একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের প্ল্যাটফর্ম জাতীয় নাগরিক কমিটি। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করবে বলে জানা গেছে। তবে দল গঠনের আগেই এর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
সূত্র মতে, নাগরিক কমিটির শীর্ষ পর্যায়ে অন্তত চারটি ভিন্ন মতাদর্শের বলয় গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইসলামী ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সাবেক কয়েকজন নেতাকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষ।
নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি রাফে সালমান রিফাত জানান, অতীতে শিবির সংশ্লিষ্টতার কারণে যারা রাজনৈতিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাদের একইভাবে পেছনে রাখা হচ্ছে। তিনি এটিকে রাজনৈতিক ট্যাগিং বলে অভিহিত করেন।
এই পরিস্থিতিতে, আন্দোলনে ভূমিকা রাখা কিছু তরুণ সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন, যা অভ্যন্তরীণ বিরোধকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।
নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী জানিয়েছেন, সংগঠনটির বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা চলছে এবং আশা করা হচ্ছে যে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হবে।
আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা আসতে পারে, যদিও দলের নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
নাগরিক কমিটির শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে চলমান আলোচনায় নাহিদ ইসলাম আহ্বায়ক হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। বেশিরভাগ সদস্যই তাকে আহ্বায়ক করার পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে, সদস্য সচিব পদ নিয়ে দফায় দফায় আলোচনা চলছে, যেখানে আখতার হোসেন, সারজিস আলম, ও হাসনাত আব্দুল্লাহর নাম আলোচনায় রয়েছে।
একজন কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন, নাগরিক কমিটির বর্তমান আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীকে নতুন দলে সদস্য সচিব করার জন্য ছাত্র রাজনীতির এক অংশের পক্ষ থেকে চাপ রয়েছে। পাশাপাশি সামান্তা শারমিন, আলী আহসান জোনায়েদের নামও বিভিন্ন পদে আলোচনায় এসেছে।
নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়ে মুখপাত্র সামান্তা শারমিন বলেন, “একটি রাজনৈতিক দলে শীর্ষ পদ নিয়ে আলোচনা স্বাভাবিক। এতে আমাদের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা কেমন হবে, তা বোঝা যাবে।”
নাগরিক কমিটির অভ্যন্তরে বিভক্তির মূল কারণ দুটি প্রধান গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব। একটি গ্রুপ গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি থেকে আসা নেতাদের নিয়ে গঠিত, অন্যটি ইসলামী ছাত্র সংগঠনের সাবেক নেতাদের সমর্থন পেয়ে আসছে।
বিশেষ করে শীর্ষ চারটি পদ— আহ্বায়ক, সদস্য সচিব, মুখ্য সংগঠক ও মুখপাত্র— নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়ে উঠেছে। যেহেতু নাহিদ ইসলামের আহ্বায়ক হওয়া প্রায় নিশ্চিত, তাই বাকি তিনটি পদে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে চান ইসলামী ছাত্র সংগঠনের সাবেক নেতারা।
একজন কেন্দ্রীয় নেতা অভিযোগ করেছেন, কিছু পক্ষ ‘শিবির’ পরিচয়ের কারণে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই প্রসঙ্গে ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি রাফে সালমান রিফাত বলেন, “একটি গোষ্ঠী ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চাইছে, অন্য পক্ষ বঞ্চিত হচ্ছে। এটি ন্যায্যতার প্রশ্ন। ফলে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসছে।”
এই পরিস্থিতি নাগরিক কমিটিকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলেছে। মুখপাত্র সামান্তা শারমিন বলেন, “কিছু ব্যক্তি বিষয়গুলো এমন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সমাধানের বদলে আরও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এটি নিয়ে আমাদের ফোরামে আলোচনা হয়েছে এবং প্রয়োজনে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আগামী ২১ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন। আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, নতুন দল গঠনের ক্ষেত্রে বিপ্লব, গণতন্ত্রের মতো বিষয়গুলোর সমন্বয়ে একটি উপযুক্ত নাম নির্ধারণ করা হবে, যা সকলের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত হবে।
