খ্রিস্টান মিশনারি থেকে ঠাকুর ও নেহেরু পরিবার

লেখক: এমরানুর রেজা
প্রকাশ: ৪ সপ্তাহ আগে

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট :

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের “সেভেন সিস্টার্স” নামে পরিচিত সাত রাজ্যের মধ্যে Arunachal Pradesh, Meghalaya এবং Nagaland বিশেষভাবে ব্যতিক্রমী। ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের কারণে এই তিন রাজ্য ভারতের মূল ভূখণ্ডের অনেক অঞ্চলের চেয়ে ভিন্ন এক পরিচয় বহন করে।অরুণাচল প্রদেশে শতাধিক উপজাতীয় ভাষা ও উপভাষার অস্তিত্ব রয়েছে। পাহাড়, অরণ্য ও নদীবেষ্টিত এই রাজ্যে এক জনগোষ্ঠীর ভাষা অন্য জনগোষ্ঠীর কাছে প্রায়ই অপরিচিত। ফলে পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য ইংরেজি একটি নিরপেক্ষ সেতুভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রশাসন, শিক্ষা ও সরকারি কর্মকাণ্ডে ইংরেজির উপস্থিতি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মেঘালয়ের চিত্রও কম বৈচিত্র্যময় নয়। খাসি, গারো ও জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। তবে শিক্ষা, প্রশাসন এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইংরেজির ব্যাপক ব্যবহার এই রাজ্যকে ভারতের অন্যতম ইংরেজি-নির্ভর অঞ্চলে পরিণত করেছে।অন্যদিকে নাগাল্যান্ডে রয়েছে বহু নাগা ভাষা। ভাষাগত বৈচিত্র্য এতটাই বিস্তৃত যে ইংরেজিই এখানে সরকারি ভাষা এবং প্রশাসন ও শিক্ষার প্রধান মাধ্যম। পাশাপাশি নাগামিজ নামের একটি যোগাযোগভাষাও সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়।ধর্মীয় দিক থেকেও এই তিন রাজ্যের পরিচয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

অরুণাচল প্রদেশে ঐতিহ্যবাহী উপজাতীয় বিশ্বাস, হিন্দুধর্ম ও খ্রিস্টধর্ম— তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে হিন্দুধর্ম অনুসারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও খ্রিস্টধর্মের প্রভাবও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।মেঘালয়ে খ্রিস্টধর্ম সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্ম। খাসি, গারো ও জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষ খ্রিস্টান, ফলে চার্চ ও খ্রিস্টীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।নাগাল্যান্ডে খ্রিস্টধর্মের প্রভাব আরও গভীর। ভারতের সবচেয়ে খ্রিস্টান-প্রধান রাজ্যগুলোর অন্যতম এই অঞ্চলে জনসংখ্যার বিপুল অংশ খ্রিস্টধর্ম অনুসরণ করে— বিশেষ করে ব্যাপ্টিস্ট সম্প্রদায়ের অনুসারীরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ।

ভারতের মানচিত্রে এই তিন রাজ্য শুধু ভৌগোলিক সীমানার অংশ নয়; তারা বহুভাষিক সহাবস্থান, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ধর্মীয় পরিবর্তনের এক অনন্য উদাহরণ। শত শত ভাষার ভিড়ে ইংরেজি এখানে যোগাযোগের সেতু, আর পাহাড়ি জনপদজুড়ে খ্রিস্টধর্মের উপস্থিতি এই অঞ্চলকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র সামাজিক পরিচয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের এই তিন রাজ্য তাই বৈচিত্র্যের মধ্যেও সহাবস্থানের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।Mother Teresa এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত Missionaries of Charity উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করেছে, তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই অঞ্চলকে তাঁর প্রধান কর্মক্ষেত্র বানাননি।মাদার তেরেসার কাজের কেন্দ্র ছিল Kolkata। সেখান থেকেই তাঁর সংগঠন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে দরিদ্র, অসুস্থ, অনাথ ও সমাজচ্যুত মানুষের সেবায় কাজ বিস্তৃত করে।

উত্তর-পূর্ব ভারতে, বিশেষ করে Meghalaya, Nagaland, Assam এবং Arunachal Pradesh-এ মিশনারিজ অব চ্যারিটির সিস্টাররা অনাথ আশ্রম, বৃদ্ধাশ্রম, স্বাস্থ্যসেবা ও দরিদ্র মানুষের সহায়তামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।তবে নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়ে খ্রিস্টধর্মের বিস্তারের প্রধান কারণ মাদার তেরেসা নন। সেখানে উনবিংশ ও বিংশ শতকে ইউরোপীয় ও আমেরিকান ব্যাপ্টিস্ট এবং অন্যান্য খ্রিস্টান মিশনারিরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে বড় ভূমিকা পালন করেন। মাদার তেরেসার অবদান ছিল মূলত মানবসেবা ও দাতব্য কার্যক্রমে, ধর্মান্তরকরণে নয়।১৯৪৬ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত “call within a call” বা বিশেষ ধর্মীয় আহ্বানের কথা উল্লেখ করেন।“Call within a call” (ডাকের ভেতর আরেক ডাক) কথাটি Mother Teresa নিজেই ব্যবহার করেছিলেন। তখন তিনি কলকাতার একটি ক্যাথলিক স্কুলে শিক্ষকতা করতেন এবং সন্ন্যাসিনী হিসেবে জীবনযাপন করছিলেন।

১৯৪৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর দার্জিলিং যাওয়ার পথে ট্রেনে তিনি গভীর এক ধর্মীয় অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, তিনি যিশু খ্রিস্টের কাছ থেকে একটি বিশেষ আহ্বান পেয়েছেন—কনভেন্টের নিরাপদ জীবন ছেড়ে সবচেয়ে দরিদ্র, অসহায় ও অবহেলিত মানুষের মাঝে গিয়ে কাজ করার জন্য।এই কারণেই তিনি একে “call within a call” বলেছিলেন। অর্থাৎ: প্রথম “call” ছিল সন্ন্যাসিনী হওয়ার আহ্বান।দ্বিতীয় “call” ছিল সন্ন্যাসিনীর জীবন বজায় রেখেও দরিদ্রদের মধ্যে সরাসরি সেবা করার আহ্বান।

এই অভিজ্ঞতার পর তিনি কয়েক বছরের মধ্যে কনভেন্ট ছেড়ে কলকাতার বস্তিতে কাজ শুরু করেন এবং পরে Missionaries of Charity প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫০ সালের ৭ অক্টোবর তিনি Missionaries of Charity প্রতিষ্ঠা করেন। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। একজন বিশ্বাসী খ্রিস্টান এটিকে ঈশ্বরের আহ্বান হিসেবে দেখবেন, আর একজন ইতিহাসবিদ এটিকে তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা গভীর ধর্মীয় প্রেরণা হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন।নোবেল কমিটি তাঁকে এই পুরস্কার দেয় দরিদ্র, অসুস্থ, অনাথ ও সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষের সেবায় তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ। তিনি কলকাতাকে কেন্দ্র করে মানবসেবামূলক কাজ পরিচালনা করতেন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত Missionaries of Charity বিশ্বের বহু দেশে সেবামূলক কার্যক্রম চালায়।

একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, নোবেল পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি ঐতিহ্যগত নোবেল ভোজ (banquet) বাতিল করার অনুরোধ করেছিলেন। সেই অর্থ দরিদ্র মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা হয়।নোবেল ভোজ (Nobel Banquet) হলো নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের পর আয়োজিত একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ নৈশভোজ। প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর, Alfred Nobel-এর মৃত্যুবার্ষিকীতে Stockholm-এ নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। এরপর সুইডেনের রাজপরিবার, নোবেল বিজয়ী, বিজ্ঞানী, কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ ও আমন্ত্রিত অতিথিদের নিয়ে এক বিশাল আনুষ্ঠানিক ভোজের আয়োজন করা হয়। এটিই নোবেল ভোজ বা Nobel Banquet।১৯৭৯ সালে Mother Teresa নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর অনুরোধ করেন, এই ভোজের জন্য যে অর্থ ব্যয় হতো তা যেন দরিদ্র মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা হয়। তাঁর এই অনুরোধ ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় এবং তাঁর মানবসেবামূলক দর্শনের একটি প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে স্মরণ করা হয়। তাঁর অনুরোধ গ্রহণ করা হয় এবং ভোজের ব্যয় দাতব্য কাজে দেওয়া হয়।

১৯৮০ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান Bharat Ratna লাভ করেন। কিন্তু ২০১৬ সালে “Saint Teresa of Calcutta” হিসেবে স্বীকৃতি (Canonization) তিনি মৃত্যুর প্রায় ১৯ বছর পরে পান। ক্যাথলিক চার্চে কাউকে “Saint” বা সাধু হিসেবে ঘোষণা করার প্রক্রিয়া সাধারণত মৃত্যুর পরই সম্পন্ন হয়। চার্চ ওই ব্যক্তির জীবন, কর্ম ও ধর্মীয় প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে পর্যালোচনা করে। এরপর Pope Francis ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে “Saint Teresa of Calcutta” ঘোষণা করেন।

১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার প্রধানমন্ত্রী হন এবং সেই বছরই Mother Teresa-কে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান Bharat Ratna প্রদান করা হয়। ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি চার দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন:১৯৬৬–১৯৭৭১৯৮০–১৯৮৪১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর তিনি আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। এরপর তাঁর পুত্র Rajiv Gandhi প্রধানমন্ত্রী হন— রাজনীতিতে আসার আগে তিনি পেশাগতভাবে একজন বিমানচালক (পাইলট) ছিলেন। তিনি ভারতের জাতীয় বিমান সংস্থা Air India-তে পাইলট হিসেবে কাজ করতেন— রাজীব গান্ধী প্রথমে রাজনীতিতে আসতে আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর ছোট ভাই Sanjay Gandhi-এর মৃত্যুর পর পরিবারের ও দলের চাপে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

১৯৮৪ সালে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৪০ বছর, যা তাঁকে ভারতের ইতিহাসের অন্যতম কনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী করে তোলে।একটি ঐতিহাসিক কৌতূহলের বিষয় হলো, ইন্দিরা গান্ধী নিজে ১৯৮০ সালে মাদার তেরেসাকে ভারতরত্ন প্রদান করেন, অথচ তিনি নিজেও তার আগেই (১৯৭১ সালে) ভারতরত্ন লাভ করেছিলেন। ১৯৩৪ সালে ইন্দিরা নেহেরু (পরবর্তীকালে ইন্দিরা গান্ধী) শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীর পাঠভবনে ভর্তি হন। তাঁর বাবা জওহরলাল নেহেরুর ইচ্ছায় তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শুরু করেন। তবে মা কমলা নেহেরুর অসুস্থতার কারণে তাঁর সেই শিক্ষাজীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরে মায়ের চিকিৎসার জন্য তাঁকে ইউরোপে যেতে হয়।জওহরলাল নেহেরুর নিজের শিক্ষাজীবন ছিল ইংল্যান্ডকেন্দ্রিক। বাড়িতে ব্যক্তিগত শিক্ষকের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ইংল্যান্ডের বিখ্যাত Harrow School-এ পড়েন। এরপর Cambridge-এর Trinity College-এ Natural Sciences অধ্যয়ন করেন এবং পরে লন্ডনের Inner Temple থেকে আইনশাস্ত্রে শিক্ষালাভ করে ব্যারিস্টার হন।

অন্যদিকে তাঁর বাবা মতিলাল নেহেরু ভারতে শিক্ষালাভ করেই একজন সফল আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। তাঁর অর্জিত সম্পদ ও সামাজিক অবস্থানই জওহরলাল নেহেরুর আন্তর্জাতিক শিক্ষার পথ সুগম করে।ঠাকুর পরিবারের উত্থান আরও আগে। অষ্টাদশ শতকে নীলমণি ঠাকুরদের সময় থেকে পরিবারটি কলকাতায় ব্যবসা ও সম্পদের ভিত্তি গড়ে তোলে। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম সফল ব্যবসায়ী ও জমিদার। ব্যাংক, জাহাজ, কয়লাখনি, নীলচাষসহ বিভিন্ন খাতে তাঁর বিনিয়োগ ছিল। ১৭৯৩ সালের Permanent Settlement-এর পর তিনি বিভিন্ন জমিদারি অধিগ্রহণ করেন। পরে সেই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ নিজে জমিদারির তদারকি করলেও নতুন কোনো জমিদারি অর্জন করেননি।রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিক পরিচিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে আর্জেন্টিনার সাহিত্যিক ভিক্টোরিয়া ওকামপোর সঙ্গে।

১৯২৪ সালে আর্জেন্টিনায় অবস্থানকালে ওকামপোর আতিথ্য ও সান্নিধ্য কবিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সেই সময়ে রচিত বহু কবিতা পরে ‘পুরবী’ কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয় এবং ১৯২৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থটি তিনি ওকামপোকে উৎসর্গ করেন। কবি তাঁকে ‘বিজয়া’ নামে সম্বোধন করতেন।ওকামপো ১৯৩১ সালে ‘Sur’ নামে একটি সাহিত্যপত্র প্রতিষ্ঠা করেন। স্প্যানিশ ভাষায় ‘Sur’ অর্থ ‘দক্ষিণ’। নামটির মাধ্যমে তিনি লাতিন আমেরিকার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বপরিসরে তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন। জন্মসূত্রে তিনি রোমান ক্যাথলিক হলেও তাঁর মানসিক বিকাশে ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতির গভীর প্রভাব ছিল।ঐতিহাসিকভাবে ঠাকুর পরিবার ও নেহেরু পরিবার উভয়ই ব্রিটিশ শাসনামলে উচ্চশিক্ষা, সম্পদ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছিল। তবে তাঁদের ভূমিকা ছিল ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে। ঠাকুর পরিবার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক চিন্তায় নেতৃত্ব দিয়েছে; নেহেরু পরিবার আইন, রাজনীতি ও স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আধুনিক ভারতের রাষ্ট্রগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেহত্যাগ করলেন। তাঁর মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছর পরই ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটল ভারতীয় উপমহাদেশে। ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে দুটি ঘটনা আলাদা হলেও, প্রতীকী অর্থে মনে হয়— এক মহান প্রতিভার বিদায়ের পরই যেন এক বৃহৎ সাম্রাজ্যেরও বিদায়ের সূচনা হলো।একটি বিষয় আমাকে প্রায়ই ভাবায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেন গীতাঞ্জলি ইংরেজিতে অনুবাদ করতে হলো, তারপরই কেন তিনি নোবেল পুরস্কার পেলেন? আবার সেই নোবেল পুরস্কারই বা কেন শান্তিনিকেতন থেকে চুরি হয়ে গেল?এই দুটি ঘটনার মধ্যে কি কেবলই কাকতালীয় সম্পর্ক, নাকি ইতিহাসের গভীরে লুকিয়ে আছে আরও কোনো অনুচ্চারিত প্রশ্ন?আরও

একটি প্রশ্ন আমাকে নাড়া দেয়— শান্তিনিকেতন থেকে ২০০৪ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পদক ও কয়েকটি মূল্যবান সামগ্রী চুরি হয়— যে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের নোবেল পদক চুরি করেছে, সে কি শুধুই একজন চোর? নাকি রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার সেই বঞ্চিত মানুষের মতো, যে নিজের প্রাপ্য হিস্যা বুঝে নেওয়ার এক প্রতীকী দাবি জানিয়েছে?এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো ইতিহাসের কাছে নেই। কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যায়— যেখানে স্বীকৃতি, সম্পদ, ক্ষমতা ও মালিকানার ইতিহাস জড়িয়ে থাকে, সেখানে একটি চুরি কি শুধু চুরি, নাকি কখনো কখনো তা ইতিহাসের আরেকটি নীরব ভাষ্যও হয়ে ওঠে ?