্যরা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টার কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করেছেন।
অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মালয়েশিয়া থেকে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে, সিন্ডিকেট তার চেয়েও বেশি অর্থ পাচার করে। এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা শ্রম চুক্তির কয়েকটি ধারা সংশোধনের পরামর্শ দিয়েছেন। সম্প্রতি দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে শ্রম অধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যান্ডি হল এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন। কর্মী নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনাকে সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্ত করতে তিনি দুই দেশের মধ্যকার শ্রম চুক্তি সংশোধনের পরামর্শ দিয়েছেন। দায়িত্বজ্ঞানহীন, অনিয়মিত ও অনৈতিক নিয়োগ এবং এ ধরনের আচরণের ফলে অসদাচরণ, ঋণের দাসত্ব ও অন্যান্য নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক শ্রমিকের জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে বলেও তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
এদিকে, বায়রার সদস্যরা হাসিনা সরকারের আমলে মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটের অবৈধভাবে অর্থ লোপাটের বিচার এবং মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন। সরকার শ্রমিকদের বিদেশ যাওয়ার জন্য ৮০ হাজার টাকা ফি নির্ধারণ করে দিলেও সিন্ডিকেটের কারণে জনপ্রতি সাড়ে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। যেখানে ৫০ জনের কাজের সুযোগ রয়েছে, সেখানে ৫০০ জনকে পাঠানো হয়েছে। ফলে শ্রমিকরা সেখানে গিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন বলে বায়রার সদস্য খন্দকার আবু আশফাক জানিয়েছেন। আবারও সিন্ডিকেট তৈরি করা হচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, এবার কোনোভাবেই সিন্ডিকেট হতে দেওয়া হবে না, তা প্রতিরোধ করা হবে। বিএনপির কেউ সিন্ডিকেটে বিশ্বাস করে না। যদি কেউ সিন্ডিকেটে জড়িত হয়, তবে সেটি ব্যক্তিগতভাবে হবে, দলগতভাবে নয়। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে যাতে কোনো প্রকার অসাধু চক্রের ফাঁদ তৈরি না হয়, সে বিষয়ে বায়রার সদস্যরা জোর দাবি জানিয়েছেন।
প্রবাসের শ্রমবাজার কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য নয়, বরং সব বৈধ এজেন্সির জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে এবং কম খরচে কর্মী পাঠানো নিশ্চিত করতে তারা স্মারকলিপিতে দাবি তুলে ধরেন। বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া এবং নেপালের অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা এখনও অন্যান্য উৎস দেশগুলোর পাশাপাশি আপডেট হওয়া এফসিডাব্লুএমএস ওয়েবসাইটে দেখা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে বায়রার সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, সিন্ডিকেটের শর্ত মেনে নেওয়ার জন্য চলমান আলোচনা এই দেশগুলোর অংশগ্রহণকারীদের তালিকাভুক্ত করতে বিলম্ব ঘটাচ্ছে।
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে ‘একটি উন্নয়ন বয়ানের ব্যবচ্ছেদ’ নামক একটি শ্বেতপত্রে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন কমিটি গত বছর দেশের অর্থনীতি নিয়ে যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করে, সেখানে এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠিয়ে ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি চক্র দেড় বছরেই প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রায় পৌনে ৫ লাখ কর্মীর কাছ থেকে অতিরিক্ত এই অর্থ নিয়ে চক্রটি নিজেদের পকেট ভরেছে। চাহিদার চেয়ে বেশি কর্মী পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে। এই চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের চারজন সংসদ সদস্যের নামও এসেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এরই মধ্যে ওই চার সাবেক এমপির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তারা হলেন সাবেক মন্ত্রী ও এমপি আ হ ম মুস্তফা কামাল, নিজাম উদ্দিন হাজারী, বেনজীর আহমেদ এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। প্রথম তিনজন আওয়ামী লীগের এবং মাসুদ উদ্দিন জাতীয় পার্টির এমপি ছিলেন।
মালয়েশিয়া সরকার ২০২২ সালের জুনে ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দেয়। এই এজেন্সিগুলো সিন্ডিকেট নামে পরিচিতি পায়। এতে চারজন বাংলাদেশি মন্ত্রী ও এমপির প্রতিষ্ঠান ছিল। সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশীয় নাগরিক আমিনুল ইসলাম আবদুন নুর। বাংলাদেশ অংশের নিয়ন্ত্রণ করতেন বিতর্কিত ব্যবসায়ী রুহুল আমিন স্বপন। বাংলাদেশ সরকার প্রত্যেক কর্মীর অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করেছিল ৭৯ হাজার টাকা। কিন্তু প্রত্যেক কর্মীর কাছ থেকে ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা নেওয়া হয়। সিন্ডিকেটের বাংলাদেশ অংশের নিয়ন্ত্রকরা জনপ্রতি ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা করে নিতেন। মালয়েশিয়ার নিয়ন্ত্রকরা ভিসাপ্রতি ছয় হাজার রিঙ্গিতের সমপরিমাণ প্রায় দেড় লাখ টাকা নিতেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রুহুল আমিন স্বপন দেশ ছেড়েছেন। তবে এই সিন্ডিকেটের দুই মূল হোতাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের আওতায় আনার জন্য গত ২৪ অক্টোবর ইন্টারপোলের বাংলাদেশ শাখা থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এদিকে, বায়রার পক্ষ থেকে সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত অনলাইন সফটওয়্যার বাতিল করার জন্য মালয়েশিয়া সরকারের কাছে দাবি জানাতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টার কাছে জোর দাবি জানানো হয়েছে। ভোগান্তি কমাতে নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরও সরকারিভাবে খুব বেশি মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন না। সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গেছেন মাত্র ৩ দশমিক ০৪ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে, দালালের বাইরে বেসরকারি কোম্পানি বা এজেন্সিগুলোকে টাকা দিয়ে বিদেশে গেছেন ৪২ দশমিক ০৯ শতাংশ। অন্যান্য উপায়ে বিদেশ গেছেন ২ দশমিক ৮০ শতাংশ।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিবাসনের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় সমস্যা। শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের সম্পৃক্ততা দরিদ্র কর্মীদের খরচ বাড়িয়ে দেয়। বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, ৫৮ দশমিক ২৪ শতাংশ মানুষ বিদেশ যেতে ঋণের ওপর নির্ভর করেন। শহরের ৫১ দশমিক ৮৩ শতাংশ ও গ্রামের ৬০ দশমিক ০৭ শতাংশ মানুষ ঋণ নিয়েছেন। নারীদের (৩৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ) তুলনায় পুরুষরা (৫৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ) বেশি ঋণ নেন। এদিকে, মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পাশাপাশি স্থায়ীভাবে ফেরতও আসছেন অনেকে। বিবিএসের তথ্যে জানা গেছে, মালয়েশিয়া থেকে ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ মানুষ দেশে ফেরত এসেছেন।
