কবির মাহমুদ
অর্থনীতি বিভাগ, নরসিংদী সরকারি কলেজ।
বিপ্লব সাধারণত তখনই ঘটে, যখন মানুষের অসন্তোষ চরমে পৌঁছে যায়, যখন বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা বা সামাজিক কাঠামো জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়। তবে প্রায় সব বিপ্লবেই দেখা যায়—আদর্শিক আন্দোলন শুরু হলেও মাঝপথে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করে নেয়। সাধারণ মানুষ আবেগের বশে বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার আগের অবস্থানে ফিরে যায়।
বাংলাদেশও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির লড়াই আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর আমরা কতটা সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে পেরেছি? এক বাক্যে সবাই বলবে—না! কারণ আমরা জনগণ আবেগে ফুঁসে উঠি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আদর্শ ধরে রাখতে ব্যর্থ হই। আমাদের ক্ষমতার কাঠামো বদল হয়, কিন্তু শোষণ বন্ধ হয় না। কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে, আর সাধারণ মানুষ আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়।
সফল বিপ্লব কেমন হওয়া উচিত?
পৃথিবীতে কিছু বিপ্লব সত্যিকার অর্থে বিশ্বকে পরিবর্তন করেছে। আমরা যদি আমেরিকান বিপ্লব (১৭৭৫-১৭৮৩) এর কথা চিন্তা করি, তাহলে দেখবো এর মূলে ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, করের বোঝা ও ব্রিটিশ শাসনের দমননীতি। এর ফলাফল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন হয় (১৭৭৬ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা, ১৭৮৩ সালে ব্রিটিশ স্বীকৃতি)। প্রথম গণতান্ত্রিক সংবিধান (১৭৮৭) প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হয়।
ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯-১৭৯৯) ঘটেছিল সামন্তবাদী শাসন, রাজতন্ত্রের অত্যাচার, আর্থিক সংকট ও জনগণের অসন্তোষের কারণে। এর ফলে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে, রাজা লুই ষোড়শ ও তার স্ত্রী মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। “স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব” (Liberty, Equality, Fraternity) আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও পরে নেপোলিয়ন ক্ষমতা দখল করেন, এই বিপ্লব বিশ্ব রাজনীতির চেহারা বদলে দেয়।
হাইতির বিপ্লব (১৭৯১-১৮০৪) দাসপ্রথার বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়। এর ফলে দাসদের নেতৃত্বে বিশ্বের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ-শাসিত স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয় এবং এটি অন্যান্য দাস বিদ্রোহকে অনুপ্রাণিত করে।
লাতিন আমেরিকান বিপ্লব (১৮০৮-১৮৩০) স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ফলাফল। এর ফলে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো (ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, পেরু, বলিভিয়া) স্বাধীন হয়।
রুশ বিপ্লব (১৯১৭) হয়েছিল জার শাসনের দমননীতি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দুর্ভোগ, অর্থনৈতিক সংকট ও সাম্যবাদী আদর্শের বিস্তারের কারণে। এর ফলে জার শাসনের পতন ঘটে এবং সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়।
চীনা বিপ্লব (১৯৪৯) মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে দুর্নীতিগ্রস্ত কুওমিনটাং সরকারের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়। এর ফলে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং চীন অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়।
কিউবান বিপ্লব (১৯৫৩-১৯৫৯) ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়। এর ফলে বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটে এবং কাস্ত্রো একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক সংস্কার হয়।
তাহলে জুলাই বিপ্লব কোথায় দাঁড়িয়ে?
উল্লেখিত বিপ্লবগুলো সফল হয়েছে কারণ তাদের আদর্শ ও লক্ষ্যে স্থিরতা ছিল। কিছু বিপ্লব জনগণের প্রকৃত মুক্তি এনেছে, আবার কিছু বিপ্লব ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
জুলাই বিপ্লব বাংলার ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। এই বিপ্লব আদর্শগত সংকটে পড়েছে, নেতৃত্বের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। সমন্বয়কের নামে চাঁদাবাজি, নতুন রাজনৈতিক দল গঠন এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত থাকা—এসবই বিপ্লবের মূল লক্ষ্যকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
একটি বিপ্লব সফল করতে হলে শুধু শাসক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; নতুন শাসন কাঠামো কী হবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার নীতি ও আদর্শ থাকা জরুরি। আদর্শগত বিভ্রান্তি থাকলে জনগণের আস্থা হারানো স্বাভাবিক।
বিপ্লব শুধু রাস্তায় নয়, চেতনায় ঘটতে হয়।
যদি সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন চাই, তাহলে শুধুমাত্র আবেগ নয়—যুক্তি, পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টাই একমাত্র পথ। আর সেটার জন্য প্রয়োজন দেশপ্রেমিক ও আদর্শবান নেতৃত্ব। নতুবা, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে, আর বিপ্লব কেবল একটি ব্যর্থ ঘটনার মতো হারিয়ে যাবে।
