মেঘনায় জলদস্যু আতঙ্ক: ‘টোকেন’ কিনে মাছ ধরছেন জেলেরা, অন্যথায় অপহরণ।

লেখক: মোঃ হোসাইন
প্রকাশ: ১ বছর আগে

ভোলা – মনপুরা প্রতিনিধি:

মুক্তিপণ চাঁদা না দিলে হামলা-লুটপাট, অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আদায় করা হচ্ছে মুক্তিপণ। ভয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে নারাজ ভুক্তভোগীরা, সক্রিয় পুলিশ। ভোলার মনপুরায় জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ ধরা পড়লেও তাদের মুখে হাসি নেই। মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এখন জেলেদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে উঠেছে জলদস্যু বাহিনী। রাতের আঁধারে মাছ ধরতে গেলেই ঘটছে হামলা, লুটপাট ও অপহরণের মতো ভয়ঙ্কর ঘটনা।

জলদস্যুদের কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ‘বিশেষ টোকেন’ সংগ্রহ করলে তবেই মিলছে মাছ ধরার ‘নিরাপত্তা’। অন্যথায় অপহরণ করে আদায় করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ।এই অবস্থায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ী।গত দুই সপ্তাহ ধরে মেঘনায় ইলিশের প্রাচুর্য জেলেদের মনে আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু সেই আশা আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। জলদস্যুদের ভয়ে বহু জেলে রাতে নদীতে নামা বন্ধ করে দিয়েছেন।

ফলে একদিকে যেমন বাড়ছে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে লোকসানের মুখে পড়ছেন মৎস্য আড়তদাররা।মুক্তিপণ দিয়ে ফেরা জেলের ভয়ানক বর্ণনাসম্প্রতি জলদস্যুদের হাতে অপহৃত হওয়ার পর মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এসেছেন মাঝের ঘাট এলাকার জেলে মো. গিয়াস উদ্দিন মাঝি। সেই ভয়াল রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “গত ২৭ জুলাই রাতে আমরা ১০ জন জেলে মনপুরা ও হাতিয়ার মাঝামাঝি মেঘনায় মাছ ধরছিলাম।

হঠাৎ করেই ১৫-২০ জনের একটি ডাকাত দল স্পিডবোটে এসে আমাদের ট্রলার ঘিরে ফেলে। পিস্তল আর ধারালো অস্ত্রের মুখে আমাদের জিম্মি করে ফেলে। এরপর ট্রলারে থাকা মাছ, জালসহ সবকিছু লুট করে নেয়।”তিনি আরও জানান, ডাকাতরা তাকেসহ আরও দুটি ট্রলারের দুই মাঝিকে অপহরণ করে তাদের স্থানে নিয়ে যায়। পরে তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করেই আড়তদার ও পরিবারের কাছে জনপ্রতি এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। কান্নাকাটি ও দর-কষাকষির পর তিনজনের জন্য মোট এক লাখ টাকায় দফারফা হয়।

পরিবারের সদস্যরা বিকাশে টাকা পাঠানোর দুই দিন পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।’টোকেন’ এখন মাছ ধরার রক্ষাকবচভুক্তভোগী জেলেরা জানান, মেঘনায় নিরাপদে মাছ ধরতে হলে হাতিয়ার একটি জলদস্যু বাহিনীকে অগ্রিম চাঁদা দিয়ে একটি ‘বিশেষ টোকেন’ সংগ্রহ করতে হয়। নৌকা প্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায় কেনা এই টোকেন সঙ্গে থাকলে জলদস্যুরা হামলা করে না।

এটিই এখন তাদের জন্য ‘রক্ষাকবচ’। যারা এই টোকেন ছাড়া নদীতে নামছেন, তারাই হামলার শিকার হচ্ছেন। গত ২৭ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০টি ট্রলারে ডাকাতি হয়েছে এবং ৫ জন জেলেকে অপহরণের পর মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনা হয়েছে বলে জেলেরা জানিয়েছেন। গত ছয় মাসে এই সংখ্যা আরও বেশি। কিন্তু অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েও জীবনের ভয়ে জেলেরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।পুলিশের তৎপরতা। এদিকে জেলেদের এই চরম দুর্দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

মনপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহসান কবিরের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল উপজেলার বিভিন্ন মৎস্য ঘাট পরিদর্শন করে জেলেদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। ওসি জেলেদের সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন, “জলদস্যু নির্মূলে পুলিশের বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। আমরা জেলেদের সর্বাত্মক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। যেকোনো তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করুন, পরিচয় গোপন রাখা হবে।”তবে প্রশাসনের আশ্বাস থাকা সত্ত্বেও ‘টোকেন’ ছাড়া রাতে মেঘনায় নামতে ভরসা পাচ্ছেন না জেলেরা। তাদের দাবি, এই চাঁদাবাজি ও অপহরণের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস না করা পর্যন্ত তাদের আতঙ্ক কাটবে না।