আলমডাঙ্গা রেলস্টেশনে জরাজীর্ণ ভবনে বাড়ছে মৃত্যু ঝুঁকি: নেই আধুনিকতার ছোঁয়া।

লেখক: খাইরুল ইসলাম
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

আলমডাঙ্গা উপজেলা প্রতিনিধি:

চুয়াডাঙ্গা জেলার প্রাচীনতম ও ঐতিহাসিক জনপদ আলমডাঙ্গার বুকে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী আলমডাঙ্গা রেলস্টেশন। ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন এই লাল ইটের ভবনটি আজ সময়ের বিবর্তনে এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পলেস্তারা খসা দেওয়াল, জরাজীর্ণ ছাদ আর আগাছায় ঘেরা এই স্থাপনাটি এখন কেবল একটি রেলস্টেশন নয়, বরং এক মুমূর্ষু ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৮৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্টেশনটি এ অঞ্চলের রেল যোগাযোগের অন্যতম প্রাচীন কেন্দ্র। ব্রিটিশ আমলের কারুকার্যখচিত লাল ইটের ভবনটি পথচারী ও যাত্রীদের মুগ্ধ করত। কিন্তু বর্তমানে ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল ধরেছে, বৃষ্টি হলে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে এবং কাঠের জানালাগুলো ভেঙে পড়েছে। অনেক জায়গায় ইটের বাঁধুনি আলগা হয়ে যাওয়ায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।

স্টেশনের এই জীর্ণ দশা ও অব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন মিয়া বলেন:”আলমডাঙ্গা রেলস্টেশনটি এই অঞ্চলের মানুষের আবেগের জায়গা। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাব এবং বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় আজ এটি ধ্বংসের মুখে। আমাদের দাবি, অবিলম্বে স্বচ্ছতার সাথে এই স্টেশনের আধুনিকায়ন ও সংস্কার কাজ শুরু করা হোক, যাতে যাত্রীদের ভোগান্তি কমে এবং রাষ্ট্রীয় এই সম্পদ রক্ষা পায়।

“আলমডাঙ্গা চুয়াডাঙ্গা জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। প্রতিদিন আশেপাশের কয়েক জেলার হাজার হাজার যাত্রী এই স্টেশন দিয়ে ঢাকা, খুলনা ও উত্তরবঙ্গে যাতায়াত করেন। স্টেশনের বর্তমান নাজুক অবস্থার কারণে যাত্রীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখানে অবস্থান করেন। অথচ একে আধুনিকায়ন ও সংস্কার করা গেলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটত এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতো।যাত্রী দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে দেখা যায়, স্টেশনে বর্তমানে বিশুদ্ধ পানির পর্যাপ্ত সুব্যবস্থা নেই। পশ্চিম পাশের প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য কোনো পানির উৎস না থাকায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। পশ্চিম পাশের প্লাটফর্মে আগে একটি টিউবওয়েল থাকলেও অযত্ন আর অবহেলায় সেটি অনেক আগেই চুরি হয়ে গেছে।

ফলে দূরপাল্লার যাত্রীদের চড়া দামে বাইরে থেকে পানি কিনে খেতে হচ্ছে অথবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।এই প্রাচীন স্থাপনার শৈল্পিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে বিশিষ্ট কবি কহন কুদ্দুস বলেন:”এই লাল ইটের ভবনটি শুধু চুন-সুরকির দেয়াল নয়, এটি আমাদের কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি ও ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। প্রগতির নামে ঐতিহ্যকে মুছে ফেলা কোনো সমাধান নয়। বরং ব্রিটিশ আমলের এই স্থাপত্যরীতি অক্ষুণ্ণ রেখে এর সংস্কার করা হলে এটি পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

“একটি জাতির উন্নয়ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষা করাও সমান জরুরি। আলমডাঙ্গা রেলস্টেশনটি শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি এই জনপদের শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী। সরকারি উদ্যোগে এখনই ভবনটির কাঠামোগত সংস্কার, বিশুদ্ধ পানির সুব্যবস্থা, আধুনিক যাত্রী বিশ্রামাগার নির্মাণ এবং স্টেশনের পরিবেশ উন্নত করা প্রয়োজন।আলমডাঙ্গা রেলস্টেশনের এই জীর্ণ দশা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বেদনার। ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো দাবি জানাচ্ছে এলাকাবাসী। ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগেই এই প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন ভবনটি সংস্কার করে এর হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা হোক।