বিশেষ প্রতিনিধিঃ
আলমডাঙ্গা রেলস্টেশনের ইতিহাস বেশ পুরানো, সমৃদ্ধ ও তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা । এই স্থাপনার সাথে নীলবিদ্রোহ, ’৭১ –এর মুক্তিযুদ্ধসহ নানা আন্দোলন সংগ্রামের বেদনাদায়ক ইতিহাস জড়িত।



আলমডাঙ্গা রেলস্টেশন শুধুমাত্র একটি পরিবহন কেন্দ্রই নয়, রেলস্টেশনটি একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, নীলচাষীদের সংগ্রাম এবং এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বহন করে। স্টেশন ভবনটি মূলত নীলকর সাহেবদের একটি কুঠি ছিল, যেখান থেকে তারা এ অঞ্চলের নীলচাষের পরিকল্পনা, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করত। ভবনের ওপরের তলায় ইংরেজ সাহেবরা থাকত এবং নিচের তলার কামরাগুলো ছিল তাদের গুপ্ত ঘর বা জেলখানা। নীল চাষ করতে অস্বীকারকারীদের ধরে এনে এখানে আটকে রাখা হতো এবং তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হতো। ১৮৫৯ সালের দিকে আলমডাঙ্গার নীলচাষীরা একযোগে বিদ্রোহ করে এ অঞ্চলকে নীলকর মুক্ত করে। আলমডাঙ্গাকে নীলকর মুক্ত করতে বীরত্ব দেখিয়েছিলেন বাদেমাজু গ্রামের পিয়ার বিশ্বাস, গোস্বামী দূর্গাপুরের জালাল উদ্দীন শেখ, ঘোষবিলা গ্রামের ফয়েজ উদ্দীন মন্ডল, গোবিন্দপুরের জমির উদ্দীন মণ্ডলসহ প্রমুখ বীর কৃষক। এ বিদ্রোহী কৃষদের আইনী সহায়তা প্রদান করেছিলেন গোস্বামী দূর্গাপুরের নীলকুঠির দেওয়ান রামসুন্দর গোস্বামীর পুত্র মহেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় । যদিও দেওয়ান রামসুন্দর গোস্বমী ব্রিটিশদের পক্ষ নিয়েছিলেন। নীলকর মুক্ত হলে এ বিল্ডিঙের তেমন প্রয়োজন না থাকায় নীলকর অফিসের পরিবর্তে আলমডাঙ্গা রেলস্টেশনের জন্য ব্যবহার হতে থাকে। মোঘল ও ইংরেজ আমলের স্থাপত্যশৈলীর এক অনুপম দৃষ্টান্ত এই স্টেশন ভবন। জনশ্রুতি অনুযায়ী দেশের প্রথম দ্বিতল রেলওয়ে স্টেশন আলমডাঙ্গা। যা প্রকৃতপক্ষে সত্য নয়। প্রকৃত সত্য হচ্ছে দেশের প্রথম দ্বিতল রেল স্টেশন জগতি এবং প্রথম রেলস্টেশনও জগতি । তবে আলমডাঙ্গার যে স্থান দিয়ে রেল লাইন স্থাপন করা হয়েছে সে স্থান স্বাভাবিক সমতল ছিল না। ছিল নিচু বিল অঞ্চল। ফলে রেললাইন স্থাপনের জন্য অনেক উচু করে রেল লাইন স্থাপন করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এ প্রয়োজনেই পূর্ব থেকে নীলকরদের জন্য স্থাপিত বর্তমান বিল্ডিংটিকে স্টেশন হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। উল্লেখ্য ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর বর্তমান বাংলাদেশে দর্শনা হতে জগতি পর্যন্ত ৫৩.১১ কিলোমিটার রেললাইনের উদ্বোধন করা হয়। যখন ট্রেন চলাচল শুরু করে তখন আলমডাঙ্গাতে রেলস্টেশন ছিল কুমার নদের ওপারে কালিদাসপুরে। ১৯০৯ সালে বর্তমান লালব্রীজ নির্মিত হয়। তারপূর্বে এ নদের ওপরে হয়তো অন্য কোন ব্রীজ ছিল এবং এ ব্রিজ নির্মাণের কিছু আগেপরে কালিদাসপুর হতে স্টেশন স্থান্তরিত করে বর্তমান দ্বিতল ভবনে নিয়ে আসা হয়। যা অনেক পূর্বেই মোগল-ব্রিটিশ স্থাপত্যের নির্মাণ শৈলীর যৌথ মিশ্রণে নির্মাণ করা হয়েছিল। যেটি ব্রিটিশ নীলকররা তাদের অফিস-আবাসস্থল-নীলকুঠি ও জেলখানা হিসেবে ব্যবহার করত। স্থানটি নিচু থাকায় আলমডাঙ্গা রেল স্টেশনের প্লাটফর্মটি নীলকরদের ওই বিল্ডিং-এর ছাদ সমতলে স্থাপন করা হয়েছে। যা আজও দৃশ্যমান। কোন বিল্ডিঙের ছাদ সমতলে প্লাটফর্ম করা হয়েছে এমন নজির আমাদের দেশে তো বটেই বিশ্বের ইতিহাসেও অদ্বিতীয়।

অবহেলা-অযত্নে আলমডাঙ্গা রেল স্টেশন।
বর্তমানে আলমডাঙ্গা রেলস্টেশনের কাজে নিয়োজিত ভবনটি ১৮৬২সালে স্টেশন ভবন হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করা হয়নি। ভবনটি ১৮৬২ সালের অনেক পূর্বেই নির্মিত। যা নীলকারদের কাজে ব্যবহার করা হত । যদিও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম, স্টেশনটির অবকাঠামো বছরের পর বছর ধরে অবহেলিত রয়েছে এবং এর সংরক্ষণে কোনো বিশেষ উদ্যোগ দেখা যায় না। আলমডাঙ্গা রেল স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন কমপক্ষে ৭টি আন্তনগর ট্রেন যাতায়াত করে। প্রতিদিন যার যাত্রী সংখ্যাও কয়েক হাজার। এ স্টেশন হতে প্রতিমাসে প্রায় অর্ধকোটি টাকার টিকেট বিক্রয় হয়। অযত্ন আর অবহেলায় স্টেশনটি তার জৌলুশ হারাতে বসেছে। স্টেশনের দ্বিতল বিশিষ্ট সিগনাল রুমটিতে লতাপাতায় ভরে গেছে। মূল ভবনটিতে নানা আগাছায় ছেয়ে আছে। আফফান ঝড়ে উড়ে গেছে ১ নম্বর প্লাটফর্মের যাত্রীছাউনি। যাত্রীদের বিশ্রামকক্ষও যাচ্ছেতাই অবস্থায় পড়ে আছে। নেই স্বাস্থসম্মত সৌচাগার। প্লাটফর্মে নেই যাত্রীদের বসার মতো চেয়ার বা বেঞ্চ। আলমডাঙ্গার এই রেল স্টেশনের প্লাটফর্মের দৈর্ঘ ট্রেনের যাত্রীবাহী কোচের তুলনায় অনেক ছোট। একারণে যাত্রীদের উঠা-নামার সময় প্রায়ই দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। প্লাটফর্মে নেই পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা। ফলে মাদকসেবী ও ছিচকা চোর-বাটপারদের উপদ্রব বেড়ে গেছে অনেকগুণ। খুলনা বিভাগের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ উপজেলা হওয়া সত্ত্বে আলমডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনের এ করুণ দশা রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় এক নগ্ন উদাহরণ। যেখানে দেশের অন্যান্য স্থান আধুনিক রেলযোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠছে; সেখানে এ স্টেশন তার নন্যূতম সংস্কার হতেও বঞ্চিত। ঐতিহ্যবাহী এই রেলওয়ে স্টেশনের যাত্রীসেবা বৃদ্ধি, উন্নত প্লাটফর্ম এবং স্টেশনের সৌন্দর্যবর্ধনসহ আধুনিকায়ন করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
