জমি-উত্তরাধিকার রক্ষায় নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থা।

লেখক: এমরানুর রেজা
প্রকাশ: ২ ঘন্টা আগে

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট:

বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা/সিটি করপোরেশনের অধীনে একটি ডিজিটাল পরিবার ফোল্ডার (Digital Family Folder) চালু করা যেতে পারে। এই ফোল্ডারে একটি পরিবারের সদস্যদের পরিচয়, জন্ম-মৃত্যু, শিক্ষা, পেশা, বৈবাহিক অবস্থা, উত্তরাধিকার এবং পরিবারের মালিকানাধীন সম্পত্তির মৌলিক তথ্য সংরক্ষিত থাকবে— এর ফলে একজন নাগরিক জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় তথ্যব্যবস্থার সঙ্গে একটি ধারাবাহিক রেকর্ডের মধ্যে থাকবেন।

কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করলে জন্মনিবন্ধনের সময় তার তথ্য সংশ্লিষ্ট পরিবারের ডিজিটাল ফোল্ডারে যুক্ত হবে। সেখানে থাকবে— নাম। জন্মতারিখ। জন্মনিবন্ধন নম্বর। পিতা-মাতার পরিচয়। পরিবারের পরিচিতি নম্বর। ঠিকানা। অর্থাৎ নতুন একজন নাগরিক জন্মগ্রহণ করলেই তার পারিবারিক পরিচয় রাষ্ট্রীয় তথ্যব্যবস্থায় সংযুক্ত হবে।কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে মৃত্যু নিবন্ধনের মাধ্যমে তার স্ট্যাটাস “মৃত” হিসেবে হালনাগাদ হবে। তবে মৃত ব্যক্তির তথ্য মুছে ফেলা হবে না। বরং তার পূর্ববর্তী তথ্য সংরক্ষিত থাকবে এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত— উত্তরাধিকারী। সম্পত্তি মালিকানার অংশ বৈধ দলিল উত্তরাধিকার সংক্রান্ত পরিবর্তন।

পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হবে।পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা জমি ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির মৌলিক তথ্য পরিবার ফোল্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত করা যেতে পারে। যেমন— মৌজা। খতিয়ান নম্বর। দাগ নম্বর। জমির পরিমাণ। মালিকের নাম। মালিকানার অংশ। দলিল নম্বর ও তারিখ। নামজারি/খারিজের তথ্য। তবে পরিবার ফোল্ডার নিজে কোনো নতুন মালিকানা সৃষ্টি করবে না। এটি হবে বিদ্যমান সরকারি ভূমি রেকর্ডের সঙ্গে সংযুক্ত একটি তথ্য ও যাচাই ব্যবস্থা— এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হতে পারে উত্তরাধিকার সুরক্ষায়। কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার পরিবার ফোল্ডারে থাকা পারিবারিক সম্পর্কের তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীদের শনাক্ত করা যাবে। এর ফলে— একজন ওয়ারিশকে গোপন করে অন্য ওয়ারিশদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করে দেওয়া কঠিন হবে।

কোনো উত্তরাধিকারীর নাম বাদ দিতে হলে তার পেছনে বৈধ কারণ ও প্রমাণ থাকতে হবে।যেমন— বৈধ বণ্টননামা। বৈধ হস্তান্তর দলিল। বৈধ ত্যাগ/হস্তান্তরের দলিল। আদালতের আদেশ।আইনসম্মত অন্য কোনো প্রমাণ। শুধু স্থানীয়ভাবে কাউকে বাদ দিয়ে একটি তালিকা তৈরি করলেই যেন রাষ্ট্রীয় রেকর্ডে তার উত্তরাধিকার অধিকার বিলুপ্ত না হয়— এমন সুরক্ষা প্রয়োজন। বাংলাদেশে উত্তরাধিকার সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের একটি বড় জায়গা হলো নারীর অংশ। বিশেষ করে অনেক ক্ষেত্রে ভাইয়েরা বোনদের বাদ দিয়ে সম্পত্তি ভোগ বা বিক্রির চেষ্টা করতে পারেন। ডিজিটাল পরিবার ফোল্ডারে পরিবারের সদস্যদের সম্পর্ক ও উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকলে কোনো বোন, স্ত্রী বা অন্য উত্তরাধিকারীকে গোপন করা কঠিন হবে।

তবে শুধু ডাটাবেস তৈরি করলেই হবে না— সম্পত্তি হস্তান্তরের সময় সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকারীদের অধিকার যাচাই করার জন্য আইনগত বাধ্যবাধকতাও থাকতে হবে। গ্রাম পর্যায়ে এই ব্যবস্থার প্রধান প্রশাসনিক দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদের ওপর দেওয়া যেতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ—পরিবার ফোল্ডার তৈরি করবে । জন্মের তথ্য যুক্ত করবেমৃত্যুর তথ্য হালনাগাদ করবে। পারিবারিক সম্পর্ক যাচাই করবে। নাগরিকের আবেদনে তথ্য সংশোধনের প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ভূমি ও অন্যান্য সরকারি ডাটাবেসের সঙ্গে তথ্য সমন্বয় করবে। তবে ইউনিয়ন পরিষদ এককভাবে তথ্য পরিবর্তন করতে পারবে না।

প্রত্যেক পরিবর্তনের জন্য ডিজিটাল লগ বা Audit Trail থাকতে হবে— কে, কখন, কী তথ্য পরিবর্তন করেছেন তা স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকবে। কোনো জনপ্রতিনিধি বা কর্মকর্তা যেন ইচ্ছামতো কোনো পরিবারের সদস্যের নাম বাদ দিতে না পারেন। এখানেই ব্যবস্থাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন। তাই— একজনের নাম যুক্ত করা যত সহজ হবে, নাম বাদ দেওয়া তত কঠিন এবং প্রমাণনির্ভর হবে। কোনো সদস্যকে পরিবার থেকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দলিল, আদালতের আদেশ বা বৈধ প্রশাসনিক প্রমাণ সংযুক্ত করতে হবে। প্রতিটি পরিবর্তনের ডিজিটাল ইতিহাস সংরক্ষিত থাকবে।

পরিবারের সদস্যরা সরকারি অনুমোদিত অ্যাপ/ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে নিজেদের পরিবার ফোল্ডারের তথ্য দেখতে পারবেন। তবে সব তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে না। ব্যক্তিগত তথ্যের ক্ষেত্রে থাকবে— নাগরিকের নিজস্ব অ্যাক্সেস। অনুমোদিত কর্মকর্তার সীমিত অ্যাক্সেস। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আইনসম্মত অ্যাক্সেস। প্রয়োজন অনুযায়ী আদালতের অ্যাক্সেস।মানুষের তথ্য ভুল হতে পারে। তাই সংশোধনের সুযোগ অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু সংশোধন মানে পুরোনো তথ্য মুছে ফেলা নয়। সিস্টেমে থাকবে— পুরোনো তথ্য → সংশোধনের আবেদন → প্রমাণ → অনুমোদন → নতুন তথ্য এবং পুরো ইতিহাস সংরক্ষিত থাকবে।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি হবে ডিজিটাল পরিবার ফোল্ডার ও ভূমি রেকর্ডের পারস্পরিক সংযোগ। যদি কোনো ব্যক্তি মারা যান তখন তার নামে থাকা সম্পত্তির রেকর্ড সিস্টেম শনাক্ত করতে পারবে এবং সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য সতর্কবার্তা দিতে পারবে। আবার কোনো সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সিস্টেম যাচাই করতে পারবে— বিক্রেতা → প্রকৃত মালিকানা → উত্তরাধিকার → অংশীদার → বৈধ দলিল। এই ব্যবস্থার মূলনীতি হতে পারে— জন্ম থেকে মৃত্যু—প্রতিটি নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়, পরিবার, শিক্ষা ও সম্পত্তির তথ্য থাকবে একটি সুরক্ষিত ডিজিটাল ধারাবাহিকতায়। তবে এই ডাটাবেসকে শুধু তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলে হবে না। এটিকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে তথ্য গোপন করে কারও বৈধ অধিকার নষ্ট করা না যায়।

বাংলাদেশে জমি ও উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধের বড় একটি কারণ হলো তথ্যের বিচ্ছিন্নতা। জন্মনিবন্ধন এক জায়গায়, মৃত্যু নিবন্ধন অন্য জায়গায়, ভূমি রেকর্ড অন্য জায়গায়, উত্তরাধিকার সনদ অন্য জায়গায়— ফলে একজন মানুষের পুরো পারিবারিক ও সম্পত্তিগত ইতিহাসকে একসঙ্গে দেখা কঠিন। ডিজিটাল পরিবার ফোল্ডার এই বিচ্ছিন্নতাকে কমিয়ে একটি সমন্বিত নাগরিক রেকর্ড তৈরি করতে পারে।এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত প্রকল্প নয়— এটি হতে পারে নাগরিক অধিকার, উত্তরাধিকার অধিকার এবং সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি আধুনিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা।এর মূল দর্শন হবে— কেউ জন্মালে রাষ্ট্র জানবে, কেউ মারা গেলে রাষ্ট্র জানবে, পরিবার বদলালে রাষ্ট্র জানবে, আর উত্তরাধিকার সৃষ্টি হলে রাষ্ট্র তার বৈধ উত্তরাধিকারীদের অধিকারও শনাক্ত করবে।