বাংলাদেশে ক্রমশ অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এক মাস আগে শুরু হয়েছিল সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ অভিযান ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’। আজ (শনিবার) এই অভিযানের এক মাস পূর্ণ হলো, তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি কতটুকু হয়েছে, তা নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ ও বিতর্ক।
বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালানো হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ তুলছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তারা বলছে, অপরাধ কমার পরিবর্তে নতুন নতুন সহিংসতা দেখা যাচ্ছে। প্রকাশ্যে ছিনতাই, ডাকাতি, গণপিটুনি, ধর্ষণ, উগ্র গোষ্ঠীর হামলা, এমনকি পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া অঞ্চলে চরমপন্থি তৎপরতা বাড়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান বলেন, “অভিযানের ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরিবর্তে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।” মানবাধিকারকর্মী নূর খানও একই মত প্রকাশ করে বলেন, “প্রথম এক মাসের মূল্যায়নে অভিযানের সফলতা খুব একটা চোখে পড়ছে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি।”
এই অভিযানে এখন পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি গ্রেফতার করা হয়েছে, আর বিভিন্ন নতুন-পুরাতন মামলায় আটক হয়েছে ২০ হাজারের বেশি মানুষ। তবে বিতর্ক উঠেছে, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ দলের নেতাকর্মী। বিরোধীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই গ্রেফতার অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে সরকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই তাদের আটক করা হয়েছে।
সরকারের অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভার আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কমিটির সদস্য সচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, “অন্যায়ভাবে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। যাদের নামে মামলা রয়েছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, “আওয়ামী লীগ ষড়যন্ত্র করছে, তাদের ‘ডেভিল অ্যাক্টিভিটিজ’ রুখতে ‘ডেভিল হান্ট’ প্রয়োজনীয় ছিল।”
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের দাবির পর ৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই অভিযানের মধ্যেই নারী ও শিশু নির্যাতন এবং অন্যান্য অপরাধের হার কমার বদলে বেড়েছে বলে বিভিন্ন সংগঠনের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
এছাড়া নারী ও শিশু অপহরণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে।
অপরাধ বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ হচ্ছে। কিছু আন্দোলনকারী স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিও তুলেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী মধ্যরাতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন, যেখানে তিনি শীঘ্রই আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হবে বলে আশ্বাস দেন।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, “অভিযান চললেও অপরাধ কমার কোনো লক্ষণ নেই, বরং মানুষ আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।” তারা মনে করছে, যদি সঠিক কৌশল নেওয়া না হয়, তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
অভিযান অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চললেও দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়, বরং উদ্বেগ বাড়ছে—এটাই এখন আলোচনার মূল বিষয়।
